কামাল হোসেন মিয়াজী : সম্প্রতি অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে AAG/DAG পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে একদল আইনজীবী আন্দোলনে নেমেছেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগের সারমর্ম হলো—বিগত সরকারের আমলে তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন; দলের দুঃসময়ে মাঠে থেকে কাজ করেছেন; মামলা, কারাভোগ ও নানামুখী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাই তাদের প্রত্যাশা ছিল, বর্তমান নিয়োগে সেই ত্যাগ ও অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি মিলবে। কিন্তু তা না হওয়ায় তারা এই নিয়োগের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।
শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার। এই নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, সে প্রশ্নে আমি কোনো মন্তব্য করছি না। এই লেখার বিষয়ও তা নয়।
আন্দোলনকারীরা নিয়োগের বিরোধিতায় যে যুক্তি উপস্থাপন করছেন, সেই যুক্তির সঙ্গে আমি—এবং সম্ভবত আরও অনেকেই—একমত নই।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তার পদ কোনোভাবেই রাজনৈতিক আনুগত্য, দলীয় পরিচয় বা অতীতের রাজনৈতিক ত্যাগের পুরস্কার হতে পারে না। সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল কিংবা অ্যাটর্নি জেনারেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ভিত্তি হওয়া উচিত যোগ্যতা, সততা, পেশাগত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং নৈতিক মানদণ্ড। এসব গুণে সমৃদ্ধ কোনো ব্যক্তি যদি কোনো রাজনৈতিক দল বা আদর্শের প্রতি সমর্থন পোষণ করেন, সেটিকে আমি অযোগ্যতা বলে মনে করি না।
সমস্যার মূল অবশ্য অন্যত্র। আজও এ ধরনের নিয়োগের জন্য কোনো সুস্পষ্ট, স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। দলীয় আনুগত্যের বাইরে ঠিক কোন মানদণ্ডে একজন আইনজীবীকে অন্যজনের চেয়ে অধিক যোগ্য বিবেচনা করা হয়, তা আমরা জানি না। যোগ্যতা মূল্যায়নের কোনো নির্ধারিত কাঠামো নেই, উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগপ্রক্রিয়া নেই, এমনকি নিয়োগ পরিচালনার নীতিমালাও জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত নয়। ফলে প্রতিটি নিয়োগের পরই প্রশ্ন, বিতর্ক ও অসন্তোষ অনিবার্য হয়ে পড়ে। এবারের যে আন্দোলন, প্রতিবাদের ধরনে ও ভাষায়, ঠিক যেমনটি হচ্ছে এখন, তা বোধহয় আগে কখনও ঘটেনি।
এই অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি। জাতীয় গুরুত্বের এমন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও যোগ্যতাভিত্তিক কাঠামো থাকা আবশ্যক—যেখানে শুধুই রাজনৈতিক পরিচয় নয়, পেশাগত উৎকর্ষই হবে প্রধান বিবেচ্য। এমন একটি প্রক্রিয়া কেবল যোগ্য আইনজীবীদের ন্যায্য সুযোগই নিশ্চিত করবে না, বরং প্রতিটি নিয়োগের পর যে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি হয়, তাও বহুলাংশে কমিয়ে আনবে।
সত্যি বলতে, আজকের আন্দোলনের মূল দাবি যদি হতো—”দলীয় বিবেচনা নয়, চাই স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ”—তাহলে এই আন্দোলনের প্রতি আমার সমর্থন আরও দৃঢ় হতো। কারণ এই দাবি নতুন নয়; অতীতেও প্রাসঙ্গিক ছিল, আজও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।
রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তারা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নন—তারা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। তাই তাদের নিয়োগও হওয়া উচিত রাষ্ট্রের স্বার্থে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং জনগণের আস্থা অক্ষুণ্ণ রাখার লক্ষ্যে।
রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তার নিয়োগ কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার নয়—এটি হওয়া উচিত যোগ্যতা, সততা ও পেশাগত উৎকর্ষের স্বীকৃতি।
লেখক : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

