ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ৩ বছর হলেই বদলি
ভূমি মন্ত্রণালয়

নামজারির নিয়মে বড় পরিবর্তন, উত্তরাধিকারী জমিতে যৌথ খতিয়ান বাধ্যতামূলক

জমি ক্রয় কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা পাওয়ার পর শুধু দলিল রেজিস্ট্রি করলেই মালিকানার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয় না। সরকারি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে নামজারি বা মিউটেশন করাও জরুরি। এবার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারি এবং জমির শ্রেণি হালনাগাদে নতুন নিয়ম চালু করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি ভাগ-বাটোয়ারা না হলে কোনো ওয়ারিশের নামে আলাদা খতিয়ান করা যাবে না। সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে যৌথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যাও উল্লেখ থাকবে। এ ক্ষেত্রে আলাদা বণ্টননামা দলিলের প্রয়োজন হবে না।

তবে ওয়ারিশরা নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা বা আপস-বণ্টননামা দলিল থাকতে হবে। একইভাবে পৃথকভাবে ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা দিতে চাইলে নিজ নিজ নামে আলাদা খতিয়ানের প্রয়োজন হবে।

উত্তরাধিকারী জমিতে ‘আগে যৌথ, পরে আলাদা’

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা প্রজ্ঞাপনে নামজারি সংক্রান্ত এসব পরিবর্তনের কথা বলা হয়। নতুন ব্যবস্থায় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে ‘আগে যৌথ, পরে আলাদা’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তাঁর জমির সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথ নামজারি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ওয়ারিশদের ‘কো-শেয়ারার’ হিসেবে দেখানো হবে।

যৌথ নামজারির জন্য ওয়ারিশ সনদই যথেষ্ট। শুধু বণ্টননামা না থাকার কারণে যৌথ নামজারির আবেদন নামঞ্জুর করা যাবে না। তবে আবেদন করার সময় সব ওয়ারিশের তথ্য, ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে হবে। কোনো বৈধ ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

ওয়ারিশ সনদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র অথবা সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কমিশনারের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হবে।

আলাদা খতিয়ান করতে নিবন্ধিত বণ্টননামা

উত্তরাধিকারীরা নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ-বাটোয়ারা করে প্রত্যেকে যার যার অংশ বুঝে নিলে এবং সেই বণ্টন সরকারিভাবে নিবন্ধন করলে সেটিকে নিবন্ধিত বণ্টননামা বা আপস-বণ্টননামা বলা হয়।

এ ধরনের নিবন্ধিত দলিল থাকলে ওয়ারিশরা পৃথকভাবে নামজারি করে নিজ নিজ নামে আলাদা খতিয়ান করতে পারবেন।

অর্থাৎ উত্তরাধিকারী জমির নামজারিতে এখন মূলত দুটি ব্যবস্থা রয়েছে। প্রথমত, কোনো বণ্টন না হলে সব ওয়ারিশের নামে যৌথ খতিয়ান। দ্বিতীয়ত, নিবন্ধিত বণ্টননামা থাকলে প্রত্যেকের নামে পৃথক খতিয়ান।

নামজারি ছাড়া জমি রেজিস্ট্রেশন, দান বা হেবা নয়

নতুন ব্যবস্থায় নামজারি বা খতিয়ান থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ করা হয়েছে। নামজারি ছাড়া জমি কেনাবেচা, দান বা হেবা করা যাবে না। জমি নিবন্ধনের সময় সংশ্লিষ্ট খতিয়ান দেখানোর প্রয়োজন হবে।

তবে আগে থেকেই কারও নামে নামজারি সম্পন্ন হয়ে থাকলে নতুন করে নামজারি করার প্রয়োজন নেই। যেমন, ২০১৫ সালে কোনো জমির নামজারি সম্পন্ন হয়ে খতিয়ান সঠিকভাবে তার নামে রেকর্ড হয়ে থাকলে একই জমির জন্য আবার নামজারি করতে হবে না।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, পুরোনো খতিয়ান ও রেকর্ড ডিজিটাল সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, তা অনলাইনে যাচাই করে রাখা ভালো। কারণ ডিজিটাল রেকর্ডে তথ্য না থাকলে ভবিষ্যতে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ কিংবা জমি হস্তান্তরের সময় জটিলতা দেখা দিতে পারে।

২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে নামজারি নিষ্পত্তির লক্ষ্য

বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমিসেবা পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে নামজারির আবেদন করা যায়। মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নামজারির আবেদন ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা।

নামজারির আবেদনে সাধারণত জমির রেজিস্ট্রি দলিল বা দলিলের কপি, পূর্ববর্তী খতিয়ানের তথ্য ও দাগ নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা হলে ওয়ারিশ সনদ ও মৃত্যুসনদ প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি নির্ধারিত ফি পরিশোধের রসিদও দিতে হয়।

তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অসম্পূর্ণ থাকলে অথবা জমি নিয়ে বিরোধ, মালিকানা জটিলতা কিংবা অন্য কোনো আইনগত সমস্যা থাকলে নিষ্পত্তিতে বেশি সময় লাগতে পারে।

নামজারি না করলে যেসব সমস্যা হতে পারে

জমি কেনার পর বা উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা পাওয়ার পর নামজারি না করলে সরকারি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত হয় না। এতে ভবিষ্যতে মালিকানা নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

রেকর্ডে প্রকৃত মালিকের নাম না থাকলে অন্য ওয়ারিশ বা অবৈধ দখলদার জমির ওপর দাবি তুলতে পারেন। একই সঙ্গে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ এবং পরবর্তী সময়ে জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও জটিলতা দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরাধিকারী জমিতে সব ওয়ারিশের নাম যৌথভাবে রেকর্ড করার ফলে একজন ওয়ারিশ গোপনে পুরো সম্পত্তি নিজের নামে রেকর্ড করে নেওয়ার সুযোগ কমবে। এতে সরকারি রেকর্ডে প্রকৃত মালিকদের স্বীকৃতি নিশ্চিত হবে এবং জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও প্রতারণা কমতে পারে।

বিশেষ করে নারী ওয়ারিশদের অধিকার রক্ষায় যৌথ নামজারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন ভূমি আইনজীবীরা।

নামজারির সময়ই জমির শ্রেণি হালনাগাদ

এদিকে নামজারি প্রক্রিয়ায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এখন থেকে জমির নামজারি করার সময় বাস্তবে জমিটি কোন শ্রেণির, তা যাচাই করে সেই তথ্য নামজারি খতিয়ানে হালনাগাদ করার ব্যবস্থা ই-মিউটেশন সিস্টেমে যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সাদেকুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ নির্দেশনার কথা জানানো হয়। মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাইজেশন, নলেজ ম্যানেজমেন্ট ও পারফরম্যান্স অনুবিভাগ থেকে চিঠিটি জারি করা হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার অন্যতম সমস্যা হলো জমির রেকর্ডিয় শ্রেণি নিয়মিত হালনাগাদ না হওয়া। প্রাকৃতিক কারণে কিংবা মানুষের প্রয়োজনে জমির বাস্তব শ্রেণি পরিবর্তিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে সরকারি রেকর্ডে তা প্রতিফলিত হয় না।

এর ফলে জমি রেজিস্ট্রেশনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে জমির প্রকৃত ও যথাযথ মূল্য নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হয়। পাশাপাশি সরকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।

বাড়বে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় ও রাজস্ব

ভূমি মন্ত্রণালয় মনে করছে, ই-মিউটেশন ব্যবস্থায় জমির বাস্তব শ্রেণি হালনাগাদের সুবিধা যুক্ত হলে সরকারি রেকর্ডে জমির প্রকৃত ব্যবহার আরও সঠিকভাবে প্রতিফলিত হবে।

এর ফলে ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণ ও আদায় আরও কার্যকর হবে। পাশাপাশি জমির যথাযথ মূল্য নির্ধারণ করা সহজ হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে।

নির্দেশনাটি বাস্তবায়নের জন্য ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

ভূমি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জমি কেনার পর দলিল রেজিস্ট্রির ৯০ দিনের মধ্যে নামজারির আবেদন করা উচিত। আর উত্তরাধিকারী জমির ক্ষেত্রে পরিবারের সব ওয়ারিশকে নিয়ে যৌথভাবে নামজারি করাই নিরাপদ।

প্রয়োজনে পরবর্তীতে নিবন্ধিত বণ্টননামার মাধ্যমে জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করা যাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন ব্যবস্থায় একদিকে যেমন সরকারি ভূমি রেকর্ডে প্রকৃত মালিকদের নাম নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে ওয়ারিশদের মধ্যে গোপনীয়তা ও প্রতারণার সুযোগ কমবে। একই সঙ্গে জমি সংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমা কমানোর ক্ষেত্রেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে মাঠপর্যায়ে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পরিবারের কোনো ওয়ারিশ বিদেশে থাকলে, যোগাযোগের বাইরে থাকলে কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে সমস্যা হলে যৌথ নামজারির আবেদন প্রস্তুত করা কঠিন হতে পারে। আবার পৃথক খতিয়ানের জন্য নিবন্ধিত বণ্টননামা করার কারণে অতিরিক্ত সময় ও খরচের প্রয়োজন হবে।

এ ছাড়া নির্ধারিত ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে নামজারি নিষ্পত্তি করতে হলে তহশিল ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে, নতুন নিয়মে উত্তরাধিকারী জমির ক্ষেত্রে সরকারি রেকর্ডে সব মালিকের স্বীকৃতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নামজারি ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নামজারির সময় জমির বাস্তব শ্রেণি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা চালু হলে ভূমি ব্যবস্থাপনা, কর আদায় এবং সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়বে বলে আশা করছে ভূমি মন্ত্রণালয়।