মাসুদুর রহমান : মানবজীবনের সবচেয়ে জটিল অথচ সবচেয়ে স্পর্শকাতর সময় হলো কৈশোর। এ বয়সে কিশোর-কিশোরীরা শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিক ও আবেগিকভাবেও দ্রুত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়। সমাজবিজ্ঞানীরা একে “transitional period” বা সংক্রমণকাল বলে আখ্যায়িত করেছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংক্রমণকালকে ঘিরে এক বিশেষ আইনি ও সামাজিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। একদিকে দণ্ডবিধির আওতায় ১৬ বছরের নিচে যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, ১৬ বছরের ঊর্ধ্বে সম্মত যৌন সম্পর্ককে অপরাধ ধরা হয় না।
অন্যদিকে, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী মেয়েদের বিবাহযোগ্য বয়স ১৮ এবং ছেলেদের ২১। শিশু আইন, ২০১৩ আবার ১৮ বছরের নিচে সবাইকে শিশু হিসেবে ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ ১৬ বছরের একটি মেয়ে একদিকে যৌন সম্পর্কে সম্মতি দিতে পারছে, অন্যদিকে তাকে এখনো “শিশু” হিসেবে ধরা হচ্ছে এবং সে বৈধভাবে বিয়ে করতে পারছে না। ফলে ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যবর্তী সময়ে কিশোর-কিশোরীরা এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের শিকার হয়, যেখানে তারা যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈধ হলেও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে আইনি বাধার মুখে পড়ে।
যেমন-কোনো কিশোর-কিশোরী নিজেদের ইচ্ছায় সম্পর্কে জড়ালে সেটি আইনত বৈধ হলেও, পরিবার তা মেনে না নিলে মামলা-মোকদ্দমার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে ছেলেটিকে “ধর্ষণ” মামলায় অভিযুক্ত করা হয়, যদিও মেয়ে নিজেই সম্মত ছিল।
নীতিগত দ্বন্দ্ব ও সামাজিক বাস্তবতা
আইন প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য সমাজকে সুরক্ষা দেওয়া এবং নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন কোনো আইনে দ্বন্দ্ব থেকে যায়, তখন সেই আইন অনেক সময় উল্টো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১৬ থেকে ১৮ বছরের যৌন সম্পর্ক ও বিবাহের ক্ষেত্রে এমনই একটি দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে। একদিকে রাষ্ট্র কিশোর-কিশোরীদের অকাল বিবাহ থেকে রক্ষা করতে চাইছে, অন্যদিকে তাদের শারীরিক ও মানসিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করছে।
নীতিগতভাবে বাংলাদেশে শিশু বিয়েকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী মেয়েদের ১৮ এবং ছেলেদের ২১ বছর পূর্ণ না হলে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। উদ্দেশ্য ছিল কিশোর বয়সে বিয়ের কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া, মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু এবং দারিদ্র্যের চক্র ভাঙা। UNICEF এবং Save the Children-এর গবেষণা অনুযায়ী, অল্প বয়সে বিয়ে করলে মেয়েদের শিক্ষাজীবন প্রায়শই শেষ হয়ে যায় এবং তারা অধিকতর গৃহস্থালী সহিংসতার শিকার হয়। এসব কারণেই আইন কঠোরভাবে বিবাহের বয়স নির্ধারণ করেছে।
আরও পড়ুন : অগ্রক্রয় বা প্রিয়েমশন মোকদ্দমায় উভয় পক্ষের আইনি ডিফেন্স!
কিন্তু বাস্তবতা হলো, কৈশোরকালীন সময়ে শারীরিক পরিপক্বতা ও আবেগগত আকর্ষণ উভয়ই বেড়ে যায়। WHO-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৫–১৯ বছর বয়সী কিশোরীরা বিশ্বের প্রায় ১১% জন্মদানের হার বহন করে। অর্থাৎ এ বয়সে যৌন সম্পর্ক একটি বাস্তবতা, যেটি আইনের কড়াকড়ি দিয়ে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বাংলাদেশে অনেক কিশোর-কিশোরী প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, যা অনেক সময় শারীরিক সম্পর্ক পর্যন্ত গড়ায়। এখানেই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, আইন তাদের যৌন সম্মতিকে বৈধতা দিলেও বিয়ে করার অধিকার অস্বীকার করে।
এই দ্বৈত অবস্থান থেকে সৃষ্টি হয় সামাজিক সংকট। পরিবার যখন দেখে তাদের কিশোরী মেয়ে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছে, তখন সামাজিক সম্মান বাঁচাতে তাকে দ্রুত বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আবার অনেক ক্ষেত্রে, যদি মেয়েটি যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়, তবে ছেলেটির বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দেওয়া হয়, যদিও সম্পর্কটি সম্মতিপূর্ণ হয়। এর ফলে ছেলে পক্ষ সামাজিকভাবে কলঙ্কিত হয় এবং পরিবার ধ্বংসের মুখে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসলে সম্মতিপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে দায়ের করা, যেখানে পরিবারের অমতে মামলা হয়েছে।
নীতিগত দ্বন্দ্ব এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, রাষ্ট্র শিশু সুরক্ষার নামে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি করেছে। ১৬ বছরের একটি মেয়ে যদি সম্পর্কের জন্য যথেষ্ট পরিপক্ব হয়, তবে কেন তাকে বিবাহের জন্য অপরিপক্ব বলা হবে? আবার অন্যদিকে, আইন যদি ১৮ বছরের আগে বিয়েকে নিষিদ্ধ রাখে, তবে যৌন সম্মতির বয়স কেন ১৬ বছর নির্ধারণ করা হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন। আদালতও অনেক সময় দ্বিধায় পড়ে যায়।
আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশের আদালত ১৬ থেকে ১৮ বছরের যৌন সম্পর্ক ও বিবাহের বিষয়ে বহুবার রায় দিয়েছেন। আদালতের রায়গুলোতে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে বিচারকরা আইন ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে যান। উদাহরণস্বরূপ, হাইকোর্ট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ রায় মনোয়ার মল্লিক বনাম রাষ্ট্র, (৫৯ ডিএলআর) মামলায় আদালত উল্লেখ করে যে, “যদি কোনো কিশোরী ১৬ বছর পূর্ণ করে থাকে এবং তার সম্মতি থাকে, তবে তাকে ধর্ষণের শিকার বলা যাবে না।”
তবে অন্যদিকে, Bangladesh National Women Lawyers’ Association বনাম বাংলাদেশ সরকার (2019) মামলায় আদালত জোর দিয়ে বলেন, “১৮ বছরের আগে বিয়ে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর, তাই এটি প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।” এতে স্পষ্ট হয় যে আদালত একদিকে কিশোরীর যৌন সম্মতিকে স্বীকৃতি দেন, অন্যদিকে তাকে বিবাহের অধিকার দেন না। অনেক বিচারক স্বীকার করেছেন, এই আইন সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি করছে এবং মামলা জটিল করে তুলছে।
সমাধানের পথ
সমস্যার মূল সমাধান নিহিত আছে আইন, নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করার মাধ্যমে। বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৫ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার বাধ্যবাধকতা আছে। বাংলাদেশ CEDAW (Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination Against Women) এবং CRC (Convention on the Rights of the Child)-এর সদস্য রাষ্ট্র।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে বিয়ে ও যৌন সম্পর্ক শিশু অধিকারের পরিপন্থী হেতু প্রথমত, যৌন সম্মতির বয়স ও বিবাহের বয়স একই নির্ধারণ করা জরুরি। বাংলাদেশে যদি ১৮ বছরকে বিবাহের ন্যূনতম বয়স ধরা হয়, তবে যৌন সম্মতির বয়সও ১৮ করা উচিত। এতে দ্বৈত ব্যাখ্যা থাকবে না।
দ্বিতীয়ত, বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালত বা স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদন সাপেক্ষে ১৬–১৮ বছরের কিশোর-কিশোরীদের বিয়ের সুযোগ রাখতে হবে। ধরুন, দুই পরিবার সম্মত, উভয় পক্ষ পরিণত এবং সামাজিকভাবে দায়িত্ব নিতে সক্ষম, তাহলে কেন রাষ্ট্র জোর করে তাদের বিয়েকে অবৈধ করবে? এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় কিশোর-কিশোরীদের ঘরে নয়, বরং পালিয়ে গিয়ে গোপন বা অবৈধ সম্পর্কে ঠেলে দেয়। ফলে প্রকৃত সুরক্ষা দেওয়ার বদলে আইন তাদের আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
তৃতীয়ত, পরিবার, সমাজ ও বিদ্যালয়ে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রচার করতে হবে। কারণ আইন দিয়ে কেবল ভয় দেখানো যায়, কিন্তু সচেতনতা দিয়ে পরিবর্তন আনা যায়। একজন ১৬ বছরের মেয়ে যদি জানে তার শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক ঝুঁকি কী, তবে সে নিজেই সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
সবশেষে বলা যায়, কিশোর-কিশোরীরা আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের ভালোবাসা, সম্পর্ক বা সিদ্ধান্তকে কেবল অপরাধের দৃষ্টিতে দেখা নয়, বরং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিশু সুরক্ষা মানে তাদের শেকল পরানো নয়, বরং তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। তাই আইন, নীতি ও বাস্তবতার সমন্বয় ঘটিয়ে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।
লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। E-Mail : masud.law22@gmail.com