অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

হয়রানিমূলক চেকের মামলা থেকে বাঁচবেন যেভাবে: উচ্চ আদালতের নতুন নজির

সিরাজ প্রামাণিক : হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন (Negotiable Instruments Act, 1881)-এর ১৩৮ ধারায় চেকে স্বাক্ষর থাকলেই আসামির সাজা এখন আর নিশ্চিত নয়। সাম্প্রতিক সময়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগ বেশ কিছু যুগান্তকারী রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে—চেক ডিজঅনার মামলার ক্ষেত্রে কেবল চেক উপস্থাপনই যথেষ্ট নয়, বরং এর পেছনের লেনদেনের বৈধতা এবং সত্যতা প্রমাণ করা বাদীর জন্য বাধ্যতামূলক।

উচ্চ আদালতের এমন কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিচে তুলে ধরা হলো, যা ফাঁকা বা জামানতের চেকের মামলায় আসামির খালাস পাওয়ার পথ সুগম করেছে:

১. খণ্ডনযোগ্য অনুমান (Rebuttable Presumption)

যদিও এন.আই অ্যাক্টের ১৩৯ ধারায় বলা আছে, চেক থাকা মানেই ধরে নেওয়া হবে দেনা আছে। কিন্তু উচ্চ আদালত বলছেন, এটি একটি ‘খণ্ডনযোগ্য অনুমান’। আসামি যদি যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ বা পারিপার্শ্বিক তথ্য দিয়ে প্রমাণ করতে পারেন যে, চেকটি সিকিউরিটি হিসেবে ছিল বা হারিয়ে গিয়েছিল এবং কোনো বাস্তব লেনদেন হয়নি, তবে তিনি খালাস পাবেন।

নজির: মোঃ আবুল কাহের শাহিন বনাম ইমরান রশিদ এবং অন্যান্য, ২৫ বিএলসি (এডি), ১১৫।

২. বাদীর আর্থিক সামর্থ্য ও উৎসের প্রমাণ

বাদী চেকে উল্লেখিত বড় অঙ্কের টাকা আসামিকে দেওয়ার সামর্থ্য রাখতেন কি না, সেটি এখন আদালতের বড় বিবেচ্য বিষয়। নগদ টাকা দিয়ে থাকলে তার আয়ের উৎস এবং ইনকাম ট্যাক্স (Income Tax) ফাইলে সেই টাকার উল্লেখ আছে কি না, তা যাচাই করা হতে পারে। কোনো লিখিত চুক্তিপত্র বা বিশ্বস্ত সাক্ষী ছাড়া শুধু চেকের ওপর ভিত্তি করে মামলা হলে, আদালত আসামিকে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ (Benefit of Doubt) বা সন্দেহের সুবিধা দিয়ে খালাস দিতে পারেন।

৩. মহাজনি ঋণ ও সুদের কারবার

অনেক সময় মক্কেলকে বা ঋণগ্রহীতাকে চাপে ফেলে অথবা অবৈধ সুদের ব্যবসার বিপরীতে ব্ল্যাঙ্ক (ফাঁকা) চেক লিখে নেওয়া হয়। বাদী যদি আদালতে বৈধ লেনদেন বা টাকা হস্তান্তরের অকাট্য প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হন, তবে আদালত একে “পাওনা টাকার অস্তিত্বহীনতা” হিসেবে গণ্য করবেন এবং আসামি দণ্ড পাবেন না।

নজির: ৬৪ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ৪২০।

৪. জামানত বা সিকিউরিটি চেক

ব্যবসা বা অন্য কোনো চুক্তির জামানত (Security) হিসেবে চেক দেওয়া হলে এবং সেই চুক্তির শর্ত লঙ্ঘিত না হলে, চেক ডিজঅনার হলেও ১৩৮ ধারায় সাজা দেওয়া যাবে না।

নজির: আব্দুল আওয়াল বনাম রাষ্ট্র, ৬৩ ডিএলআর (আপিল বিভাগ), পৃষ্ঠা ৭২।

৫. প্রতিদানহীন চেক কার্যকর নয়

আইন অনুযায়ী, প্রতিদান (Consideration) বা কোনো বিনিময় মূল্য ছাড়া যেমন চুক্তি হয় না, তেমনি প্রতিদান ছাড়া কোনো হস্তান্তরযোগ্য দলিলও কার্যকর হয় না। মামলার বাদী যদি দেনা-পাওনা বা বৈধ লেনদেনের কোনো ভিত্তি প্রমাণ করতে না পারেন, তবে আসামি খালাস পাবেন।

নজির: লোকমান বনাম আয়ুব আলী এবং রাষ্ট্র, ৩৮ বিএলডি, পৃষ্ঠা ৬১৬-৬২০।

একটি জরুরি সতর্কতা

উচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্তগুলো মূলত ভুয়া, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক মামলা থেকে সাধারণ মানুষকে আইনি সুরক্ষার জন্য। তবে মনে রাখতে হবে—যদি উভয় পক্ষের মধ্যে বৈধ চুক্তি থাকে এবং লেনদেনটি ব্যাংকিং চ্যানেল বা কোনো অকাট্য দালিলিক প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত হয়, তবে চেক ডিজঅনারের শাস্তি (১ বছরের কারাদণ্ড ও চেকের অঙ্কের তিন গুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ড) আগের মতোই কঠোরভাবে বলবৎ থাকবে।

লেখক: সিরাজ প্রামাণিক, আইনজীবী (বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট), আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও গবেষক। ই-মেইল: seraj.pramanik@gmail.com