রাম চন্দ্র দাশ
রাম চন্দ্র দাশ

হাইকোর্টে শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের জন্য নির্দেশিকা

ভূমিকা

বিজ্ঞ আইনজীবী বন্ধুগণ, আপনারা যারা সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে প্র্যাকটিস করার কথা ভাবছেন, তাদেরকে শুভেচ্ছা। আপনাদের জন্যই এই ছোট লেখার অবতারণা।

আপনারা ভালোভাবেই জানেন যে, আইনপেশা একটি দক্ষতাভিত্তিক পেশা। এই পেশার গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক দক্ষতাসমূহের মধ্যে রয়েছে—(১) বিশ্লেষণী দক্ষতা (বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনার গভীর বিশ্লেষণ); (২) আইন সম্পর্কে গবেষণা (নির্দিষ্ট মামলায় প্রাসঙ্গিক আইন যথাযথভাবে প্রয়োগের জন্য আইন ও নজিরসমূহ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ); (৩) কোর্টের জন্য পিটিশন ড্রাফট করা ও অন্যান্য আইনগত দলিল প্রস্তুত করা; (৪) সাক্ষী পরীক্ষা (জবানবন্দি ও জেরা) করা; (৫) আইনগত যুক্তি ও বক্তব্য প্রস্তুত করা; (৬) আদালতের সামনে যুক্তি ও বক্তব্য প্রভাবশালী ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা; এবং (৭) যোগাযোগ ও সমঝোতার দক্ষতা।

এই দক্ষতাগুলো শুধুমাত্র আইনের তাত্ত্বিক বিষয়গুলো পড়লেই আদালতে ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে না। এর জন্য প্রয়োজন সু-নিবিড় প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জন, আর এর অন্যতম উপায় হলো কার্যকরভাবে শিক্ষানবিশি করা।

এই নিবন্ধের প্রধান উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে শিক্ষানবিশির বিধানসমূহ ব্যাখ্যা করা এবং শিক্ষানবিশিকে কার্যকর করার জন্য কিছু কৌশল তুলে ধরা।

হাইকোর্টে শিক্ষানবিশি সংক্রান্ত বিধান

যেসব আইনজীবীগণ হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে সফলভাবে ও মর্যাদার সঙ্গে প্র্যাকটিস করতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য শিক্ষানবিশি একটি কার্যকর পদ্ধতি ও আবশ্যকীয় বিষয়। এছাড়া, হাইকোর্ট বিভাগে প্র্যাকটিসের অনুমতি (Permission to Practice before the High Court Division) লাভের জন্য শিক্ষানবিশির বিধান পালনের পাশাপাশি দুই ধাপে লিখিত ও মৌখিক (Viva-voce) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।

মূলত Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order and Rules, 1972-এর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রিত হয়। তবে সফল শিক্ষানবিশি সম্পন্ন করার জন্য আমাদের দেশে শিক্ষানবিশির উদ্দেশ্য ও কার্যপ্রণালি সুনির্দিষ্টভাবে কোথাও নির্দেশিত নয়। তা সত্ত্বেও, কিছু আইনজীবীর চেম্বারে ব্যক্তিগত পর্যায়ে শিক্ষানবিশির কিছু ভালো চর্চা বিদ্যমান রয়েছে।

বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর ২১ ও ২২ অনুচ্ছেদ এবং বার কাউন্সিল বিধি ৬৫এ-তে হাইকোর্ট বিভাগের শিক্ষানবিশি ও সংশ্লিষ্ট সিলেবাসের বিধান নিম্নরূপ উল্লেখ করা হয়েছে।

১. শিক্ষানবিশিকালের মেয়াদ

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে ১০ বছরের প্র্যাকটিসরত একজন আইনজীবীর অধীনে কমপক্ষে ৬ মাসের প্রশিক্ষণ, অর্থাৎ শিক্ষানবিশি করতে হবে।

অথবা, যেসব আইনজীবী Called to the Bar অথবা ৪ বছর মেয়াদি এলএলবি (সম্মান) কোর্সের পর উচ্চ দ্বিতীয় শ্রেণিসহ এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের একজন ‘সিনিয়র অ্যাডভোকেট’-এর অধীনে ১ বছর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে।

২. লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার সিলেবাস

লিখিত পরীক্ষা—২৫ নম্বর।

নিম্নলিখিত বিষয়ে Drafting করতে হবে—

  • দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের মেমো;
  • Habeas Corpus Petition (ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯১ ধারা মোতাবেক);
  • ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১এ ধারার অধীন Petition;
  • দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫ ধারার অধীন Civil Revision; এবং
  • Writ Petition।

এছাড়া মৌখিক পরীক্ষা (Viva-voce)—২৫ নম্বর।

৩. মামলার তালিকা

শিক্ষানবিশকে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মিলিয়ে মোট ২৫টি মামলার তালিকা দাখিল করতে হবে, যেসব মামলায় আদালতে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর সঙ্গে শিক্ষানবিশ হিসেবে তিনি উপস্থিত ছিলেন।

শিক্ষানবিশির সম্ভাব্য উদ্দেশ্য

আমাদের দেশে যদিও শিক্ষানবিশির উদ্দেশ্য ও কার্যপ্রণালি সুস্পষ্টভাবে কোথাও নির্ধারিত নেই; তথাপি, উপরোক্ত বিধানসমূহ এবং শিক্ষানবিশদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এর উদ্দেশ্যসমূহ নির্ধারণ করা যায়।

হাইকোর্ট বিভাগে শিক্ষানবিশির সম্ভাব্য উদ্দেশ্যগুলো নিম্নরূপ বিবেচনা করা যেতে পারে—

ক) হাইকোর্ট বিভাগে প্র্যাকটিসের অনুমতি লাভের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা।

খ) হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিসের প্রাথমিক ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা।

গ) প্রাসঙ্গিক আইন ও মামলার নজির এবং সেগুলোর প্রয়োগ সম্পর্কে জানা ও ব্যাখ্যা করতে শেখা।

ঘ) দেওয়ানি, ফৌজদারি ও রিট পিটিশনের মৌলিক Drafting-এর দক্ষতা অর্জন করা, যা হাইকোর্টে প্র্যাকটিসের অনুমতি লাভের লিখিত পরীক্ষার একটি অংশ।

কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সুপারিশকৃত কৌশল ও কার্যক্রম

১. সিনিয়র আইনজীবীর সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ত থাকুন

একজন সিনিয়র আইনজীবীর সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ত থাকুন এবং তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করে আপনার সুবিধাজনক সময় ও পদ্ধতি অনুযায়ী শিক্ষানবিশিকালের পরিকল্পনা গ্রহণ করুন।

২. আদালত ও চেম্বারে সময় দিন

আপনার সিনিয়রের সঙ্গে পরামর্শ করে আদালত অথবা চেম্বারে অথবা উভয়ক্ষেত্রে পূর্ণকালীন (সর্বোত্তম পদ্ধতি) অথবা খণ্ডকালীন (Part-time) মাসে অন্তত কয়েকদিন উপস্থিত থাকার একটি সময়সূচি তৈরি করুন।

৩. চেম্বারের কাজে সিনিয়রকে সহযোগিতা করুন

চেম্বারের কাজে সিনিয়রকে সহযোগিতা করুন। যেমন—Dictation নেওয়া, Drafting-এ সহযোগিতা করা, নির্দিষ্ট আইন ও নজির খুঁজে বের করা ইত্যাদি।

৪. গুরুত্বপূর্ণ নথি পড়ুন

সিনিয়রের অনুমতি নিয়ে চেম্বারে Draft, দাখিলকৃত Petition, নিম্ন আদালতের রায়, ডিক্রি/আদেশ, সাক্ষী এবং অন্যান্য দলিল পড়ুন।

৫. হাইকোর্টের বিভিন্ন পিটিশন বোঝার চেষ্টা করুন

হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন ধরনের পিটিশনের বিভিন্ন অংশ বোঝার চেষ্টা করুন। যেমন—Language and Style, Legal Terms/Phrases, Cause Title; আইনের প্রয়োগ; ঘটনার বিবরণ (Statement of Facts); Submissions/Grounds; Prayer ইত্যাদি।

৬. আদালতের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করুন

আদালতের কার্যক্রম, বিশেষ করে Motion Court-এর কার্যক্রম—Civil, Criminal এবং Writ—মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করুন এবং নোট করুন।

৭. আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শুনুন

আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং আইনগত বিষয় ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে নোট গ্রহণ করুন।

৮. সিনিয়র ও সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করুন

আপনার সিনিয়র এবং/অথবা চেম্বারের সহকর্মীদের সুবিধাজনক সময়ে সংশ্লিষ্ট আইন ও মামলার ঘটনা সম্পর্কে প্রশ্ন করুন এবং বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করুন।

৯. হাইকোর্ট পারমিশন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিন

High Court Permission Examination-এর সিলেবাস, হাইকোর্ট বিভাগের এখতিয়ার, পূর্ববর্তী বছরের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এবং পরীক্ষা সংক্রান্ত বই ও গাইড সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা অর্জন করুন।

১০. নিয়মিত Drafting অনুশীলন করুন

লিখিত পরীক্ষার উপরোক্ত বিষয় মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করুন, নিজের Drafting-এর নোট তৈরি করুন এবং নিয়মিত Drafting-এর অনুশীলন করুন।

১১. Study Group-এ যুক্ত হন

সহকর্মী ও অন্যান্য শিক্ষানবিশদের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক আইনগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করুন। প্রয়োজনে একটি আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিক Study Group-এ যোগ দিতে পারেন অথবা নিজেই গঠন করতে পারেন।

১২. আইন, সংবিধান ও নজির অধ্যয়ন করুন

প্রাসঙ্গিক আইনসমূহ, সংবিধান, ‘ল রিপোর্ট’ যেমন DLR, BLC, হাইকোর্ট বিভাগের রায় (ওয়েবসাইট থেকে), হাইকোর্টে প্র্যাকটিস সম্পর্কিত বই এবং ইন্টারনেটের বিভিন্ন উৎস থেকে সংশ্লিষ্ট উপকরণ যেমন Google ও YouTube থেকে অধ্যয়ন করুন।

১৩. The Supreme Court (High Court Division) Rules, 1973 পড়ুন

“The Supreme Court (High Court Division) Rules, 1973” অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পড়ুন এবং হাইকোর্ট বিভাগের কার্যপ্রণালি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নোট করে রাখুন।

১৪. নিজের অভিজ্ঞতা নিয়মিত নোট করুন

সবশেষে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ, আপনার পর্যবেক্ষণ, লব্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়মিত ও সুশৃঙ্খলভাবে নোট করুন এবং মাঝে মাঝে চর্চা করুন।

উপসংহার

যেসব আইনজীবী হাইকোর্ট বিভাগে সফলভাবে প্র্যাকটিস করার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে চান, তাদের জন্য বাস্তবিক অর্থে নিবিড় ও সুশৃঙ্খল শিক্ষানবিশির কোনো বিকল্প নেই।

অতএব, প্রত্যেক শিক্ষানবিশ তাঁর নিজের সুবিধা, প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে শিক্ষানবিশি সম্পন্ন করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেন। আশা করি, এই সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকাটি আপনাদের সকলের জন্য সহায়ক হবে।

লেখক : রাম চন্দ্র দাশ; অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ। ই-মেইল: ram.chandra.das@gmail.com