শামস নজীব অর্ক : ধরুন, একটি হত্যা মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। ইনভেস্টিগেটিং অফিসারকে (আইও) ঘটনাস্থলে যেতে হবে, আসামিকে গ্রেফতার করা লাগবে, সাক্ষ্য-প্রমাণ খুঁজে বের করতে হবে, তথ্যদাতা বা সোর্সের সহায়তা নিতে হবে, এমনকি বিভিন্ন জেলায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। আবার অনেক সময় ডিজিটাল তথ্য উদ্ধার, নজরদারি কিংবা গোপন অনুসন্ধানেরও প্রয়োজন হতে পারে। এসবই একটি পেশাদার ফৌজদারি তদন্তের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে পুলিশ কর্মকর্তা তদন্ত করছেন, তাঁর হাতে কি রাষ্ট্র সময়মতো সেই তদন্ত পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ তুলে দিতে পারে?
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় আদালতকে আমরা সবচেয়ে বেশি দেখি, বিচার বিভাগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনা করি, আর আদালতের রায় নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়। অথচ একটি মৌলিক সত্য আমরা প্রায়ই ভুলে যাই—ভালো তদন্ত ছাড়া ভালো বিচার সম্ভব নয়। বিজ্ঞ বিচারক আদালতে বসে নতুন প্রমাণ তৈরি করেন না; তিনি তদন্তে সংগৃহীত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই বিচার করেন। ফলে তদন্ত দুর্বল হলে বিচারও দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
সোর্স মানি: বিশেষ সুবিধা নয়, অপরিহার্য সরকারি ব্যয়
এই বাস্তবতায় পুলিশের “সোর্স মানি” কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি তদন্তের জন্য একটি অপরিহার্য সরকারি ব্যয়। তথ্যদাতার সহায়তা, গোপন তথ্য সংগ্রহ, অপরাধীর অবস্থান শনাক্তকরণ, সাক্ষী অনুসন্ধান কিংবা তদন্তের অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে এই অর্থ ব্যবহারের উদ্দেশ্যই হলো তদন্তকে কার্যকর করা। একটি আধুনিক রাষ্ট্র যদি দক্ষ ও বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্ত চায়, তাহলে সেই তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও নিশ্চিত করতে হবে।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। এই অর্থের বরাদ্দ, বিতরণ ও ব্যবহারের বর্তমান কাঠামো কতটা কার্যকর? তদন্তকারী কর্মকর্তা—যিনি বাস্তবে মামলাটি পরিচালনা করছেন—তিনি কি প্রয়োজনের সময় যথেষ্ট অর্থ পান? নাকি জনগণের এই অর্থ বিভিন্ন পুলিশ সুপারের কার্যালয় হতে থানার ওসি পর্যন্ত বিভিন্ন প্রশাসনিক ধাপ অতিক্রম করতে করতে মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে বিলম্ব হয় কিংবা পর্যাপ্ততা হারায়?
রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ তার নাগরিকের আস্থা। সেই আস্থা টিকে থাকে তখনই, যখন মানুষ বিশ্বাস করে যে অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। কিন্তু একজন তদন্তকারী কর্মকর্তার যদি প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তাই সময়মতো এবং সরাসরি তার কাছে না আসে, তাহলে সেই আস্থা দুর্বল হওয়াটাই স্বাভাবিক।
অনানুষ্ঠানিক সংস্কৃতির বিপদ: “ম্যানেজ করে নিন”
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অন্যত্র। যদি তদন্তকারী কর্মকর্তা তাঁর বৈধ তদন্ত ব্যয় সময়মতো না পান, তাহলে তিনি কী করবেন? রাষ্ট্র কি আশা করবে, তিনি নিজের পকেট থেকে ব্যয় করবেন? নাকি এমন একটি অনানুষ্ঠানিক সংস্কৃতি তৈরি হবে, যেখানে তাঁকে বলা হবে—“একটু নিজে ম্যানেজ করে নিন”? একটি আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রে এই ধরনের সংস্কৃতি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আমরা প্রায়ই দুর্নীতিকে ব্যক্তির নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখি। কিন্তু প্রশাসন বিজ্ঞান ভিন্ন একটি শিক্ষা দেয়—অনেক দুর্নীতির জন্ম হয় দুর্বল প্রতিষ্ঠান, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং অকার্যকর অর্থায়ন কাঠামো থেকে। যেখানে বৈধ কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ উপকরণ সহজলভ্য নয়, সেখানে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা মাথাচাড়া দেওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই ব্যক্তিকে দোষারোপ করার আগে ব্যবস্থাকে মূল্যায়ন করা জরুরি।
গোপনীয়তা বনাম জবাবদিহি: সাংবিধানিক দর্শন
এই আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি অর্থের জবাবদিহিতা। ‘সোর্স মানি’ শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে রহস্যের আবরণ তৈরি হয়। এর প্রকৃতিগত কারণেই এর সব ব্যয় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তথ্যদাতার পরিচয়, গোপন অভিযান কিংবা তদন্ত কৌশল প্রকাশ করা হলে অপরাধ তদন্তই বাধাগ্রস্ত হবে।
কিন্তু তাই বলে এই অর্থ সম্পূর্ণ জবাবদিহিমুক্ত থাকবে—এমন ধারণাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গোপনীয়তা এবং জবাবদিহি পরস্পরবিরোধী নয়; সঠিক আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো থাকলে দুটিই একসঙ্গে নিশ্চিত করা সম্ভব।
এই অর্থ যেহেতু সরকারি অর্থ, তাই এর ব্যবস্থাপনায় সংবিধানের আর্থিক জবাবদিহির নীতিও প্রাসঙ্গিক। সংসদের মাধ্যমে আইন ও বিধিমালার সমন্বয়ে এমন একটি বিশেষ নিরীক্ষা কাঠামো বিবেচনা করা যেতে পারে, যেখানে তদন্ত-সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য গোপন থাকবে, কিন্তু সরকারি অর্থের ব্যবহার যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির আওতায় আসবে।
নীতিগত সংস্কার ও ডিজিটাল সমাধান
জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রথম শর্তই হলো—অর্থ প্রকৃত ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছানো। এ লক্ষ্যে বিচারব্যবস্থার বৃহত্তর স্বার্থে নিচের সংস্কারগুলো বিবেচনা করা জরুরি:
-
তদন্তকারীর কাছে সরাসরি অর্থায়ন: “Money should follow the Investigating Officer”—এই নীতিটি চালু করতে হবে। মামলার তদন্ত যিনি করছেন, অনুমোদিত তদন্ত ব্যয় সরাসরি তাঁর কাছেই পৌঁছাতে হবে।
-
ডিজিটাল বরাদ্দ ব্যবস্থা: প্রতিটি তদন্তকারী কর্মকর্তার জন্য মামলাভিত্তিক একটি নিরাপদ ডিজিটাল তদন্ত ব্যয় ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এফআইআর দায়ের অনলাইনভিত্তিক হওয়ায়, মামলা নিবন্ধনের পর অনুমোদিত অর্থ সরাসরি বরাদ্দ হবে।
-
নিরাপদ অডিট ট্রেইল: প্রতিটি ব্যয়ের একটি সীমিত-প্রবেশাধিকারসম্পন্ন (Limited-access) ডিজিটাল রেকর্ড থাকবে। এতে তথ্যদাতার পরিচয় গোপন থাকবে, কিন্তু সরকারি অর্থের ব্যবহার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনুসরণযোগ্য হবে।
-
বিশেষ নিরীক্ষা কাঠামো: তদন্ত-সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষিত রেখেই কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের সাংবিধানিক ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বিশেষ নিরীক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
তদন্তে বিনিয়োগ মানেই ন্যায়বিচারে বিনিয়োগ
সাম্প্রতিক সময়ে The Daily Star-এর এক প্রতিবেদনে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে। একজন তদন্ত কর্মকর্তা দাবি করেছেন, একটি হত্যা মামলার প্রাথমিক তদন্তেই সরকারি বরাদ্দের চেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে এবং তাঁকে ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্বল চার্জশিট। আমরা প্রায়ই বলি, চার্জশিট দুর্বল কিংবা পুলিশ ঠিকমতো তদন্ত করে নাই। কিন্তু খুব কমই জিজ্ঞাসা করি—তদন্তকারী কর্মকর্তার হাতে কি একটি শক্তিশালী চার্জশিট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছিল?
পুলিশের পেশাদারিত্ব শুধু প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপরও। রাষ্ট্র যদি একটি মানসম্পন্ন তদন্ত চায়, তাহলে সেই তদন্তের অর্থায়নকে ‘ব্যয়’ হিসেবে নয়, ন্যায়বিচারের প্রতি ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখতে হবে।
শেষ কথা: রাষ্ট্রের প্রতি প্রত্যাশা
এই সংস্কার কোনো ব্যক্তি বা কোনো পদধারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়। এটি এমন একটি ব্যবস্থার পক্ষে, যেখানে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তাঁর বৈধ দায়িত্ব পালনের জন্য আর কখনো “ম্যানেজ” করে চলতে না হয়।
ন্যায়বিচার কেবল আদালতের রায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; তা দাঁড়িয়ে থাকে একটি বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের ওপর। আর বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের জন্য প্রয়োজন এমন একটি পুলিশিং সিস্টেমের, যেখানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বলবেন—“তোমাকে আর ‘ম্যানেজ’ করতে হবে না; তদন্তের দায়িত্ব যেমন তোমার, সেই দায়িত্ব পালনের সামর্থ্য নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”
বিচারব্যবস্থার সংস্কার আদালতের এজলাসে শুরু হয় না। তা শুরু হয় ঘটনাস্থলে পৌঁছানো প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তার হাত ধরে। তদন্তের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ যদি তদন্তকারীর হাতেই সরাসরি না পৌঁছায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তা নন; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষমতা। আর একটি রাষ্ট্রের জন্য তার চেয়ে বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে?
লেখক: শামস নজীব অর্ক, সিনিয়র লিগ্যাল অফিসার, প্রথম আলো।

