নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (এনআই অ্যাক্ট), ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় দায়ের করা চেক ডিজঅনার মামলায় চেকে উল্লিখিত আর্থিক দায় সম্পূর্ণ পরিশোধ এবং পক্ষদ্বয়ের মধ্যে আপস হয়ে গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠানো কিংবা তার কারাদণ্ড বহাল রাখা সমীচীন নয় বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত বলেছেন, চেক ডিজঅনার মামলার মূল উদ্দেশ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া বা কারাবন্দি রাখা নয়; বরং পাওনা অর্থ আদায় নিশ্চিত করাই এ ধরনের মামলার মূল লক্ষ্য।
এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় দায়ের করা একটি ক্রিমিনাল আপিল নিষ্পত্তি করে বিচারপতি মো. বশির উল্লাহর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
‘মো. আবদুল হান্নান মাস্টার বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলায় গত ৬ সেপ্টেম্বর এ রায় দেওয়া হয়।
পুরো টাকা পরিশোধের পর বাতিল এক বছরের কারাদণ্ড
রায়ে চেকের টাকা ও ব্যাংকের পাওনাদি সম্পূর্ণ পরিশোধ এবং পক্ষদ্বয়ের মধ্যে আপস-মীমাংসা হওয়ায় এ মামলায় দণ্ডিত আবদুল হান্নান মাস্টারের এক বছরের কারাদণ্ড বাতিল করেছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে আপিলের আগে অধস্তন আদালতে জমা দেওয়া ১৪ হাজার ১০০ টাকা ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায় ঘোষণার সময় আবেদনকারীর পক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। বিবাদী ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. জিসান মাহমুদ। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী তাসনুভা কায়সার।
রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সিরাজুল করিম (রবি)।
৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে চেক দিয়েছিলেন হান্নান
মামলার নথি অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা মো. আবদুল হান্নান মাস্টার ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ২১ হাজার ৮৭৫ টাকা পরিশোধ করেন।
এরপর বকেয়া ২৮ হাজার ১২৫ টাকার বিপরীতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সিরাজগঞ্জ শাখার একটি চেক দেন তিনি।
২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি চেকটি নগদায়নের জন্য ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলে পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় একই বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি চেকটি ডিজঅনার হয়।
পরবর্তীতে আইনের বিধান অনুযায়ী লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হলেও টাকা পরিশোধ করা হয়নি। এ অবস্থায় ২০০৯ সালে তার বিরুদ্ধে নালিশি সি.আর মামলা দায়ের করা হয়।
পলাতক থাকায় অনুপস্থিতিতেই বিচার
পরে মামলাটি ২০১২ সালে বিচারের জন্য সিরাজগঞ্জের দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। আসামি পলাতক থাকায় তার অনুপস্থিতিতেই মামলার বিচারকার্য সম্পন্ন হয়।
এরপর সিরাজগঞ্জের বিজ্ঞ দায়রা জজ ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ দেওয়া রায়ে আবদুল হান্নান মাস্টারকে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করেন।
রায়ে তাকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৮৪ হাজার ৩৭৫ টাকা জরিমানা করা হয়।
পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ক্রিমিনাল আপিল দায়ের করেন আবদুল হান্নান মাস্টার। একই সঙ্গে জামিনের আবেদনও করেন তিনি।
হাইকোর্ট ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট তাকে এক বছরের জন্য জামিন দেন।
আপিল চলাকালে বকেয়া টাকা পরিশোধ
আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় চেকের অবশিষ্ট অর্থ ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে পরিশোধ করেন হান্নান মাস্টার।
এ বিষয়ে চলতি বছরের ২১ জুলাই আবদুল হান্নান মাস্টার ও ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের মধ্যে একটি আপসনামা স্বাক্ষরিত হয়।
এরপর মামলার চেকের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ ও পক্ষদ্বয়ের মধ্যে আপসের বিষয়টি হাইকোর্টের সামনে আসে।
জরিমানা কমিয়ে চেকের সমপরিমাণ করলেন হাইকোর্ট
গত ৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া রায়ে হাইকোর্ট বলেন, মামলার তথ্য ও পারিপার্শ্বিকতা, অপরাধের মাত্রা এবং আপিলকারী কর্তৃক চেকের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের বিষয় বিবেচনা করে আসামি হান্নান মাস্টারের দোষী সাব্যস্তকরণ বহাল রাখা হলো।
তবে আদালত তার অর্থদণ্ড ৮৪ হাজার ৩৭৫ টাকা থেকে কমিয়ে ২৮ হাজার ১২৫ টাকা নির্ধারণ করেন। এই অর্থ চেকে উল্লিখিত মূল টাকার সমপরিমাণ।
আদালত বলেন, নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, দণ্ডপ্রাপ্ত আপিলকারী আপিল দায়েরের আগেই বিচারিক আদালতে ১৪ হাজার ১০০ টাকা জমা দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে অবশিষ্ট টাকা সরাসরি নালিশকারী ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
তাই সংশ্লিষ্ট আদালতকে জমা দেওয়া ১৪ হাজার ১০০ টাকা যথাযথ শনাক্তকরণ সাপেক্ষে অবিলম্বে ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে নথিপত্রসহ রায়ের অনুলিপি অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
‘মূল লক্ষ্য পাওনা টাকা আদায়, অহেতুক শাস্তি নয়’
এ বিষয়ে ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের আইনজীবী মো. জিসান মাহমুদ বলেন, আদালত এ রায়ের মাধ্যমে আইনি সুবিচারের সঙ্গে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অনন্য প্রয়োগ ঘটিয়েছেন।
তিনি বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পাওনা টাকা আদায় করা, কাউকে অহেতুক শাস্তি দেওয়া নয়। যেহেতু আপিলকারী চেকের পুরো অর্থ পরিশোধ করেছেন এবং আপসনামায় স্বাক্ষর করেছেন, তাই তারা উদার মনোভাব নিয়ে তার কারাদণ্ড মওকুফের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, আদালত চেকের সমপরিমাণ অর্থদণ্ড বহাল রেখে আপিলকারীর কারাদণ্ড বাতিল করায় তাদের কোনো আপত্তি ছিল না। বরং আদালতের ন্যায়বিচারকেন্দ্রিক এই সিদ্ধান্তকে তারা সাধুবাদ জানিয়েছেন।

