কামাল হোসেন মিয়াজী : মামলা-মোকদ্দমার দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় এড়াতে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর বিকল্প হিসেবে সালিশ বা arbitration-এর ব্যবহার বেড়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—পক্ষগুলো অপেক্ষাকৃত দ্রুত ও সহজ প্রক্রিয়ায় বিরোধ নিষ্পত্তি করবে এবং সালিশি ট্রাইব্যুনালের রোয়েদাদ মেনে নিয়ে বিরোধের ইতি টানবে। সালিশের কার্যকারিতার জন্য রোয়েদাদের চূড়ান্ততা বা finality অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সালিশি প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম হলে, ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার না থাকলে, কোনো পক্ষ ন্যায়সংগতভাবে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ না পেলে কিংবা সালিশকারীর নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠলে—তখনও কি আদালতের কিছুই করার থাকবে না?
রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ধারা ৩৬(৪) এই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে আসে।
রিয়েল এস্টেট আইনের বিশেষ বিধান
আইনটির ধারা ৩৬ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বিরোধ দেখা দিলে পক্ষগুলো প্রথমে আপসের মাধ্যমে তা নিষ্পত্তির চেষ্টা করবে। আপস ব্যর্থ হলে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে নোটিশ দিয়ে সালিশি ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নিতে পারে। এ পর্যন্ত আইনের কাঠামো সালিশের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু ধারা ৩৬(৪) একটি ব্যতিক্রমী বিধান করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, সালিশ আইন, ২০০১-এ যা-ই থাকুক না কেন, সালিশি ট্রাইব্যুনালের রোয়েদাদ পক্ষগুলোর ওপর বাধ্যকর হবে এবং এর বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো পক্ষের আপত্তি উত্থাপনের অধিকার থাকবে না।
অর্থাৎ, এখানে শুধু রোয়েদাদকে final and binding করা হয়নি; আদালতে তা challenge করার পথও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নটি এখানেই—সালিশি রোয়েদাদের চূড়ান্ততা নিশ্চিত করতে গিয়ে আদালতের সীমিত তদারকির সুযোগও কি পুরোপুরি বন্ধ থাকা উচিত?
সালিশ আইন, ২০০১ কী বলে
সালিশ আইন, ২০০১-এর ধারা ৩৯ সালিশি রোয়েদাদের চূড়ান্ততাকে স্বীকৃতি দিলেও আদালতের ভূমিকা সম্পূর্ণ বাদ দেয়নি। আইনটির ধারা ৪২ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উপযুক্ত আদালতে রোয়েদাদ বাতিল বা set aside করার আবেদন করা যায়। ধারা ৪৩-এ সেই আবেদনের সুনির্দিষ্ট ও সীমিত grounds নির্ধারণ করা হয়েছে।
এটি সাধারণ অর্থে কোনো appeal নয়। আদালত নতুন করে পুরো বিরোধের merits বিচার করে না। বরং দেখে, সালিশি প্রক্রিয়ায় এমন কোনো মৌলিক আইনগত বা প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ঘটেছে কি না, যার কারণে রোয়েদাদটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
যেমন—কোনো পক্ষ যথাযথ নোটিশ না পেলে বা নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের যুক্তিসংগত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলে; ট্রাইব্যুনাল তার এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত দিলে; tribunal-এর গঠন বা প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি থাকলে; কিংবা রোয়েদাদ fraud, corruption বা public policy-এর পরিপন্থী হলে আদালতের সীমিত হস্তক্ষেপের সুযোগ রয়েছে।
অর্থাৎ, সালিশ আইন একটি ভারসাম্য তৈরি করেছে—রোয়েদাদ সাধারণভাবে চূড়ান্ত থাকবে, কিন্তু উল্লেখিত মৌলিক ত্রুটির ক্ষেত্রে সীমিত judicial scrutiny থাকবে।
ধারা ৩৬(৪)-এর সমস্যাটি কোথায়
রিয়েল এস্টেট আইনের ধারা ৩৬(৪) একটি non-obstante clause দিয়ে শুরু হয়েছে। ফলে সালিশ আইন, ২০০১-এ রোয়েদাদ বাতিলের যে সীমিত সুযোগ রয়েছে, এই বিশেষ আইনের অধীনে গঠিত সালিশি ট্রাইব্যুনালের রোয়েদাদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ কার্যত বাদ পড়ে।
এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য বিবেচনা করা প্রয়োজন—finality এবং infallibility এক কথা নয়।
সালিশি রোয়েদাদ চূড়ান্ত হওয়া কাম্য। কিন্তু সালিশি ট্রাইব্যুনাল ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। ধরা যাক, এমন একটি বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল রোয়েদাদ দিল, যে বিষয়ে তার আদৌ এখতিয়ার বা jurisdiction ছিল না। অথবা সালিশকারীর সঙ্গে কোনো পক্ষের এমন সম্পর্ক রয়েছে, যা তাঁর নিরপেক্ষতা বা impartiality নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করে। কিংবা কোনো পক্ষকে বক্তব্য উপস্থাপনের ন্যায্য সুযোগই (fair chance of hearing) দেওয়া হয়নি।
এসব ক্ষেত্রেও যদি আদালতের দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে, তাহলে রোয়েদাদের finality রক্ষা করতে গিয়ে ন্যায়বিচারের মৌলিক নিশ্চয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক চর্চা কী বলে
আন্তর্জাতিক arbitration practice-এও রোয়েদাদের finality অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাধারণভাবে এর অর্থ আদালতের সব ধরনের supervisory jurisdiction বিলুপ্ত করা নয়।
যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য বহু দেশের সালিশ আইনে, উদাহরণস্বরূপ, ট্রাইব্যুনালের substantive jurisdiction না থাকা বা proceedings-এ serious irregularity-এর মতো সীমিত ক্ষেত্রে আদালতের হস্তক্ষেপের সুযোগ রয়েছে।
একই ধারণা আন্তর্জাতিক সালিশি প্রতিষ্ঠানগুলোর Rules-এও পাওয়া যায়। LCIA ও ICC—উভয়ের Rules-এই পক্ষগুলোর award-এর বিরুদ্ধে recourse-এর অধিকার waiver-এর কথা রয়েছে। কিন্তু সেই waiver-ও শর্তহীন নয়; applicable law যতটুকু অনুমোদন করে, ততটুকুই তা কার্যকর।
এর কারণ সালিশের ক্ষেত্রে party autonomy গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির বিকল্প নয়।
স্বেচ্ছায় অধিকার ত্যাগ আর আইন দিয়ে অধিকার বন্ধ করা
দুই পক্ষ স্বেচ্ছায় একটি arbitration agreement করে এমন Institutional Rules গ্রহণ করতে পারে, যেখানে award-এর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধরনের challenge-এর অধিকার সীমিত বা waived থাকে। সেখানে পক্ষগুলোর স্বাধীন সম্মতির একটি ভূমিকা রয়েছে।
কিন্তু আইন যদি নিজেই বলে দেয় যে award-এ যত গুরুতর ত্রুটিই থাকুক, কোনো আদালতে তা প্রশ্ন করা যাবে না—তখন বিষয়টি ভিন্ন।
বিশেষ করে যেখানে tribunal-এর jurisdiction, procedural fairness বা arbitrator-এর impartiality নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন ওঠে, সেখানে অন্তত সীমিত judicial remedy থাকা arbitration-এর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং award-এর গ্রহণযোগ্যতাকেই শক্তিশালী করে।
আমাদের উচ্চ আদালতে সাম্প্রতিক সময়ে প্রদত্ত একটি রায় গুরুত্বপূর্ণ। BASIC Bank Limited v. Business Resources Limited and another, First Miscellaneous Appeal No. 129 of 2024 মামলায় আপিলকারী পক্ষে এই যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ একটি বিশেষ আইন, এবং এর ধারা ৩৬-এ অন্য আইনের ওপর এর প্রাধান্যের কথা বলা হয়েছে। ধারা ৩৬(৪) অনুযায়ী, সালিশি ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রোয়েদাদ (award) চূড়ান্ত। তাই এই আইনের অধীনে দেওয়া রোয়েদাদ বাতিলের জন্য সালিশ আইন, ২০০১-এর ধারা ৪২ প্রযোজ্য নয়।
উক্ত আপিলে আপিলকারীর পক্ষে সিদ্ধান্ত প্রদান করা হলেও, আদালত ঠিক এই যুক্তির ভিত্তিতে আপিলটি মঞ্জুর করেননি। অর্থাৎ, আপিলের ফলাফল আপিলকারীর অনুকূলে গেলেও, বর্তমান ক্ষেত্রে যে নির্দিষ্ট আইনগত যুক্তিটির ওপর নির্ভর করা হচ্ছে, সেই যুক্তিটি আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তি ছিল না।
আদালত সালিশ আইন, ২০০১-এর ধারা ৪৩-এর grounds-ও পরীক্ষা করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট award বাতিল করার মতো কারণ পাননি, তাই আপিলটি মঞ্জুর করেছেন। সালিশে প্রদত্ত award-কে final (চূড়ান্ত) বিবেচনা করা এবং arbitral process-এর ওপর আদালতের ন্যূনতম supervisory jurisdiction থাকা—এই দুইয়ের মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য রাখার যৌক্তিক তাড়না থেকেই আদালত সালিশ আইন, ২০০১-এর ধারা ৪৩-এর নিরিখেই মামলাটি নিষ্পত্তি করেছেন মর্মে প্রতীয়মান হয়।
ধারা ৩৬(৪) পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে
সমাধান অবশ্যই এই নয় যে, arbitral award হওয়ার পর যে কোনো অসন্তুষ্ট পক্ষ আদালতে গিয়ে আবার পুরো বিরোধের বিচার চাইবে। তাতে সালিশের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
বরং ধারা ৩৬(৪) সংশোধন করে অত্যন্ত সীমিত ও সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে আদালতের হস্তক্ষেপের সুযোগ রাখা যেতে পারে—যেমন tribunal-এর substantive jurisdiction না থাকা, গুরুতর procedural irregularity, কোনো পক্ষকে ন্যায়সংগতভাবে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ না দেওয়া, arbitrator-এর bias বা conflict of interest, fraud বা corruption কিংবা public policy-এর মৌলিক লঙ্ঘন।
একই সঙ্গে ভিত্তিহীন challenge ঠেকাতে আদালতকে frivolous application প্রাথমিক পর্যায়েই খারিজ করা এবং প্রয়োজনে substantial costs আরোপের ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে। এতে সালিশের দ্রুততা ও finality বজায় থাকবে, আবার গুরুতর অন্যায়ের ক্ষেত্রেও প্রতিকারের পথ পুরোপুরি বন্ধ হবে না।
শেষ কথা
সালিশি রোয়েদাদ সহজে আদালতে গিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া উচিত নয়। তা হলে arbitration-এর স্বাতন্ত্র্য ও কার্যকারিতা নষ্ট হবে। কিন্তু আদালতের সীমিত supervisory jurisdiction এবং arbitration-এর finality পরস্পরবিরোধীও নয়।
আদালতের কাজ সালিশি ট্রাইব্যুনালের জায়গায় বসে বিরোধটি দ্বিতীয়বার বিচার করা নয়। আদালতের ভূমিকা সীমিত থাকতে পারে সালিশি প্রক্রিয়ার মৌলিক বৈধতা, এখতিয়ার, নিরপেক্ষতা ও ন্যায়সংগততা নিশ্চিত করার মধ্যে।
এই ভারসাম্যের আলোকে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ধারা ৩৬(৪) পুনর্বিবেচনার এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনীর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
সালিশি রোয়েদাদ বিরোধের শেষ কথা হওয়াই কাম্য; কিন্তু গুরুতর আইনগত ত্রুটি বা মৌলিক অন্যায়ের ক্ষেত্রেও সেটি প্রশ্নাতীত শেষ কথা হওয়া উচিত কি না—ধারা ৩৬(৪) প্রসঙ্গে সেই প্রশ্নটিই বিবেচনার দাবি রাখে।
লেখক : কামাল হোসেন মিয়াজী, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

