বরিশাল ব্যুরো | বরিশাল মহানগরীর অন্যতম প্রধান বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্র ‘ত্রিশ গোডাউন’ এলাকায় (কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে) পর্যটকবাহী নৌকা ও ট্রলারের মাঝিদের কাছ থেকে দীর্ঘ দিন ধরে অবৈধভাবে চাঁদা আদায়ের ঘটনায় স্ব-প্রণোদিত হয়ে মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বরিশালের অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও জাস্টিস অব দ্য পিস এস, এম, শরিয়ত উল্লাহ্ নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে গোপনে ধারণ করা ভিডিও চিত্রের ওপর ভিত্তি করে এই আদেশ জারি করেন।
আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বরিশালের অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও জাস্টিস অব দ্য পিস-এর কার্যালয় থেকে জারিকৃত আদেশের অনুলিপি (স্মারক নং-এ.সি.এম.এম.বরি-২০২৬/-২৫৪৯) মূলে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আদালতের বিশেষ নির্দেশের প্রেক্ষিতে ‘দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর, ১৮৯৮’ (CrPC)-এর ২৫ ধারা অনুযায়ী স্ব-প্রণোদিত হয়ে এই নথি (মিস কেস নং-০৪/২০২৬) খোলা হয়।
আদেশে কোতয়ালি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জকে (ওসি) এই ঘটনায় থানার একজন উপযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে এজাহারকারী (বাদী) করে অবিলম্বে নিয়মিত মামলা (এফআইআর) রেকর্ড করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারকের সামনে চাঁদাবাজি ও ভিডিও চিত্র ধারণ
আদালতের স্ব-প্রণোদিত আদেশের বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ১০ জুলাই ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস, এম, শরিয়ত উল্লাহ্ ব্যক্তিগতভাবে বরিশাল মহানগরীর ত্রিশ গোডাউন এলাকায় কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে অবস্থান করছিলেন। ওই সময় তাঁর সম্মুখেই পর্যটকবাহী নৌকা ও ট্রলারের অসহায় মাঝিদের কাছ থেকে অবৈধভাবে চাঁদা আদায়ের একটি প্রকাশ্য ঘটনা পরিলক্ষিত হয়। সে সময় বিচারক নিজেই সুকৌশলে গোপনে চাঁদাবাজির একটি স্পষ্ট ভিডিও চিত্র ধারণ করেন, যা মামলার নথিতে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক নৌকার মাঝিকে তাৎক্ষণিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তাঁরা জানান যে, সাঈম নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রতিদিন ত্রিশ গোডাউন এলাকার প্রত্যেক নৌকা ও ট্রলার থেকে ৫০/- (পঞ্চাশ) টাকা হারে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
সেখানে দীর্ঘদিন ধরে নৌকা চালানো এক বৃদ্ধ মাঝি আক্ষেপ করে বলেন, পূর্বে কখনো তাঁদের এভাবে চাঁদা দিতে হয়নি। কিন্তু গত এক-দেড় বছর ধরে সাঈম ও তার ক্যাডার বাহিনীকে নিয়মিত চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। চাঁদা না দিলে তাঁদের নদীতে নৌকা নামাতে দেওয়া হয় না বা মারধর করা হয়। অন্যান্য মাঝিরাও একইরূপ ভয়ংকর অভিযোগ করেন।
পর্যটনে নেতিবাচক প্রভাব ও দ্রুত বিচার আইনে মামলা
আদালত আদেশে উল্লেখ করেন, ত্রিশ গোডাউন এলাকাটি বরিশালের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিদিন কীর্তনখোলা নদীর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে বিভিন্ন জেলা থেকে অসংখ্য পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন এবং নৌ-ভ্রমণ উপভোগ করেন। কিন্তু মাঝিদের কাছ থেকে বেআইনি চাঁদাবাজির কারণে মাঝিরা যেমন প্রতিনিয়ত চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তেমনি তাঁদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ফলে পর্যটকদেরও বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এটি একটি গুরুতর আইনের লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ।
উক্ত অভিযোগে দণ্ডবিধির (Penal Code) ৩৮৫ ধারা (চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে ভয়ভীতি প্রদর্শন) এবং আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২-এর ৪ ও ৫ ধারার অপরাধসহ স্পষ্ট আমলযোগ্য অপরাধের উপাদান বিদ্যমান থাকায় আদালত কোতয়ালি থানাকে দ্রুত এফআইআর দায়েরের নির্দেশ দেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতি ৩ দফার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে (IO) তদন্ত শেষে আদালতে দাখিলব্য প্রতিবেদনে অন্যান্য বিষয়ের সাথে নিম্নবর্ণিত ৩টি বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক:
১. ইজারার সত্যতা যাচাই: ত্রিশ গোডাউনের ওই ঘাট বা স্থানটি সরকারিভাবে বা জেলা প্রশাসন কর্তৃক কাউকে আইনসম্মতভাবে ইজারা প্রদান করা হয়েছে কি-না?
২. চাঁদার সামগ্রিক হিসাব: ঠিক কত দিন থেকে এবং কতজন মাঝির কাছ থেকে দৈনিক কত টাকা হারে মোট কত টাকা অবৈধভাবে উত্তোলন বা চাঁদাবাজি করা হচ্ছে?
৩. নেপথ্যের অপরাধীদের তালিকা: এই অবৈধ টাকা উত্তোলনের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত মূল কুশীলব ও তাঁদের সহযোগীদের পূর্ণাঙ্গ নাম ও স্থায়ী ঠিকানা।
আদেশের অনুলিপি পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে বরিশালের মহানগর দায়রা জজ এবং চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটসহ (সিএমএম) সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে প্রেরণ করা হয়েছে।
আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘জাস্টিস অব দ্য পিস’ হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেটদের এ ধরনের স্ব-প্রণোদিত সাহসী পদক্ষেপ মাঠপর্যায়ে সাধারণ মেহনতি মানুষের ওপর চাঁদাবাজি ও স্থানীয় গুন্ডামির উৎপাত বন্ধে অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

