রাজীব কুমার দেব
প্রতীকী ছবি

অর্পিত বা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করার সময় অতিক্রান্ত হলে প্রতিকারপ্রার্থী কি দেওয়ানি আদালতে Title Declaration-এর মামলা করতে পারবেন?

রাজীব কুমার দেব : প্রেক্ষাপট এবং প্রশাসনিক জটিলতাসমূহের বিচারিক নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আইনপ্রণেতা দুটি বিশেষ আইন প্রবর্তন করেছেন। প্রথমটি অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ আইন, ২০০১ (সংশোধিত ২০১৩) এবং দ্বিতীয়টি রাষ্ট্রীয় প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৫ক থেকে ১৪৫চ ধারাসমূহ। উভয় আইনেই পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে বিশেষ প্রতিকারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ আইন অনুযায়ী অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে সম্পত্তি অবমুক্তির প্রতিকার প্রদান করা হয়েছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৫ক থেকে ১৪৫চ ধারার অধীনে, আইনের ১৪৪ ধারা অনুযায়ী চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত ও প্রচারিত Record of Rights (বি.এস. খতিয়ান)-কে ভুল ঘোষণাক্রমে সংশোধনের জন্য ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে প্রতিকার লাভের বিধান রাখা হয়েছে।

লক্ষণীয় যে, উভয় আইনেই ট্রাইব্যুনালে প্রতিকার প্রার্থনার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা (Limitation Period) নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে, উভয় আইনেই দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ার সুস্পষ্টভাবে সীমিত বা খর্ব করা হয়েছে (Bar to Civil Jurisdiction), যাতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনালই একমাত্র বিচারিক authority বা কর্তৃপক্ষ হিসেবে কার্যকর থাকে।

এ প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হয়—যদি কোনো ব্যক্তি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করতে ব্যর্থ হন, তাহলে কি তিনি পরবর্তীতে সাধারণ দেওয়ানি আদালতে স্বত্ব ঘোষণার (Title Declaration) মামলা দায়ের করতে পারবেন? এবং যদি দায়ের করেন, তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষ আইনে দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ার খর্ব (Bar to Civil Jurisdiction) করার বিধান থাকা সত্ত্বেও, দেওয়ানি আদালত কি সেই মামলা গ্রহণ ও বিচার করার এখতিয়ার রাখে?

এই প্রশ্নের উত্তর ও প্রতিকারপ্রার্থীর আইনি সুরক্ষার পক্ষে ৬টি সুনির্দিষ্ট বিচারিক যুক্তি নিচে উপস্থাপন করা হলো:

প্রথমত: প্রতিকারহীনতার বিরুদ্ধে আইনবিজ্ঞানের নীতি

উভয় আইনে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আবেদন করতে ব্যর্থ হলে তার কী আইনগত পরিণতি হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নেতিবাচক বিধান নেই। তবে আইনবিজ্ঞানের একটি মৌলিক নীতি হলো— কোনো আইনগত অধিকার বা বাধ্যবাধকতার লঙ্ঘন প্রতিকারবিহীন থাকতে পারে না। ফলে, বিশেষ আইনটিতে সরাসরি বিধান না থাকলেও, প্রযোজ্য দেওয়ানি আইনগত নীতি ও বিচারিক ব্যাখ্যার আলোকে উপযুক্ত আদালতের মাধ্যমে প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত।

দ্বিতীয়ত: Quasi-Judicial Body বনাম Complete Judicial Body

ট্রাইব্যুনাল ও দেওয়ানি আদালত দুটি সম্পূর্ণ পৃথক আইনগত সত্তা (Legal Entity)। ট্রাইব্যুনাল মূলত একটি Quasi-Judicial Body, আর দেওয়ানি আদালত হলো একটি Complete Judicial Body (দেওয়ানি কার্যবিধির ৯ ধারা মোতাবেক)। ট্রাইব্যুনাল অর্পিত বা রেকর্ড সংশোধনী আইনের অধীনে সরকারের আদেশের বৈধতা যাচাই করে তা বহাল, সংশোধন বা বাতিল করার বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে।

বিপরীতে, দেওয়ানি আদালত তার দেওয়ানি কার্যবিধির (CPC) সহজাত বিচারিক ক্ষমতাবলে এবং সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের (SR Act) ৪২ ধারা অনুযায়ী Question of Title-এর পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি (Complete Adjudication) এবং Title Declaration বা স্বত্ব ঘোষণা প্রদান করে। তাই কোনো ব্যক্তি নির্ধারিত সময়ে বিশেষ আইনের অধীনে ট্রাইব্যুনালে প্রতিকার গ্রহণ করতে না পারলেও, তিনি Complete Adjudication-এর জন্য দেওয়ানি আদালতে Title Declaration চেয়ে মামলা করার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না।

তৃতীয়ত: ‘Bar to Civil Jurisdiction’ একটি সাময়িক ‘Stay’ মাত্র

অর্পিত সম্পত্তি আইন ও রাষ্ট্রীয় প্রজাস্বত্ব আইন (LST)–এর “Bar to Civil Court Jurisdiction” বিধানটি স্থায়ী বা চিরন্তন নয়; এটি মূলত ট্রাইব্যুনালের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ, ওই নির্দিষ্ট বিশেষ সময়ের মধ্যে যখন অর্পিত সম্পত্তি বা রেকর্ড সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিকার সচল থাকে, তখনই কেবল Civil Court-এর jurisdiction সীমিত থাকে।

এই সময়কালকে সাময়িকভাবে “Stay of Civil Court Jurisdiction” হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। নির্ধারিত বিশেষ সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর এই আইনি বাধা আর কার্যকর থাকে না; ফলে পক্ষগণ প্রয়োজন অনুযায়ী সাধারণ দেওয়ানি আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা মোতাবেক শিরোনাম (Title) ঘোষণার মামলা করতে পারেন।

প্রসংগত উল্লেখ্য, “প্রত্যর্পণযোগ্য সম্পত্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্তিযোগ্য নহে মর্মে বা উক্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত কোনো সম্পত্তি প্রত্যর্পণযোগ্য সম্পত্তি নহে” কিংবা খতিয়ান ভুল সংক্রান্ত বিশেষ বিধানটি কোনো মতেই দেওয়ানি আদালতের চিরস্থায়ী ‘টাইটেল ডিক্লারেশন’ বা স্বত্ব ঘোষণার সহজাত বিধানকে অন্তর্ভুক্ত বা বিলুপ্ত করে না।

চতুর্থত: বিরোধের বিষয়বস্তুর ভিন্নতা (Subject Matter)

Bar to Jurisdiction of Civil Court বিধানটি আইনগতভাবে ও স্পষ্টভাবে কেবল অর্পিত সম্পত্তির তালিকা হতে অবমুক্তি কিংবা ১৪৪ ধারার অধীনে চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত, প্রচারিত ও প্রকাশিত Record of Rights (খতিয়ান) সংশোধন-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রযোজ্য। এর বাইরে অন্য কোনো ইস্যুতে এ বিধানের প্রয়োগের সুযোগ নেই।

অতএব, বিরোধের মূল বিষয়বস্তু যদি ‘relating to determination of title’ (মালিকানা স্বত্ব নির্ধারণ) হয়, তবে তা কোনোভাবেই অর্পিত সম্পত্তির তালিকা হতে অবমুক্তি বা স্রেফ Record of Rights সংশোধনের প্রার্থনার মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে গণ্য হবে না। এ ধরনের বিরোধ স্বতন্ত্রভাবে মালিকানা নির্ধারণ-সংক্রান্ত, যা মূলত একটি Purely Civil Court Triable Issue এবং এর প্রতিকার একমাত্র দেওয়ানি আদালতেই প্রার্থনাযোগ্য।

পঞ্চমত: তামাদি আইনের সাধারণ বিধানের উপযোগিতা

উভয় আইনে নির্ধারিত Limitation Period মূলত বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিশেষ এখতিয়ার প্রয়োগের শর্ত হিসেবে প্রযোজ্য; এটি সাধারণ দেওয়ানি আদালতের অন্তর্নিহিত এখতিয়ার নির্ধারণ বা খর্ব করে না। তামাদি আইন, ১৯০৮ (Limitation Act, 1908) অনুযায়ী সাধারণ দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে সাধারণ তামাদির বিধান (যেমন: স্বত্ব ঘোষণার জন্য ৩ বছর বা দখলের জন্য ১২ বছর) প্রযোজ্য হয়।

যদি কোনো পক্ষ নির্ধারিত বিশেষ সময়সীমার মধ্যে ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করতে ব্যর্থ হয়, তবে তারা কেবল সেই বিশেষ ট্রাইব্যুনালীয় প্রতিকার (Special Statutory Remedy) থেকে বঞ্চিত হবেন। তবে এ কারণে সাধারণ দেওয়ানি আদালতে প্রতিকার অনুসন্ধানের পথ রুদ্ধ হয় না; বরং বিষয়টি সাধারণ দেওয়ানি আদালতে আসার পর Limitation Act, 1908-এর সাধারণ বিধান অনুযায়ী স্বত্বের অধিকার ও নালিশের কারণ (Cause of Action) উদ্ভব বিবেচনা করে বিচার্য হবে।

ষষ্ঠত: রিট একচেটিয়া বা একমাত্র ফোরাম নয়

যদি বিচারিকভাবে এ মর্মে বিবেচনা করা হয় যে, নির্ধারিত সময়ে ট্রাইব্যুনালে মামলা না করায় এবং দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ার আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকায় মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের ‘রিট এখতিয়ারই’ (Constitution-এর ১০২ অনুচ্ছেদ) অর্পিত ও রেকর্ড সংশোধনী প্রার্থীর একমাত্র প্রতিকারের ফোরাম—তবে সেই বিবেচনা আইনগতভাবে যথার্থ নয়। কারণ, এতে একজন সাধারণ ভুক্তভোগীকে একটি অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল ও সীমিত প্রতিকারের প্রক্রিয়ার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

অথচ Title DeclarationQuestion of Title-এর সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি (Complete Adjudication) করার আদি এখতিয়ার ও ক্ষমতা একমাত্র দেওয়ানি আদালতেরই রয়েছে। অন্য কোনো ফোরাম, এমনকি মাননীয় উচ্চ আদালতও রিট এখতিয়ারে সাধারণত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং বা দেওয়ানি স্বত্বের Title Declaration প্রদান করেন না।

পরিশেষে

সংক্ষেপে ও আইনগতভাবে বলা যায় যে, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ ট্রাইব্যুনাল বা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়েরের নির্ধারিত বিশেষ সময়সীমা অতিক্রান্ত হলেও, একজন প্রকৃত প্রতিকারপ্রার্থী নাগরিক সাধারণ দেওয়ানি আদালতে স্বত্ব ঘোষণা (Title Declaration) চেয়ে দেওয়ানি মামলা দায়ের করতে পারবেন। এ ধরনের মামলা আইনানুগভাবে গ্রহণ ও বিচার করে বিজ্ঞ দেওয়ানি আদালত সম্পূর্ণ এখতিয়ারের সাথে যথাযথ নিষ্পত্তি করতে পারবেন।

লেখক : বিচারক (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ), ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া