রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভার্চুয়াল আদালতের মাধ্যমে বিচার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে দূরের আদালতে যাতায়াতের ভোগান্তি, চেকপোস্টে বিলম্ব এবং ক্যাম্পের বাইরে চলাচলের নানা প্রতিবন্ধকতা অনেকটাই কমবে। শুধু রোহিঙ্গা নাগরিকরাই নন, দেশের পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার বাসিন্দারাও এ সুবিধার আওতায় আসবেন।
বিচারব্যবস্থা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে নেওয়া এ উদ্যোগে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি ও নিরাপত্তাঝুঁকি কমার পাশাপাশি দ্রুত বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভার্চুয়াল আদালতের উদ্বোধন
অপহরণের ঘটনায় করা একটি মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের ভার্চুয়াল শুনানির মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং কক্সবাজার-টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিচারপ্রাপ্তি আরও সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর করতে এ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২ (পশ্চিম)-এ ভার্চুয়াল কোর্ট কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদেমুল কায়েস, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা অভিজিৎ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় রোহিঙ্গা বিচারপ্রার্থী এবং ইউএনএইচসিআর ও ব্লাস্টের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্গম এলাকা থেকে আদালতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীদের যে ভোগান্তি ও ঝুঁকি রয়েছে, ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে তা অনেকটাই কমানো সম্ভব। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে বিচারব্যবস্থাকে আধুনিক করার অংশ হিসেবেও এ উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে।
তাদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থার মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় বিচারপ্রার্থীদের আদালতে যাতায়াতের দীর্ঘপথ, চেকপোস্টে বিলম্ব এবং চলাচলের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের আদালতে সরাসরি উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও কিছু ক্ষেত্রে কমবে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নিরাপদ অবকাঠামোর ওপর গুরুত্ব
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ভার্চুয়াল শুনানির কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য বিচারক, আইনজীবী ও আদালত কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করা এবং বিচারিক কার্যক্রমের গোপনীয়তা ও ন্যায্যতা বজায় রাখা জরুরি।
তিনি বলেন, ধাপে ধাপে ই-জুডিসিয়ারি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ বিচারপ্রাপ্তির বিদ্যমান বাধা কমাতে এবং বিচারসেবা আরও সহজলভ্য করতে সহায়তা করতে পারে।
তিনি জানান, ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে দেশের আদালতগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে গেলে বিচারিক কার্যক্রম সচল রাখার জন্য সুপ্রিম কোর্টের উদ্যোগে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ উদ্দেশ্যে সরকার তথ্যপ্রযুক্তি আইন প্রণয়ন করে। পরে ওই আইনের ৫ ধারার অধীনে সুপ্রিম কোর্ট একটি প্র্যাকটিস ডিরেকশন জারি করে।
এর মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগ অধস্তন আদালতগুলোর ভার্চুয়াল বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি ও পরিবর্তন করতে পারে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই এ বিষয়ে নতুন একটি প্র্যাকটিস ডিরেকশন জারি করা হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে বসবাসরত রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিচারিক সেবা সহজলভ্য করাই প্রযুক্তিনির্ভর বিচারব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় (আরআরসি) এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করছে।
এর মূল লক্ষ্য হলো ভৌগোলিক দূরত্ব, নিরাপত্তাজনিত সমস্যা কিংবা অন্যান্য বাস্তব ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতার কারণে যারা সহজে আদালতে উপস্থিত হতে পারেন না, তাদের বিচারিক সেবার আওতায় আনা।
রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থার গুরুত্ব বিশেষভাবে বেশি। ক্যাম্প থেকে আদালতে যেতে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। আবার ক্যাম্পের বাইরে যাওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হয়।
এর পাশাপাশি নিরাপত্তাঝুঁকি, পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং মাদক, অস্ত্র বা হত্যার মতো বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্তদের সশরীরে আদালতে হাজির করার ক্ষেত্রে নানা ধরনের বাস্তব সমস্যা রয়েছে। ফলে ভার্চুয়াল আদালত এসব ক্ষেত্রে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।
রিমোট পয়েন্টে ভার্চুয়াল সাক্ষ্যগ্রহণ
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী জানান, ভার্চুয়াল বিচার ব্যবস্থায় সাধারণত একটি ‘রিমোট পয়েন্ট’ নির্ধারণ করা হয়। এটি কোনো লিগ্যাল এইড অফিস, ক্যাম্পের নির্দিষ্ট অফিস বা অন্য কোনো উপযুক্ত স্থান হতে পারে।
সাক্ষী, ভিকটিম কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ওই রিমোট পয়েন্টে উপস্থিত থাকবেন এবং বিচারক আদালতকক্ষে বসে অডিও-ভিডিও প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ করবেন।
এ ব্যবস্থায় বিচারক ও আদালতের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো পরস্পরকে দেখতে ও শুনতে পারবেন। প্রয়োজনে বিদেশে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তিও হাইকমিশন বা দূতাবাসের মাধ্যমে একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাক্ষ্য দিতে পারবেন।
রোহিঙ্গাদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে এসওপি প্রয়োজন
হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের আইনি পরিভাষায় সাধারণত ‘রিফিউজি’ না বলে ‘বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক’ (এফডিএমএন) হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থানকালে তারা কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়লে দেশের সার্বভৌম বিচারব্যবস্থার অধীনেই তাদের বিচার হওয়া প্রয়োজন।
তবে তাদের বিচারপ্রক্রিয়ায় নাগরিকদের মতো একই ধরনের আইনি সুযোগ-সুবিধা কতটা প্রযোজ্য হবে এবং জামিনসহ অন্যান্য অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয় স্পষ্ট করার জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
একটি সুস্পষ্ট এসওপি থাকলে ভার্চুয়াল বিচার ব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের অধিকার, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আরও পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
দুর্গম এলাকার মানুষও পাবেন সুবিধা
ভার্চুয়াল আদালতের সুবিধা শুধু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের বিচারিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বলেন, বান্দরবানের আলীকদমের মতো দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কিংবা নদীভাঙনকবলিত চরাঞ্চলের মানুষকে দূরবর্তী আদালতে যাতায়াতের কষ্ট ও ব্যয় থেকে অনেকাংশে মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ভার্চুয়াল আদালত বিচারিক সেবাকে আরও সহজলভ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত করার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম
প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বিচারপ্রাপ্তি সহজ করতে ভার্চুয়াল শুনানির গুরুত্ব এবং আইনগত সহায়তা, সুরক্ষা সেবা ও বিচারব্যবস্থার সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি ও ব্লাস্টের প্রধান আইন উপদেষ্টা বিচারপতি বোরহানউদ্দিন।
তিনি বলেন, ভার্চুয়াল শুনানি প্রচলিত বিচারব্যবস্থার বিকল্প নয়; বরং বিশেষ করে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিচারপ্রাপ্তি আরও সহজ ও কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এ ধরনের উদ্যোগকে টেকসই করতে আইনগত সহায়তা, সুরক্ষা সেবা, আদালত ও প্রযুক্তির মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
স্পষ্ট নীতিমালা ও ডিজিটাল প্রমাণের আইনি কাঠামো প্রয়োজন
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. খাদেম উল কায়েস ভার্চুয়াল শুনানির কার্যকর ও টেকসই বাস্তবায়নের জন্য স্পষ্ট নীতিমালা ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা আদর্শ কার্যপ্রণালি (এসওপি), ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবহারের উপযুক্ত আইনি কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট বিচারিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, ক্যাম্প, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আইনগত সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা ও আদালতের মধ্যে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
নারী, শিশু ও বিশেষ সুরক্ষা প্রয়োজন এমন ব্যক্তিদের জন্য বিশেষায়িত সহায়তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। আইনগতভাবে আপসযোগ্য বিরোধে প্রশিক্ষিত মধ্যস্থতার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। তবে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থাই কার্যকর থাকবে বলে জানান তিনি।
উখিয়া-টেকনাফে বিচারপ্রাপ্তির বাধা কমাবে
মামলার জট এবং দূরবর্তী এলাকার বিচারপ্রার্থীদের ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করে কক্সবাজারের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আবদুর রহিম বলেন, উখিয়া-টেকনাফসহ দূরবর্তী এলাকার বিচারপ্রার্থীদের ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
তার মতে, ভার্চুয়াল শুনানির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দূরবর্তী এলাকায় বিচারসেবা আরও সহজলভ্য করার উদ্যোগ বিচারপ্রাপ্তির বাধা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইজেন বলেন, বিচারপ্রাপ্তি সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দূরত্ব, নিরাপত্তাহীনতা বা অন্যান্য বাস্তব বাধার কারণে কোনো শরণার্থী বা দূরবর্তী এলাকার মানুষ অবিচারের শিকার হবে—তা গ্রহণযোগ্য নয়।
নিরাপদ, গোপনীয় ও সবার জন্য সহজলভ্য উপায়ে এবং প্রচলিত বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রযুক্তির ব্যবহার এসব বাধা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
পরীক্ষামূলক শুনানিতে চার বছর ধরে আটকে থাকা মামলায় অভিযোগ গঠন
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভার্চুয়াল শুনানির উদ্যোগটি একদিনে নেওয়া হয়নি। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে জেলা বিচার বিভাগ, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় (আরআরআরসি), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), ইউএনএইচসিআর এবং ব্লাস্টের প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন।
এ সময় শরণার্থীদের আদালতে বিচারপ্রাপ্তির প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রতিকারের বিষয়ে আলোচনা হয়। পরে বিচার বিভাগ, আরআরআরসি, সরকারি কৌঁসুলি, সংশ্লিষ্ট আইনজীবী, ইউএনএইচসিআর, ব্র্যাক ও ব্লাস্টের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ভার্চুয়াল শুনানি, সম্ভাব্য চৌকি আদালত, সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সিআইসি কার্যালয়কে নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ২০৫ ধারায় শরণার্থীদের সশরীরে উপস্থিতি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত একটি জাতীয় পর্যায়ের কর্মশালাতেও উখিয়া-টেকনাফে ভার্চুয়াল শুনানি এবং আদালত ও আইনগত সহায়তা সেবা আরও সহজলভ্য করার বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
২০২৬ সালে ব্লাস্ট ও ইউএনএইচসিআর এসব আলোচনা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নেয়। কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট উখিয়া-টেকনাফ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩-এর মাধ্যমে কার্যক্রমটি পরীক্ষামূলকভাবে চালুর বিষয়ে সম্মতি দেন।
এর ধারাবাহিকতায় গত ১৭ জুন ব্লাস্ট, ইউএনএইচসিআর ও আরআরআরসির ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় সভায় শিবিরভিত্তিক দূরবর্তী শুনানি কেন্দ্র চালুর বিষয়ে ঐকমত্য হয়।
পরে ২৮ জুলাই সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ অনুযায়ী একটি পরীক্ষামূলক ভার্চুয়াল শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। চার বছর ধরে ওয়ারেন্ট ও অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে আটকে থাকা একটি মামলায় ওই শুনানিতে অভিযোগ গঠন সম্পন্ন হয়।
সাক্ষী আনা-নেওয়ার নিরাপত্তাঝুঁকি কমবে
মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, দূরবর্তী এলাকা, বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মতো জায়গা থেকে সাক্ষী আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং কঠোর চেকিংয়ের ঝামেলা থাকে।
টেকনাফের ক্যাম্পগুলো আদালত থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় ভার্চুয়াল পদ্ধতি এসব ঝুঁকি কমাতে পারে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যাওয়ার যে ঝুঁকি থাকে, তাও এ পদ্ধতির মাধ্যমে কমানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
তিনি জানান, আইনের নতুন সংশোধনীতে ভিডিও কনফারেন্সিং ও ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ফরেনসিক এভিডেন্স এবং অডিও-ভিডিওর মতো ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণও আদালতে গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নারী, শিশু ও বয়স্ক সাক্ষীদের জন্য সুবিধা
ভার্চুয়াল শুনানির ফলে সাক্ষীকে শারীরিকভাবে আদালতে উপস্থিত না করেও দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে বিচারিক প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হওয়ার পাশাপাশি যাতায়াতের সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
নারী, শিশু, অসুস্থ ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আদালতে আসা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা নিজ অবস্থান থেকেই সাক্ষ্য দিতে পারলে তাদের জন্য তা অনেক বেশি সুবিধাজনক হবে।
ইশরাত হাসান বলেন, আসামিদেরও যদি কারাগার থেকে ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে হাজিরার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে যাতায়াতের খরচ ও ঝুঁকি আরও কমানো সম্ভব হবে। সামগ্রিকভাবে এ প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আদালতের কার্যক্রমকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করে তুলবে।
ক্যাম্প থেকেই আদালতের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন বিচারপ্রার্থীরা
ব্লাস্টের পরিচালক (পরামর্শ ও যোগাযোগ) ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুবা আক্তার জুই বলেন, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে আদালতে যাতায়াতের নানা প্রতিবন্ধকতা দূর করতে ভার্চুয়াল শুনানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতে ক্যাম্পে অবস্থান করেই বিচারপ্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারবেন বিচারপ্রার্থীরা।
তার মতে, ক্যাম্প থেকে আদালতে যেতে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত নানা সমস্যা তৈরি হয়। বিশেষ করে নারী বিচারপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে চলাচল, নিরাপত্তা ও বিভিন্ন অনুমতির বিষয়টি জটিলতা তৈরি করে। ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে এসব ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভার্চুয়াল আদালত ব্যবস্থার ব্যবহার শুরু হয়। বর্তমানে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আওতায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। শ্রমিকদের মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রেও ভার্চুয়াল শুনানির ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা চলছে বলে জানান ব্লাস্টের পরিচালক।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভার্চুয়াল শুনানির জন্য ক্যাম্প ইনচার্জের কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্তত একটি ক্যাম্পে এ ধরনের ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
৪৭৪ মামলায় আইনগত সহায়তা দিয়েছে ব্লাস্ট
২০১৯ সাল থেকে ব্লাস্ট ১৭টি রোহিঙ্গা শিবিরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংশ্লিষ্ট ৪৭৪টি মামলায় আইনগত সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে ৮৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
১০টি মামলা তিন বছরের বেশি সময় ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। এ পর্যায়ে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলমান অমীমাংসিত মামলাটি সাত বছর ধরে চলছে।
ইউএনএইচসিআরের সহায়তায় ব্লাস্ট ও ব্র্যাক রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আইনগত সহায়তা প্রদান করছে। এসব অভিজ্ঞতা বিচারপ্রাপ্তির বাধা চিহ্নিত করা এবং ভার্চুয়াল শুনানি কার্যক্রমের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে।

