হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মামনুন রহমান পদত্যাগ করেছেন। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন তিনি। প্রায় দেড় বছর ধরে বিচারকাজ থেকে বিরত ছিলেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মামনুন রহমান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএল.বি (সম্মান) ও এলএল.এম ডিগ্রি অর্জনের পর ২০০৪ সালে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান মামনুন রহমান। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ২৩ আগস্ট স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর হাইকোর্ট বিভাগের ১২ জন বিচারপতিকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল। বাধ্যতামূলক অবসর বা স্বেচ্ছায় পদত্যাগের ফলে বর্তমানে তাদের মধ্যে ৯ জন দায়িত্বে নেই। বাকি ৩ জন বিচারপতি পদে থাকলেও তারা বিচারিক কাজে নিয়োজিত নেই। এর বাইরেও হাইকোর্ট বিভাগের ২ বিচারপতি স্বেচ্ছায় কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। তাদের মধ্যে বিচারপতি মামনুন রহমান একজন।
জানা গেছে, বিচারপতি মামনুন রহমান ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কিছুদিন পর বিদেশে পাড়ি জমান। এরপর থেকে তিনি বিনা ছুটিতে দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সম্প্রতি সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল রাষ্ট্রপতির কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে।
এর আগে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি হাইকোর্ট বিভাগের তিনজন বিচারপতিকে অপসারণ করেছেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিচারকদের অবস্থা
২০২৪ সালের আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হাইকোর্ট বিভাগের ১২ জন বিচারপতিকে ছুটিতে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে বর্তমানে ৯ জন বিচারপতি আর দায়িত্বে নেই। এই ৯ জনের কেউ সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের তদন্ত শেষে বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন, কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন এবং কেউ অবসরে চলে গেছেন।
বাকি তিনজন বিচারপতি পদে থাকলেও বেঞ্চের দায়িত্বে নেই, অর্থাৎ তারা বিচারিক কার্যক্রমে নিয়োজিত নন। এ ছাড়া চলতি মাসে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলে অভিযোগ দাখিল হওয়ায় হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এম আর হাসানকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
ছুটিতে পাঠানো মোট ১৩ জন বিচারপতির বাইরেও হাইকোর্ট বিভাগের দুইজন বিচারপতি স্বেচ্ছায় কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। তারা হলেন বিচারপতি মামনুন রহমান এবং বিচারপতি আশরাফুল কামাল।
আপিল বিভাগে গণপদত্যাগের প্রেক্ষাপট
দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পদত্যাগ দাবিতে সকাল থেকে হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা।
সেদিন বিকেলের মধ্যেই আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির মধ্যে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ ছয়জন পদত্যাগ করেন। প্রধান বিচারপতি ছাড়া পদত্যাগকারী অন্য পাঁচ বিচারপতি হলেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম, মো. আবু জাফর সিদ্দিকী, জাহাঙ্গীর হোসেন, মো. শাহিনুর ইসলাম এবং কাশেফা হোসেন। তখন আপিল বিভাগে একমাত্র বিচারপতি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম।
সেই দিন রাতেই হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
হাইকোর্ট ঘেরাও ও বিচারপতিদের বেঞ্চ থেকে অব্যাহতি
এরপর ১৫ অক্টোবর রাতে ‘দলবাজ, দুর্নীতিবাজ ও ফ্যাসিস্টের দোসর’ বিচারকদের পদত্যাগের দাবিতে হাইকোর্ট ঘেরাওয়ের ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলম। পরদিন ১৬ অক্টোবর শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে হাইকোর্ট চত্বরে এসে বিক্ষোভ করেন।
এ কর্মসূচির মধ্যেই কয়েকজন বিচারপতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আলোচনার পর ওই দিন বিকেলে তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল শিক্ষার্থীদের সামনে বক্তব্য দেন। তিনি জানান, বিচারপতিদের নিয়োগ, পদত্যাগ বা অপসারণের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। আপাতত ১২ জন বিচারপতিকে প্রাথমিকভাবে কোনো বেঞ্চ দেওয়া হচ্ছে না।
পদত্যাগ ও অপসারণের ধারাবাহিকতা
এই ১২ বিচারপতির মধ্যে গত বছরের ৩১ অক্টোবর সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের অনুসন্ধান চলাকালে বিচারপতি মো. আখতারুজ্জামান রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিন গত বছরের ৩০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করে নিজ স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করেন।
বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলাম এবং বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলন হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারক হিসেবে পুনর্নিয়োগ পাননি। অন্যদিকে বিচারপতি মো. আতাউর রহমান খান ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাস অবসর গ্রহণ করেছেন।
এ ছাড়া সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে রাষ্ট্রপতি তিনজন বিচারপতিকে অপসারণ করেন। বিচারপতি খিজির হায়াতকে ১৮ মার্চ, বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানকে ২১ মে এবং সর্বশেষ ৫ নভেম্বর বিচারপতি খুরশীদ আলম সরকারকে অপসারণ করা হয়।
রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সংবিধানের পুনর্বহাল হওয়া অনুচ্ছেদ ৯৬-এর দফা (৬) অনুযায়ী তাকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে।
বিচারপতি এম আর হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ
গত বছরের নভেম্বরে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল (এম আর) হাসানের বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলে অভিযোগ দাখিল করা হয়। দুর্নীতি, অসদাচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এনে শাহ গ্রুপের চেয়ারম্যান কে এম মজিবুল হক এ আবেদন করেন।
অভিযোগটি তদন্তাধীন থাকার কারণে নতুন প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর ৩ জানুয়ারি হাইকোর্টের সব বেঞ্চ পুনর্গঠন করা হলেও বিচারপতি এম আর হাসানকে কোনো বেঞ্চের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

