১৬ বিচারকের পদোন্নতি, ১৭ জনকে বদলি
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়

মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হলো শিক্ষানবিশ আইনজীবীর মাথা ফাটানো বিচারককে

গোপালগঞ্জে আদালতের এজলাস চলাকালে শিক্ষানবিস নারী আইনজীবীকে কাচের পেপারওয়েট দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত করার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় অভিযুক্ত বিচারককে সুপ্রিম কোর্টের সুপারিশক্রমে বদলি করে আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ (বিচার শাখা-১) থেকে এ সংক্রান্ত একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন ও বিচার বিভাগের উপসচিব (প্রশাসন-১) এ.এফ.এম. গোলজোর রহমান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে (নং- ১০.০০.০০০0.১২৫.১৯.০০১.২৫৪৮২) জানানো হয়, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সাথে পরামর্শক্রমে গোপালগঞ্জের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (আইডি: ২০২৪২১৬০৬২) জনাব মো: সুজন মিয়াকে বর্তমান কর্মস্থল হতে বদলি করে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগে ‘সংযুক্ত কর্মকর্তা’ (সিভিল জজ) হিসেবে বদলি করা হলো।

প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, উক্ত কর্মকর্তাকে দপ্তর প্রধান কর্তৃক মনোনীত কর্মকর্তার নিকট আজ ২৩ জুলাই ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ অপরাহ্নেই বর্তমান পদের দায়িত্বভার অর্পণ করে অবিলম্বে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

এজলাসে ঠিক কী ঘটেছিল?

আদালত ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল বুধবার (২২ জুলাই) দুপুরে গোপালগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২–এ বিচারিক কার্যক্রম চলছিল। এজলাস চলাকালে পেছনের দিকে কয়েকজন আইনজীবীর নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলা নিয়ে বিচারক মো. সুজন মিয়া চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

প্রথমে তিনি নিজের বিচারিক টেবিলে আঘাত করে সবাইকে চুপ থাকার ইঙ্গিত দেন। তবে এর পরও পরিবেশ পুরোপুরি শান্ত না হওয়ায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে টেবিলে থাকা একটি ভারী কাচের পেপারওয়েট দিকে ছুড়ে মারেন। সেটি সোজাসুজি গিয়ে এজলাসে বসে থাকা শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবী সাবিহা সুলতানার মাথার ডান পাশে আঘাত হানে। এতে তাঁর মাথা থেকে রক্ত পড়তে শুরু করে।

উপস্থিত আইনজীবীরা তাৎক্ষণিকভাবে রক্তাক্ত সাবিহা সুলতানাকে উদ্ধার করে গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান এবং সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করান।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভুক্তভোগী শিক্ষানবিশ আইনজীবী সাবিহা সুলতানা বলেন:

আদালতের কার্যক্রম চলাকালে আমি এজলাসে অত্যন্ত চুপচাপ বসে আমার সেরেস্তার নথিপত্র দেখছিলাম। হঠাৎ করে উড়ে এসে একটি বস্তু আমার মাথায় আঘাত করে। সাথে সাথে মাথা ফেটে রক্ত পড়তে শুরু করে। পরে তাকিয়ে দেখি, সামনে রক্তমাখা একটি কাচের পেপারওয়েট পড়ে আছে।

আইনজীবী সমিতির ক্ষোভ

এ ঘটনায় গোপালগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ঘটনার পরপরই আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ গোপালগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের (সিজেএম) কাছে মৌখিকভাবে বিষয়টির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও নালিশ জানান।

গোপালগঞ্জ জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রাথমিকভাবেই অভিযুক্ত বিচারক সুজন মিয়ার আমলি ক্ষমতা (কগনিজেন্স পাওয়ার) প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এম এ আলম সেলিম বলেন:

একটি বিচারালয়ের এজলাসে বিচারকের আসন থেকে এমন আচরণ অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও নজিরবিহীন। একজন বিচারকের কাছ থেকে বিচারপ্রার্থী বা আইনজীবীরা এটি মোটেও প্রত্যাশা করেন না। ঘটনার পরপরই আমরা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়কে অবহিত করি। সংশ্লিষ্ট বিচারককে স্থায়ীভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্টের হলেও আমাদের দাবির মুখে আপাতত তাঁর আদালতের বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করে অন্য বিচারকের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাথে জরুরি পরামর্শ সাপেক্ষে আজ ২৩ জুলাই আইন ও বিচার বিভাগ থেকে বিচারক সুজন মিয়াকে বিচারিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে প্রশাসনিক দপ্তরে সংযুক্ত করার এই চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো।