কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অন্যতম জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বিচারিক জীবনের দীর্ঘ পথচলা শেষে অবসরে গেছেন। বিদায়লগ্নে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি মন্তব্য করেছেন— একজন বিচারকের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ক্ষমতার প্রতি নয়; বরং তাঁর পরম আনুগত্য সংবিধান, আইন এবং নিজের বিবেকের প্রতি।
আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) আপিল বিভাগের ১ নম্বর এজলাস কক্ষে তাঁর শেষ কর্মদিবসে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
সুপ্রিম কোর্টের রীতি অনুযায়ী আজ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামকে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বার) পক্ষ থেকে রাজকীয় বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবর্ধনা সভায় রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস (কাজল) এবং আইনজীবীদের পক্ষে বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। এ সময় প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের অন্যান্য বিচারপতি এবং বিপুলসংখ্যক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
৪ দশকের পথচলার সমাপ্তি, ন্যায়ের আদর্শের শেষ নেই
বিদায়ী বক্তব্যে আবেগঘন কণ্ঠে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বলেন, “আজ আমার বিচারিক জীবনের একটি বিশেষ দিন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে দুই দশকেরও বেশি সময় নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনের পর আজ আমি অবসর নিচ্ছি। তবে আমি এটিকে শুধু বিচারিক জীবনের সমাপ্তি হিসেবে দেখি না; বরং আইনাঙ্গনে চার দশকেরও বেশি সময়ের সামগ্রিক পথচলার একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখছি।”
তিনি সুদৃঢ় কণ্ঠে উল্লেখ করেন:
আমি আজ বিদায় নিচ্ছি বিচারকের আসন থেকে, কিন্তু ন্যায়ের আদর্শ থেকে নয়। সংবিধানের প্রতি আমার আনুগত্য, আইনের শাসনের প্রতি আমার বিশ্বাস এবং এই মহান প্রজাতন্ত্রের প্রতি আমার অঙ্গীকার আজীবন অক্ষুণ্ণ থাকবে। বিচারকের পদ থেকে অবসর নেওয়া যায়, কিন্তু ন্যায়বিচারের আদর্শ থেকে কখনো অবসর নেওয়া যায় না। যতদিন সামর্থ্য থাকবে, দেশের কল্যাণে এবং বিচার বিভাগের উন্নয়নে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে কাজ করে যাব।
বিচার বিভাগ আমাদের সবার: বার ও বেঞ্চের যৌথ প্রয়াস
বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষায় সম্মিলিত দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “বিচার বিভাগ শুধু বিচারকদের কিংবা শুধু আইনজীবীদের নয়। এই বিচার বিভাগ আমাদের সবার। বিচারক, আইনজীবী, কর্মকর্তা-কর্মচারী—আমরা সবাই এই প্রতিষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা যদি সবাই বিচার বিভাগকে নিজের প্রতিষ্ঠান বলে মনে করি, তাহলে এর মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। বিচার বিভাগের শক্তি একা কোনো বিচারক বা আইনজীবীর শক্তি নয়, এটি আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের ফল।”
নবীন আইনজ্ঞদের জন্য বিশেষ পরামর্শ
পেশাগত উৎকর্ষ অর্জনে তরুণ আইনজীবীদের প্রতি দিকনির্দেশনা দিয়ে এই জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, “একজন আইনজ্ঞের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তাঁর সততা, তারপর চরিত্র এবং তারপর তাঁর গভীর অধ্যয়ন। আইন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং নতুন নতুন আইনি প্রশ্ন সামনে আসছে। আইনজ্ঞ হতে গেলে শেখার কোনো শেষ নেই। তাই নিয়মিত পড়তে হবে। সংবিধান, আইন, দেশি-বিদেশি রায় এবং বিচারতত্ত্ব জানতে হবে। বই হাতের কাছে না পেলে প্রয়োজনে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অনলাইনেই পড়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে হবে।”
বিচারিক দক্ষতা বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির আহ্বান
বিচার বিভাগের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও আধুনিকায়নের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “আগামী দিনে মামলার জট কমানো এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার বড় চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে রয়েছে। বিচার শুধু প্রতিষ্ঠিত হলেই চলবে না, মানুষকেও তা দেখতে হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে যে প্রকৃত বিচার হয়েছে। জনগণের আস্থাই বিচার বিভাগের মূল ভিত্তি।”
তিনি আরও বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, বিচক্ষণভাবে আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যবহার বিচার বিভাগের কর্মদক্ষতা বহুগুণ বাড়াবে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাবে এবং ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার আরও সহজ ও গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।”
পরিশেষে দেশের জেলা পর্যায়ের অধস্তন আদালতের বিচারকদের উদ্দেশ্যে তিনি সব সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতাকে জয় করে ধৈর্য সহকারে নির্ভয়ে ন্যায়ের পক্ষে থাকার আহ্বান জানান। তিনি মার্কিন সংবিধানের প্রণেতা আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের উক্তি স্মরণ করে বলেন, “বিচার বিভাগের প্রকৃত শক্তি বলপ্রয়োগে নয়; তার শক্তি নিহিত তার বিচারবোধ, স্বাধীনতা এবং জনগণের আস্থায়।”

