বিশেষ পিপির ওপর হামলা, আইনজীবীর সদস্যপদ একমাসের জন্য স্থগিত
জেলা আইনজীবী সমিতি, রংপুর

ভোটাধিকার ও ‘কালাকানুন’ বাতিলের দাবিতে রংপুর আদালতে সংঘর্ষ, সন্ধ্যায় সমঝোতা

ভোটাধিকার হরণসহ আইনজীবী সমিতির বিভিন্ন ‘কালাকানুন’ বাতিলের দাবিতে নতুন আইনজীবীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রংপুর আদালত চত্বরে দিনভর উত্তেজনা, বিক্ষোভ, হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় এক সাংবাদিককে মারধর করে তার ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ও পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা দিনভর চলার পর সন্ধ্যায় নতুন আইনজীবীদের দাবির একটি অংশ মেনে নেয় রংপুর আইনজীবী সমিতি। এরপর সন্ধ্যা ৬টা থেকে নতুন আইনজীবীদের ভর্তি কার্যক্রম আবার শুরু হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

সমিতি জানিয়েছে, আগামী ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন আইনজীবীদের ভর্তি কার্যক্রম চলবে।

অতিরিক্ত ফি ও মুচলেকার প্রতিবাদে বিক্ষোভ

মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকেই রংপুর আদালত চত্বরে বিক্ষোভ শুরু করেন নতুন আইনজীবীরা। তাদের অভিযোগ, সমিতিতে সদস্যপদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফি আদায় করা হচ্ছে এবং ভোটাধিকার না রাখার বিষয়ে মুচলেকা নেওয়া হচ্ছে।

এসব নিয়ম বাতিলের দাবিতে নতুন আইনজীবীরা বিক্ষোভ ও স্লোগান দিতে থাকেন।

বেলা ১টার পর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফতাব হোসেন অতিরিক্ত ফি এবং মুচলেকা বাদ দিয়ে নতুন আইনজীবীদের সমিতিতে ভর্তি করার নির্দেশ দিলে আন্দোলনের উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়। এরপর নতুন আইনজীবীদের ভর্তি কার্যক্রমও শুরু হয়।

সভাপতির নির্দেশে ভর্তি বন্ধ, ফের উত্তেজনা

তবে বেলা ৩টার পর পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় আইনজীবী সমিতির সভাপতি শাহেদ কামাল ইবনে খতিব আদালত চত্বরে এসে নতুন আইনজীবীদের ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা।

এরপর নতুন আইনজীবীরা আবার বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরাও যোগ দেন।

এ সময় তারা আইনজীবী সমিতিকে ‘আওয়ামী লীগের দালালমুক্ত’ করার দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা সমিতির সভাপতি শাহেদ কামাল ইবনে খতিবের চেম্বার ঘিরে ফেলেন। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হয়।

বিএনপি নেতাদের উপস্থিতি, নারী আইনজীবীকে ধাক্কার অভিযোগ

এরই মধ্যে রংপুর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম মিজুসহ বিএনপির সিনিয়র নেতারা আদালত চত্বরে উপস্থিত হন।

তারা আইনজীবী সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য নতুন আইনজীবী জেবুন্নেসা জেবুর মাধ্যমে সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে খবর পাঠান।

জেবুন্নেসা সেখানে গিয়ে সমিতির কার্যনির্বাহী সদস্য সিধাংশুকে বিষয়টি জানাতে গেলে তিনি তাকে ধাক্কা দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে যায়।

এরপর নতুন আইনজীবীরা সিধাংশুকে ধাওয়া করে মারধর করেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এর প্রতিবাদ করেন পুরোনো আইনজীবীরা। পরে সিধাংশুকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

এ ঘটনায় সিধাংশুর বিচারের দাবিতে নতুন আইনজীবীরা আবারও বিক্ষোভ শুরু করেন। এরই মধ্যে মহানগর যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও মিছিল নিয়ে আদালত চত্বরে প্রবেশ করেন।

‘পা দিয়ে খচিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে’

হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করা নতুন আইনজীবী জেবুন্নেছা জেবু বলেন, সামসুজ্জামান সামু আইনজীবী সমিতির সদস্য সিধাংশুকে ডাকলেও তিনি শুনছিলেন না। তখন তিনি সিধাংশুকে জানান, ‘সামু ভাই ডাকতেছে।’

জেবুন্নেছার দাবি, এরপর সিধাংশু উত্তেজিত হয়ে তাকে ধাক্কা দেন এবং পা দিয়ে আঘাত করে মেরে ফেলার চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, ‘বিপুল ভাই যদি আমাকে না বাঁচাতো তাহলে আজকে আমি মরেই যেতাম।’

ভোটাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা কেন ভোটাধিকার হরণের মুচলেকা দেব? মানুষ ভোটের জন্যই সবকিছু করে। আমরা ভোটার হবো না বলে সমিতিকে মুচলেকা দেব—এটা কখনই হবে না। আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।’

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিএনপি সরকারের আমলেও যোগসাজশের মাধ্যমে সমিতির সভাপতি একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে বিএনপি-জামায়াতপন্থী আইনজীবীদের কোনঠাসা করার চেষ্টা করছেন। তার অভিযোগ, বিএনপিপন্থী সাধারণ সম্পাদককেও কোনঠাসা করে রাখা হচ্ছে।

জেবু বলেন, ‘সে ধমক দিয়ে কথা বলে সব সময়। আজকে তার গুন্ডা সিধাংশু জেবা আপার ওপর হামলা করেছে। আমরা এর বিচার চাই। কালাকানুন সব বাতিল চাই।’

‘নতুন আইনজীবীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে’

আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে অংশ নেওয়া জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্যসচিব শফি কামাল বলেন, রংপুর আইনজীবী সমিতিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘কালাকানুন’ চলে আসছে।

তিনি বলেন, ‘এখানে কেউ ভোটাধিকার পাবে, কেউ ভোটাধিকার পাবে না। এই ভোটাধিকারের জন্য বাংলার মানুষ দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলন করেছে। সেই ভোটাধিকার হরণ হচ্ছে সমিতিতে।’

তার অভিযোগ, নতুন আইনজীবীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পাঁচ লাখ, ছয় লাখ, এমনকি আরও বেশি টাকা নিয়ে সদস্য করা হচ্ছে। কিন্তু সদস্য হওয়ার পরও তাদের ভোটাধিকার দেওয়া হচ্ছে না।

শফি কামাল বলেন, নতুন আইনজীবীদের আন্দোলনের পর সাধারণ সম্পাদক আফতাব হোসেন মুচলেকা বাদ দিয়ে নির্ধারিত ফি দিয়ে সদস্যপদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। এতে দুপুর থেকে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়।

তবে তার অভিযোগ, সমিতির সভাপতি শাহেদ ইবনে খতিব ও তার লোকজন গিয়ে সাধারণ সম্পাদকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ওই আদেশ প্রত্যাহার করান এবং ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ করে দেন।

এরপর বিএনপি নেতৃবৃন্দ সেখানে আসেন। এরই মধ্যে সমিতির সদস্য সিধাংশু একজন নতুন আইনজীবীকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

‘আমি মুচলেকা ছাড়াই ভর্তি হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলাম’

রংপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফতাফ হোসেন বলেন, নতুন আইনজীবীদের আন্দোলনের মুখে তিনি ভোটাধিকার সংক্রান্ত মুচলেকা না নিয়েই তাদের ভর্তি করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

তবে তিনি অভিযোগ করেন, ‘আমি সভাপতিসহ অন্যান্যদের মবের শিকার হই।’

সভাপতির বক্তব্য

অন্যদিকে রংপুর আইনজীবী সমিতির সভাপতি শাহেদ কামাল ইবনে খতিব বলেন, সাধারণ সম্পাদকের ওপর মব তৈরি কিংবা নতুন আইনজীবীকে ধাক্কা দেওয়ার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।

তিনি বলেন, ‘আপনারা তদন্ত করেন।’

আলোচনার পর সমঝোতা

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রংপুর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বৈঠকের পর ভোটাধিকার সংক্রান্ত মুচলেকা ছাড়া ১০ শতাংশ অতিরিক্ত ফি দিয়ে নতুন আইনজীবীদের সদস্যপদ দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়।

এরপর সন্ধ্যা ৬টা থেকে আবার ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়। ভর্তি কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে।

সমিতি জানিয়েছে, আগামী ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন আইনজীবীদের ভর্তি কার্যক্রম চলবে।

সামসুজ্জামান সামু বলেন, ভোটাধিকার হরণে মুচলেকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমিতি ‘কালাকানুন’ করেছে। এর বিরুদ্ধেই আইনজীবীদের আন্দোলন চলছে।

তার দাবি, নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ আইনজীবী এসব নিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন। আন্দোলনের মুখে সমিতি নতুন সদস্য ভর্তি বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে ভর্তি কার্যক্রম শুরু করতে বাধ্য হয়েছে।

তিনি বলেন, বাকি ‘কালাকানুনের’ বিরুদ্ধেও বসে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে রংপুরে ১০৮ জন নতুন আইনজীবী লাইসেন্সভুক্ত হয়েছেন। তাদের সমিতির সদস্যপদ, ফি এবং ভোটাধিকার নিয়ে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।