আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আরও একজন প্রসিকিউটর নিয়োগ
আইনজীবী মো. সাইমুম রেজা তালুকদার

পদত্যাগকারী প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ‘কোটি টাকা ঘুষ দাবি’র অভিযোগ, অডিও ফাঁস

চব্বিশের অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে কলেজছাত্র ওয়াসিম আকরাম হত্যা মামলা থেকে সাবেক এক সংসদ সদস্যকে ‘খালাস করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসে’ এক কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য পদত্যাগ করা প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে।

এ অভিযোগ ওঠার মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্বে আসা এ প্রসিকিউটর সোমবার পদত্যাগ করেন। এদিনই তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

আর সাইমুম রেজার পদত্যাগের ঘণ্টা কয়েক পর ‘ঘুষ দাবির’ অভিযোগের কথিত দুটি অডিও ফাঁস হয়েছে, যা একটি বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশনে প্রচারও করা হয়।

ফাঁস হওয়া অডিওতে ঘুষ দাবির অভিযোগ

কথিত দুটি অডিওতে সদ্য পদত্যাগ করা প্রসিকিউটর সাইমুম রেজাকে চট্টগ্রামের রাউজান থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের এক আইনজীবীর সঙ্গে ‘ঘুষ দাবির’ দরকষাকষি করতে শোনা যায়।

এ বিষয়ে ফজলে করিমের আইনজীবী রেজওয়ানা ইউসুফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি খোলাখুলি কিছু বলতে রাজি হননি। ‘ঘুষ দেওয়া’ নিয়ে দর কষাকষির বিষয়টি অস্বীকারও করেননি।

তবে কথিত অডিও রেকর্ডটি বাস্তবসম্মত কি না–এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “যেহেতু এত বড় ঘটনা, সেখানে কোনো না কোনো সত্য থাকতে পারে।”

অপরদিকে ঘুষ দাবির অভিযোগ ও অডিওর সত্যতা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন সাইমুম রেজা তালুকদার। তার দাবি, এটি একটি মহলের অপপ্রচার এবং অডিওগুলো মিথ্যা।

ফাঁস হওয়া কথিত অডিও ক্লিপগুলোতে আর্থিক লেনদেনের পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক তদবিরের বিষয়ে কথা বলতে শোনা যায়।

সংবাদমাধ্যমের কাছে আসা সেই অডিওতে সাইমুম রেজা তালুকদারকে সরাসরি ‘এক কোটি টাকা’ প্রত্যাশার কথা বলতে শোনা যায়।

তার পদত্যাগের খবর সামনে আসার পর সোমবার বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশন চ্যানেল২৪ এ অডিও প্রচার করে।

অডিও এর কথোপকথনে ‘কিস্তিতে টাকা পরিশোধের’ আলোচনার পাশাপাশি, মামলা থেকে অব্যাহতির নিশ্চয়তা হিসেবে বিএনপির এক সংসদ সদস্য এবং এক প্রতিমন্ত্রীকে দিয়ে তদবির করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

ট্রাইব্যুনালের নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে ‘রিজনেবল’ হিসেবে তুলে ধরে অডিওতে তার সমর্থন আদায়ে ওই রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশ কাজে লাগবে বলেও অডিওতে বলতে শোনা যায় ।

সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিমকে গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে গ্রেপ্তারের তথ্য দেয় পুলিশ।

প্রসিকিউশনের তথ্যমতে, চব্বিশের আন্দোলনে চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ ৯ জন নিহত এবং ৪৫৯ জন আহত হওয়ার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে সংঘটিত গণহত্যার মামলায় গত ১৬ ফেব্রুয়ারি তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।

অভিযোগ অস্বীকার সাইমুম রেজার

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফোন করা হলেও সাড়া দেননি সাইমুম রেজা।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি সোমবার রাত ৯টা ৫ মিনিটে ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেন।

তার দাবি, এটি একটি মহলের অপপ্রচার এবং অডিওগুলো মিথ্যা।

নিজের দাবির সপক্ষে আইনি যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন,

আমার বিরুধ্বে চট্টগ্রামে জুলাই গণ অভ্যুত্থান ২০২৪ এর ঘটনায় একটি অভিযোগ এসেছে। অভিযোগটি এরকম যে একজন আসামীকে খালাস করিয়ে দেয়ার বিনিময়ে নারীর সাথে কথোপকথন এর দুইটি অডিও ক্লিপ, যেখানে আমি নাকি ১ কোটি টাকা দাবি করেছি, ১০ লক্ষ টাকা অগ্রিম চেয়েছি। এই দাবী ভিত্তিহীন ও অসত্য। এমন কিছু কখনও ঘটেনি, আমিও কারও থেকে উপরোক্ত কিছু চাইনি।

এক একটা মামলা কয়েকজন প্রসিকিউটরের সমন্বয়ে গঠিত টিম এর অধীনে থাকে। তদন্ত সংস্থার তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে এবং চিফ প্রসিকিউটরের নেতৃত্বে প্রসিকিউশন টিমের সহায়তায় কয়েকটি স্তর পার করে মামলার নথি প্রস্তুত করা হয়। আদালতে উভয় পক্ষের শুনানি, সাক্ষ্য ও যুক্তি তর্ক শুনে মাননীয় আদালত সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের অর্ডার ও রায় প্রদান করেন। তাই একজন প্রসিকিউটরের পক্ষে কখনও একটি মামলায় কাউকে কোন বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেয়া সম্ভব নয়।

পদত্যাগের কারণ হিসেবে সাইমুম রেজা পোস্টে তার আগের কর্মস্থল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় এবং গবেষণায় ফিরে যাওয়ার কথা তুলে ধরেন।

তিনি লেখেন,

আমি অনেকদিন ধরেই আমার প্রাক্তন কর্মস্থল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় ফেয়ার জন্য চিন্তা করছিলাম। আমি আবার গবেষণা ও লেখালেখিতে মনোনিবেশ করতে আগ্রহী। এবং আমার পরিবারকেও আরও বেশি সময় দিতে চাই। তাই পূর্বের কর্মক্ষেত্রে ফিরলাম।

নতুন সরকারের অধীনে নতুন চিফ প্রসিকিউটরের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম পূর্বের ন্যায় বিচারের ধারা অক্ষুণ্ণ রেখে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করে যাবে। তাই এখন ভালো সময় আমার পূর্বের কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাওয়ার।

ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে আমি ট্রাইবুন্যালের সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করি। ন্যায় বিচার নিশ্চিতে আমি সরকার ও ট্রাইবুন্যালকে যে কোন ধরনের সহযোগিতা করতে সর্বদা প্রস্তুত এবং অনুগত।

ডিজিটাল প্রমাণের আইনি গ্রহণযোগ্যতা এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের আরেক প্রসিকিউটর ও সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, অডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কি না, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। তবে কথোপকথনের শ্বাস নেওয়ার প্রক্রিয়া ও বাচনভঙ্গি বিশ্লেষণে এটি এআই জেনারেটেড না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

তিনি বলেন, একটি পূর্ণাঙ্গ ভয়েস স্যাম্পল, আইপিডিআর এবং সিডিআর বিশ্লেষণের মাধ্যমে ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত হলেই কেবল সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে কথোপকথনটি কাদের মধ্যে এবং কী উদ্দেশ্যে হয়েছিল।