সিরাজ প্রামাণিক: চেকের মামলায় ১৩৮ ধারার অধীনে মামলায় ‘লিগ্যাল নোটিশ’ সঠিকভাবে জারি হওয়া একটি বাধ্যতামূলক শর্ত। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মামলার ভিত্তি বা কজ অব একশন তৈরির জন্য অপরিহার্য।
অনেক সময় এমন হয় যে, চেকদাতাই জানেই না যে কবে, কিভাবে চেকটি বাদীর নিকট হস্তগত হয়েছে কিংবা চেকটি ডিসঅনার হয়েছে, লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে, আবার কবে মামলা হয়েছে, ওয়ারেন্ট হয়েছে কিংবা মামলায় রায় হয়েছে। হঠাৎ পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হলে তখন সবকিছু জানা যায়। কিন্তু আইন বলছে ভিন্ন কথা।
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ বিভিন্ন রায়ে নোটিশ জারির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। উচ্চতর আদালতের মতে, বাদী যদি প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি সঠিক ঠিকানায় রেজিস্ট্রি ডাকযোগে (প্রাপ্তি স্বীকার এডি সহ) নোটিশ পাঠিয়েছেন, তবে আসামি সেটি গ্রহণ না করলেও তা জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৭ ধারা মোতাবেক নোটিশটি ‘জারি হয়েছে’ বলে গণ্য হবে।
আবার যদি নোটিশ “গ্রহণে অস্বীকার” বা “খুঁজে পাওয়া যায়নি” মর্মে ফেরত আসে এবং ঠিকানা সঠিক থাকে, তবে আদালত ধরে নেন যে নোটিশ জারি হয়েছে। কিন্তু যদি ঠিকানা ভুল থাকে, তবে নোটিশ জারি হয়নি বলে গণ্য হবে।
নোটিশ জারির উদ্দেশ্য হলো দেনাদারকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া। অর্থাৎ আসামিকে টাকা পরিশোধের সুযোগ দেওয়াটাই নোটিশের মূল উদ্দেশ্য। যদি সেই সুযোগ আইনত না দেওয়া হয়, তবে পুরো বিচার প্রক্রিয়াই ত্রুটিপূর্ণ হবে। (এম. এ. মালেক বনাম রাষ্ট্র, ১৫ বিএলসি ৪২৫)
আরও পড়ুন : খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ সেবার ফি পুনর্নির্ধারণ
যদি আসামি প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি কোনো নোটিশই পাননি এবং বাদীর দেওয়া ঠিকানায় তিনি কোনোদিন বসবাসই করেননি, তবে সেই মামলার কার্যক্রম ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১এ ধারামতে বাতিল হতে পারে।
এক কথায়, যদি নোটিশের ঠিকানা এবং আসামির ভোটার আইডি বা প্রকৃত ঠিকানায় বড় ধরনের গরমিল থাকে, তবে সেই নোটিশকে ‘প্রোপার সার্ভিস’ বলা যাবে না।
আবার সরাসরি পত্রিকায় প্রকাশিত নোটিশ সম্পর্কে (২২ বিএলসি ৫৮৪) মামলায় বলা হয়েছে, সরাসরি নোটিশ না পাঠিয়ে বা যথাযথ চেষ্টা না করে কেবল পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিলে তা নোটিশ জারির বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ, যদি না আসামি পলাতক থাকেন। কাজেই নোটিশ জারিতে পদ্ধতিগত ত্রুটি থাকলে আসামি খালাস পাবেন। (৫৬ ডিএলআর ৬৩৬)
চেকের মামলা প্রমাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার নোটিশ প্রাপ্তির বিষয়। আসামির উপর নোটিশ জারি ১৩৮ ধারার চেকের মামলার পূর্বশর্ত। ব্যর্থতায় আসামি খালাস পাবে।
অনেক সময় দেখা যায় যে মামলার নালিশী আরজিতে—
১। আসামি কর্তৃক লিগ্যাল নোটিশ প্রাপ্ত হওয়ার কোনো তারিখ উল্লেখ থাকে না,
২। নোটিশ প্রাপ্তির প্রমাণস্বরূপ প্রাপ্তি স্বীকার অ্যাকনলেজমেন্ট ডকুমেন্ট (এডি) সাবমিট করতে পারেন না,
৩। ফেরত খামও আদালতে উপস্থাপন করতে পারে না,
৪। পোস্টমাস্টারের কোনো ধরনের প্রত্যয়নপত্রও সাবমিট করতে পারেন না।
তখন এ জাতীয় মামলার ভবিষ্যৎ কী? উচ্চতর আদালত ৩৯ বিএলডি, পৃষ্ঠা নং ২২২-এ বলেছেন, আসামির উপর নোটিশ জারির বিষয়ে কোনো সন্দেহ সৃষ্টি হলে এবং যদি লক্ষ্য করা যায় যে আসামি ইচ্ছাকৃতভাবে নোটিশ উপেক্ষা করেননি, তাহলে ১৩৮ ধারার পূর্বশর্ত পরিপালনে ব্যর্থতার কারণে আসামি খালাস পাবে।
কারণ ১৩৮ ধারার (১) উপধারার প্রোভাইজো (বি)-তে বলা হয়েছে, আসামি কর্তৃক নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে ৩০ দিন সময় দিতে হবে। যদি আসামি নোটিশ প্রাপ্ত না হয়, সেই প্রাপ্তির তারিখ জানার সুযোগ আছে কি না? এই ৩০ দিনের সময় না দিয়ে যদি মামলা দায়ের করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের মৌলিক অধিকার—আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার—আসামির নস্যাৎ হয়ে যাবে।
আবার অনেক সময় নালিশী আরজিতে টাকা লেনদেনের দিন, ক্ষণ, তারিখ, সময়, টাকা লেনদেনের স্থান, সাক্ষীদের উপস্থিতি—এসব কোনো কথাই উল্লেখ থাকে না। এমনকি বাদী সাক্ষীর জবানবন্দিতেও এগুলো থাকে না। তাহলে এ জাতীয় মামলার ফলাফলই বা কী হবে?
চেকের মামলায় তামাদির বিষয় এ আইনের ১৪১(বি) ধারায় নির্ধারিত হয়েছে এবং সেখানে বলা হয়েছে যে মামলার কারণ উদ্ভূত হওয়ার তারিখ থেকে এক মাসের মধ্যে এই ধরনের মামলা করতে হবে। তাহলে নোটিশ জারি বিষয়ে ক্লিয়ার না হলে তামাদির মেয়াদ বিষয়ে মাননীয় আদালত কোন সিদ্ধান্তে আসবেন?
আরও পড়ুন : ডোপ টেস্টে মাদকাসক্তির প্রমাণ মিললে হবে না সরকারি চাকরি
আবার ফৌজদারি কার্যবিধির ২২১ ধারার ৫ উপধারা বলছে, মামলায় অভিযোগ চার্জ গঠনের সময় অপরাধ সংঘটনের আইনানুগ সকল উপাদান অভিযোগে থাকতে হবে। যদি নালিশী দরখাস্তে আসামি কর্তৃক নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ উল্লেখ না থাকে, সেই তারিখ থেকে ৩০ দিন সময় না দেওয়া হয়, সেই ৩০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে মামলা করা না হয়, তাহলে ১৩৮ ধারার চেক ডিসঅনারের অপরাধ সংঘটনের ৩টি উপাদানের অনুপস্থিতি থাকবে এবং তা অপরাধ সংঘটনে ব্যর্থ হবে।
কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ বা বাদীপক্ষ থেকে খোঁড়া অজুহাত বা লেইম এক্সকিউজ হিসেবে দ্য জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৭ ধারার কথা বলা হয়। এখন আলোচনার বিষয় হলো—চেক ডিসঅনারের অপরাধের ক্ষেত্রে এ ধারাটি প্রযোজ্য হবে কি না?
দ্য জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট প্রণীত হয়েছে ১৮৯৭ সালে, আর দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট প্রণীত হয়েছে ১৮৮১ সালে। অর্থাৎ ১৬ বছর আগে জন্ম হয়েছে এন.আই. অ্যাক্টের। আর দ্য জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৭ ধারা বলছে, এই ধারার বিধানাবলি কার্যকর হবে দ্য জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট চালু হওয়ার পর থেকে। এ বিষয়ে উচ্চতর আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রয়েছে—৬৪ ডিএলআর, পৃষ্ঠা নং ২৫৫।
আরও পড়ুন : বরিশালে মিথ্যা মামলা দায়ের করায় বাদীকে সাজা
এবার আসি চেকের মামলায় নোটিশ জারির বিষয়ে অনুমান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ডাক পিওনকে পরীক্ষা করার বিষয়ে। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ৭ এসসিসি ৫১০ পৃষ্ঠায় বলেছেন—বাদীকে ডাক পিওনকে আদালতে পরীক্ষা করে নোটিশ জারির বিষয় ২৭ ধারার অধীনে প্রমাণ করতে হবে।
এবার প্রশ্ন আসে—নোটিশটি যে আসামির উপর জারি হয়েছিল, তা প্রমাণের দায়িত্ব কার? নোটিশ যে জারি হয়েছে, তা প্রমাণের দায়িত্ব একমাত্র বাদীর। (৬০ ডিএলআর ৬৭৭)
কারণ এন.আই. অ্যাক্টের ১১৮ ধারার অধীনে ধর্তব্য অনুমান খণ্ডনযোগ্য। আসামি আত্মপক্ষ সমর্থনে তর্কিত চেকের বিপরীতে কিছু বলতে চাইলে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। কেননা উক্ত চেকটি সে কেন ইস্যু করেছিল, তা বলার অধিকার তার রয়েছে। আসামি বাদীপক্ষের সাক্ষীকে জেরা করে কিংবা সাফাই সাক্ষী দিয়ে অথবা উপযুক্ত কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করে অনুরূপ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। (মহেষ চন্দ্রিকার বনাম দত্তরাম, বোম্বে হাইকোর্ট, ২০০৯(২) ডি.সি.আর. ১৮৫)
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। ই-মেইল:seraj.pramanik@gmail.com

