অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

একটি ভুয়া বিয়ে, আদালতে মামলা ও সত্য উম্মোচন!

সিরাজ প্রামাণিক: আইন পেশায় থাকার সুবাদে নানা রহস্যময় মামলার মুখোমুখি হতে হয়। এই তো সেদিনের কথা। আদালতের এজলাস তখন বিচারপ্রার্থীদের ভিড়ে জনাকীর্ণ। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এক সুদর্শন যুবক আসামি। বাদীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ত্রিশোর্ধ্ব এক নারী। তার বেশভূষায় বলে দিচ্ছে—এক উচ্চাভিলাষী নারী।

উভয় পক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য শুনে বুঝতে পারলাম, এটি যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারার মামলা। আমি আসামির দিকে তাকাতেই ম্যাজিস্ট্রেটকে উদ্দেশ করে যুবকটি দৃঢ়স্বরে বলে উঠলেন, “স্যার, এই মামলার বাদীকে আমি চিনিই না। ওনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্কই নেই। এটা একটি ষড়যন্ত্রমূলক মামলা। আমার প্রতিপক্ষ আমাকে ফাঁসাতে রেডিমেড বাদী দিয়ে আমার বিরুদ্ধে এহেন মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন।”

আসামির এই কথা শেষ হতে না হতেই বাদীর মারমুখি ও জল্লাদি আচরণ—“মিথ্যা কথা, স্যার! উনিই আমার স্বামী। এই দেখুন আমাদের বিয়ের কাবিননামা! আমরা এক বছর সংসারও করেছি!”

এজলাস জুড়ে তখন সরগরম। দুই পক্ষের আইনজীবীর চলছে বাকযুদ্ধ। আসামির আইনজীবী জামিনের পক্ষে, বাদীর আইনজীবী জামিন না মঞ্জুরের আদেশের দাবিতে গর্জে উঠছেন। বিচারক মহোদয় উভয় পক্ষকেই থামাতে চেষ্টা করছেন।

এমন সময় কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামি হঠাৎ হাত তুলে বললেন, “স্যার, একটা কথা বলব?” সবাই থমকে গেল। “যেহেতু উনি (বাদী) আমাকে স্বামী দাবি করছেন, আমি আমার বউকে এখনই নিয়ে যেতে চাই। আজই সংসার শুরু করতে চাই। আপনি দয়া করে অনুমতি দিন।”

এই প্রস্তাবে আদালত নিস্তব্ধ। মুহূর্তেই বাদীর চোখে-মুখে অস্থিরতা, মুখ লাল হয়ে উঠল। এবার বাদীর দম্ভোক্তি—“অসম্ভব, স্যার! উনি আমাকে মারধর করেছেন, যৌতুক চেয়েছেন। তার সঙ্গে গেলে আমাকে মেরে ফেলবে”—ইত্যাদি আবেগী বক্তব্য।

আরও পড়ুন : নীতিনির্ধারকদের চিন্তাশক্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে বিতর্ক : বিচারপতি মাহবুব উল ইসলাম

সব শুনে এবার বিচারক মহোদয় বললেন, “আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব আদালতের। আপনি সাত দিন স্বামীর সঙ্গে সংসার করুন। সাত দিন পর আমি একটি ডেট দিলাম। তারপর আদালত সিদ্ধান্ত নেবে।”

আর আসামিকে সতর্ক করে বললেন, “স্ত্রীর জীবন যদি বিপন্ন হয় কিংবা কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে সকল দায়ভার আপনার। সাত দিন পর তাকে নিরাপদে আদালতে ফিরিয়ে আনবেন।”

এজলাসে উপস্থিত আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী সবার মনের মধ্যে একটি প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে—যদি তাদের বিয়েটাই সত্যি না হয়? তাহলে এই সাত দিনের সংসারের পরিণতি কী হবে?

কিন্তু পরের দিনই সত্য উন্মোচন হলো। আসামিপক্ষের আইনজীবী এসে জানালেন, “স্যার, বাদী মাঝ রাস্তায়ই চলে গেছেন। স্বামীর সঙ্গে এক মুহূর্তও থাকেননি।”

এরপরের কয়েকটি তারিখে বাদী আর আদালতে আসেননি। আদালতে দাখিলকৃত কাবিননামা অনুযায়ী সেই কাজীকেও আদালত তলব করেছিলেন। কিন্তু কাজীও আর আদালতে উপস্থিত হলেন না।

আদালতের কাছে সবকিছু ধীরে ধীরে রহস্যময় হয়ে উঠল। অবশেষে তদন্তের পর রিপোর্ট এলো—যে কাজীর নামে কাবিননামা আদালতে দাখিল করা হয়েছে, উক্ত কাজী অনেক আগেই মারা গেছেন! তাহলে হালনাগাদ এই কাবিননামা বানাল কে?

উল্লেখ্য, আদালত চত্বরে এমন ভুয়া কাবিননামা তৈরির অনেক চক্র বসে থাকেন। আবার কাউকে ফাঁসাতে এই মামলার বাদীর মতো অনেক রেডিমেড বাদীও আছে। টাকা হলে এখানে বাদী-আসামি—সব ভুয়া মেলে।

অবশেষে জালিয়াতির জাল ছিঁড়ে সত্য উন্মোচিত হলো। ভুয়া বাদী ভুয়া মামলায় ফেঁসে হাজতে যেতে হলো।

বিঃদ্রঃ গল্পটির মধ্যে অনেক মেসেজ আছে। ভুয়া বাদীরা সাবধান!

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’। Email: seraj.pramanik@gmail.com