মোঃ রওশন জাদীদ : ঢাকা হতে গাজীপুর চৌরাস্তা, এরপর কোনাবাড়ি। কোনাবাড়ি থেকে সামান্য বামদিকে গেলেই কাশিমপুর কারাগার। কোনো বন্দির সঙ্গে দেখা করার প্রয়োজন পড়লে আপনার সঙ্গে থাকতে হবে আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, পাসপোর্ট সাইজের একটি ছবি ও কারাপ্রধান বরাবর একটি আবেদনপত্র। এসব আগে জানা না থাকলে অপচয় হবে পাক্কা এক ঘণ্টা। কারণ ভেতরে ঢোকা না অবধি কোথাও কোনো দিকনির্দেশনা চোখে পড়বে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত কোনো কারারক্ষীর সঙ্গে কথা বলছেন। আর কারারক্ষীরা ব্যস্ত—প্রত্যেকদিনের মতো সকলকে দিকনির্দেশনা দিতে!
আর ভেতরের কথা কী বলব? ১১০ একরের বিশাল আয়তনের এই কারাগারকে বলা হয় দেশের বৃহত্তম কারাগার, একই সঙ্গে এশিয়ার বৃহত্তম কারাগারগুলোর একটি। ভেতরে ঢোকার পর যখন জানবেন আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি লাগবে, তখন গেটের বাইরে যাওয়া-আসাটা বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে আসে। তবে সুবিধার ব্যাপারটি হলো, কারা ফটক থেকে ভেতরের ভবনগুলোতে যাতায়াতের জন্য বিশেষ অটোরিকশার ব্যবস্থা রয়েছে। যাওয়া-আসা মিলিয়ে ভাড়া ২০ টাকা।
ভেতরেই মিলবে কারাপ্রধান বরাবর আবেদনের ফরম্যাট। আপনার নাম-পরিচয় ওটাতে লিখে ফেললেই হলো। দাম নেবে ১০ টাকা। এরপর আবেদনপত্র জমা দেবেন আপনার বন্দী যে ভবনে রয়েছে, তার বাইরে টেবিল পেতে বসে থাকা অফিসারদের কাছে। সেখানে বন্দীদের জন্য টাকা, খাবার, ইত্যাদি অনুমোদিত জিনিসপত্রও দেওয়া যায়। এরপর বসে থাকার পালা, যতক্ষণ না আপনার বা আপনাদের ডাক পড়ে।
উল্লেখ্য, একসঙ্গে সর্বোচ্চ পাঁচজন বন্দীর সঙ্গে দেখা করা যায়। আর সেটি ১৫ দিনে একবার করে।
আরও পড়ুন : চেক জালিয়াতি মামলায় বিচারিক এখতিয়ার বদল
সাক্ষাৎকার রূমে ডাক পড়লে, রিসেপশনে মোবাইল ফোন জমা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। হয়তো তখন আপনার মাথায় ঘুরতে থাকবে কোনো বিদেশি সিনেমার চিত্র! আয়তাকার ছোট ছোট রূম, মাঝখানে কাঁচ। কাঁচের নিচে গোল ফাঁকা জায়গা দিয়ে প্রিয়জনের হাত ধরে ফোনের রিসিভারটা তুলবেন, এরপর প্রাণখুলে কথা বলবেন! ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়। মাছের বাজার থেকেও যদি শব্দদূষণের কোনো জায়গা থাকে, তা হলো ওই সাক্ষাৎকার রূম।
তিন ফুটের জানালার মতো জায়গায় লোহার সিক ০৮টি, তারপর দুই পাশেই এক ইঞ্চি ব্যাসার্ধ খালি রেখে লোহার গ্রিল। এরকম জানালা রয়েছে ১০টি, যার প্রত্যেকটিতে দুইজন করে বন্দী কথা বলতে পারেন। এর মানে ২০ জন বন্দী একসঙ্গে কথা বলে থাকেন। উল্টোপাশে সাক্ষাৎপ্রার্থী থাকেন গড়ে ৮০–৯০ জন। সবাই বলে চলেছেন—সান্ত্বনার বাণী, টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার আক্ষেপ, ছোট বোনের বিয়ের খবর, চাচার মারা যাওয়া, উকিলের আশ্বাস, বাচ্চার প্রথম কথা বলা—ইত্যাদি ইত্যাদি।
পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে ভালো দিকটি হলো, প্রয়োজনে কারাপ্রধানের ফোন নম্বরে কল করলে তিনি ধরেন এবং কথা বলেন। কিন্তু অনেক সমস্যার একটি হলো—মা-বাবা-ভাই-বোন-স্ত্রী এই নিকটাত্মীয় ব্যতীত সাক্ষাৎ করা প্রায় কঠিন। আর আইনজীবীর সঙ্গে বন্দীর কথা বলার কোনো ব্যবস্থা সেখানে নেই। যেটি কিনা যেকোনো মানুষের সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার। দ্য প্রিজনস আইন–১৮৯৪ অনুযায়ী যেসব বন্দীদের বিচার চলমান রয়েছে, তারা একান্তে তাদের আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করতে পারেন।
অন্যদিকে একজন কারাপ্রধান কোনো সাক্ষাৎপ্রার্থী নিজেকে তল্লাশি করতে বাধা দেওয়া ব্যতীত তার সাক্ষাৎ বাতিল করতে পারেন না। কিন্তু বাস্তবে আইনজীবী হিসেবে দেখা করতে চাইলে কারাপ্রধানের বিশেষ অনুমতি লাগে। আপনি যখন সেই অনুমতি নিয়ে আপনার বন্দীর সঙ্গে মামলা বিষয়ে কথা বলবেন, তখন সেই আসামি আপনাকে জানাবেন— “ভাই আর দুইদিন পর মাইয়্যাটার আহনের কথা আছিল। অহন আপনে আইছেন বইল্যা মাইয়্যাডারে আরো ১৫ দিন দেখবার পারুম না…”
লেখক : অ্যাডভোকেট, সুপ্রীম কোর্ট অব বাংলাদেশ। ই-মেইল : rawsan.zadid@yahoo.com

