কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান এবং অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের কন্যা আদিবার ছবি ও নাম ব্যবহার করে বার কাউন্সিল পরীক্ষার্থীদের সাথে ভয়াবহ জালিয়াতি ও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এক ভুয়া বা প্রতারক আইনজীবীকে ৪ দিনের পুলিশি রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। একই সাথে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের দায়ের করা পৃথক একটি জালিয়াতি মামলায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার (Show Arrested) দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার (২৩ জুন) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম এই তাৎপর্যপূর্ণ রিমান্ডের আদেশ প্রদান করেন। মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও জালিয়াতি চক্রের মূল হোতাদের চিহ্নিত করতে পুলিশ শফিক নজরুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানালে আদালত ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
ঢাকার আদালতে কর্মরত রাষ্ট্রপক্ষের সংশ্লিষ্ট আইনজীবী হারুন অর রশিদ এই আদেশের তথ্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
‘LAW DOCTOR’ পেজ ও ১০০ এমসিকিউ-তে পাসের ফাঁদ
মামলার দাপ্তরিক নথি ও এজাহারের বিবরণ সূত্রে জানা যায়, খুরশীদ আলম নামের এক ভুক্তভোগী ব্যক্তি বাদী হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় সাইবার নিরাপত্তা আইনে এই মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্ত শফিক নজরুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে “LAW DOCTOR” নামে একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও ভেরিফাইড স্টাইলের পেজ পরিচালনা করতেন। এই পেজের মাধ্যমে তিনি মূলত বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের প্রিলিমিনারি (এমসিকিউ) পরীক্ষার কঠিন বৈতরণী পার হতে চাওয়া পরীক্ষার্থীদের সুনির্দিষ্টভাবে টার্গেট করতেন। পরীক্ষার্থীদের পকেট কাটতে তিনি ওই পেজে ‘১০০টি এমসিকিউ পড়লেই পরীক্ষায় নিশ্চিত পাস’—এমন চটকদার, লোভনীয় ও কাল্পনিক বিজ্ঞাপন নিয়মিত স্পন্সর ও প্রচার করে সহজ-সরল পরীক্ষার্থীদের নিজের ফাঁদে আকৃষ্ট করতেন।
জাইমা রহমান ও অ্যাটর্নি জেনারেলের পরিবারের ছবি দেখিয়ে ৮ লাখের চুক্তি
অভিযোগ রয়েছে, এক ব্যবসায়ী বার কাউন্সিল পরীক্ষার্থী ফেসবুকের ওই প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন দেখে আইনি সহায়তার আশায় শফিক নজরুলের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেন। এ সময় শফিক নজরুল নিজেকে সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও অত্যন্ত প্রভাবশালী মহলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে ভুক্তভোগীর কাছে ভুয়া পরিচয় দেন।
পরীক্ষার্থীর মনে শতভাগ বিশ্বাস অর্জনের জন্য শফিক নজরুল চতুরতার আশ্রয় নেন। তিনি বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুশিক্ষিত কন্যা জাইমা রহমান এবং দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা ও সুপ্রিম কোর্ট বারের প্রভাবশালী নেতা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিজের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেন। নিজের এই ভুয়া ও কাল্পনিক দাবির সপক্ষে তিনি জাইমা রহমান ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কন্যা আদিবার ছবি ও বিভিন্ন এডিটেড ছবি প্রদর্শন করে প্রতারণা করেন।
পরবর্তীতে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বার কাউন্সিল এমসিকিউ পরীক্ষায় অবলীলায় পাস করিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত আশ্বাস দিয়ে ওই ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থীর কাছে সর্বমোট ৮ লাখ টাকা চুক্তি করেন। বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তিনি ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড (DBBL) এবং ডিজিটাল ‘নগদ’ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ধাপে ধাপে ৪ লাখ ৫ হাজার টাকা নগদ গ্রহণ করেন।
১২ জুনের পরীক্ষায় অকৃতকার্য ও প্রতারণা ফাঁস
টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর গত ১২ জুন দেশব্যাপী একযোগে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের প্রিলিমিনারি (এমসিকিউ) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা যায়, বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে চুক্তি করা ওই ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে অকৃতকার্য (ফেল) হয়েছেন।
পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর ভুক্তভোগী যখন শফিক নজরুলের কাছে টাকা ফেরত ও জবাবদিহি চান, তখন শফিক নজরুল এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ভুক্তভোগী বুঝতে পারেন যে, প্রধানমন্ত্রীর কন্যা ও অ্যাটর্নি জেনারেলের মতো স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় পদের সন্তানদের নাম ও ছবি ভাঙিয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল জালিয়াতি ও প্রতারণা করা হয়েছে। এরপরই তিনি শেরেবাংলা নগর থানায় সাইবার অপরাধের এই মামলাটি দায়ের করেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে এই ভুয়া আইনজীবীকে গ্রেফতার করে।
এদিকে, আইনজীবী না হয়েও আইনি শিক্ষার নামে প্রতারণা ও বার কাউন্সিলের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করায় স্বশাসিত আইনি সংস্থা ‘বাংলাদেশ বার কাউন্সিল’-এর পক্ষ থেকেও তার বিরুদ্ধে পৃথক একটি জালিয়াতির মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, রিমান্ডে এই চক্রের পেছনে থাকা আরও কোনো আইনি সহযোগী বা অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা, তা নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

