কোর্ট কাচারির টয়লেটনামা : ন্যায়ের প্রাঙ্গণে অপমানের গন্ধ
আবদুল্লাহ আল আশিক

ওকালতি কি ফ্রি’তে পরামর্শের ‘ফরজে আইন’? পেশার মর্যাদা বনাম নির্মম বাস্তবতা

আবদুল্লাহ আল আশিক : পূর্বে একটি চটুল কথা বলা হতো—“যার নাই কোনো গতি, তিনি করেন ওকালতি।” আবার সমাজেও এমন কিছু নেতিবাচক শব্দ প্রচলিত আছে যেমন—বটতলার উকিল, উকিল ঘুষ খায়, কিংবা উকিল মিথ্যা কথা বলেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, কেউ কোনোদিন বলেননি—আইনজীবী ফি ছাড়াই আন্তরিক পরামর্শ প্রদান করেন। যেন আইনজীবীর কাছ থেকে নিখরচায় আইনি পরামর্শ পাওয়াটা মক্কেলের জন্য ‘ফরজে আইন’!

বিষয়টি এখন এমন এক অলিখিত নিয়মে দাঁড়িয়েছে যে, একজন ব্যক্তি আইন বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে, ওকালতি পরীক্ষার কঠিন পুলসিরাত পার হয়ে এসে ফ্রিতে পরামর্শ দেবেন—আর এটাই স্বাভাবিক! যিনি ফ্রিতে পরামর্শ দেবেন না, তিনি যেন উকিলের জাতই নন!

আমেরিকান প্রখ্যাত আইনবিদ রসকো পাউন্ডের (Roscoe Pound) একটি ঐতিহাসিক উক্তির সাথে এখানে একমত হওয়া যায়; তিনি বলেছিলেন—“আইনজীবীরা হলেন সোশ্যাল সায়েন্টিস্ট (Social Scientists)।” সমাজকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করার পেছনে আইনজীবীদের একটি মুখ্য ভূমিকা আছে। তা-ই বলে আইনজীবীবৃন্দ যুগ যুগ ধরে ফ্রিতে পরামর্শ দিয়ে যাবেন, এটা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবিচার ছাড়া আর কিছুই নয়। আইনজীবীদের এই ‘পরামর্শ ফি’ না নেওয়ার অপসংস্কৃতির কারণে আমাদের দেশে সিংহভাগ উকিল তাঁর ন্যায্য পারিশ্রমিক বুক ফুলিয়ে চাইতে পারেন না। আর এভাবেই আর্থিক টানাপোড়েনে একজন প্রকৃত আইনজীবীর পক্ষে তাঁর ক্লায়েন্টকে সম্পূর্ণ সার্ভিস বা শতভাগ মনোযোগ প্রদান করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

ওকালতির বর্তমান বাস্তুসংস্থান ও ‘নয়ছয়’ খেলা

আমাদের দেশে ওকালতি প্রফেশন কেমন যেন তার আদি গৌরব হারিয়ে ফেলছে। একটা গতানুগতিক ফরম্যাটে আটকে গেছে পুরো পেশাটি। মামলা হবে, দিনের পর দিন হাজিরা দেওয়া হবে, ক্লায়েন্টের সাথে ফি নিয়ে কথা-কাটাকাটি হবে, আর মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে—এটাই যেন ওকালতির বর্তমান বাস্তুসংস্থান (Ecosystem)।

অথচ ‘অ্যাডভোকেসি’ যে একটি অনুপম আর্ট বা শিল্প, ওকালতি পেশাতেও যে এক ধরনের রসকষ বিদ্যমান, সে সম্পর্কে আমরা বেশিরভাগ আইনজীবী নিজেই ওয়াকিবহাল নই। কারণ, ক্লায়েন্ট তার আইনজীবীকে পরিশ্রম করার মতো যথেষ্ট রসদ দিতে চান না। কথায় আছে—“রস না দিলে গাছিও গাছ কাটেন না।”

বাস্তবতা হলো: একজন ক্লায়েন্ট আদালতে এসে প্রভাবশালীদের লাখ টাকা ঘুষ দিতে দ্বিধাবোধ করেন না, কিন্তু যখনই উকিলের পারিশ্রমিকের কথা আসে, তখনই তিনি রাতারাতি ‘গরিব’ হয়ে যান! উকিলের সাথে ক্লায়েন্টের এই যে নয়ছয় খেলা, এই খেলাতেই মূলত আটকে যায় বেশিরভাগ মামলার ভাগ্য। আবার এই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে অনেক ভুয়ো উকিল রাতারাতি কোটিপতি হয়ে উঠছেন। ফলে ওকালতি আজ কারও কাছে পরিণত হচ্ছে ‘ধান্দায়’, আর প্রকৃত সত্যান্বেষী আইনজীবীর কাছে পরিণত হয়েছে ‘বিষাদসিন্ধুতে’।

তবে এর উল্টো পিঠও আছে। যেসব ক্লায়েন্ট তাঁর আইনজীবীকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন, যিনি তাঁর আইনজীবীর পরিশ্রম ও সততাকে শ্রদ্ধা করেন এবং আইনজীবীকে তাঁর পক্ষে আইনি লড়াই করার জন্য পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ও মানসিক শান্তি প্রদান করেন—দিনশেষে সেসব ক্লায়েন্টই জিতে যান। তখন একজন আইনজীবী হয়ে ওঠেন প্রকৃত ‘ভাইকিংস’-এর মতো অপরাজেয়। যেভাবেই হোক, তিনি তাঁর ক্লায়েন্টের পক্ষে একটি নিটোল ও অকাট্য ডিফেন্স কেস দাঁড় করান।

ক্রিমিনাল ও সিভিল প্র্যাকটিসের ভেতরের ক্ষত

আমাদের দেশে ক্রিমিনাল প্র্যাকটিসের (Criminal Practice) ক্ষেত্রে দেখা যায়, ক্লায়েন্ট কাজ আদায়ের সময় আইনজীবীকে বলেন, “স্যার, মামলায় পদক্ষেপ নিন, বাসায় গিয়ে বিকাশে বা ব্যাংকে টাকা পাঠাচ্ছি।” জামিন বা আদেশ হয়ে যাওয়ার পর সেই ক্লায়েন্ট আর ফোন ধরেন না; ফি দিতে চরম গড়িমসি করেন। এমনও দেখা যায়, মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, কিন্তু ক্লায়েন্ট খরচের ভয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

সবচাইতে দুঃখজনক বিষয় হলো, কিছু জজ কোর্টের আইনজীবীবৃন্দ হাইকোর্টের মামলা রিসিভ করে মক্কেলের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ফি নেন, কিন্তু হাইকোর্টের নিযুক্তীয় আইনজীবীদের যথার্থ পারিশ্রমিক বা ব্রিফ ফি পাঠান না। এভাবে সমন্বয়হীনতায় ক্রিমিনাল মামলাগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায় এবং আসামি পক্ষে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। সিভিল মামলার (Civil Suit) ক্ষেত্রেও এই একই প্রতিবন্ধকতা ও অপসংস্কৃতি বিরাজমান। এসব কারণে একজন আইনজীবী মামলার আইনের দিকে কনসেন্ট্রেশন বা মনোযোগ দিতে পারেন না; তাঁর পুরো টার্গেট থাকে কীভাবে ক্লায়েন্টের কাছ থেকে বকেয়া টাকা উদ্ধার করা যায় সেদিকে।

‘খাঁজ কাটা কুমিরের গল্প’ ও অশনী সংকেত

সবচাইতে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, বেশিরভাগ ক্লায়েন্টের মনে এমন একটি ভ্রান্ত ধারণা জন্ম নিয়েছে যে—ঘুষ দিয়ে যেকোনো মামলায় নিজের পক্ষে আদেশ নেওয়া সম্ভব। তাই তারা আইনজীবীর মেধা ও ফি-র ওপর গুরুত্ব না দিয়ে ‘ঘুষের লবিং’-এর ওপর গুরুত্ব দেন বেশি। ক্লায়েন্ট ইনিয়ে-বিনিয়ে তাঁর নিযুক্তীয় উকিলকে আইনের মারপ্যাঁচ বাদ দিয়ে ঘুষের কথাই যেন বেশি বলতে চান। এটি যেন সেই ‘খাঁজ কাটা কুমিরের গল্পের’ মতো বিষয়, যা অদূর ভবিষ্যতে আমাদের গোটা আইন অঙ্গনের জন্য এক চরম অশনী সংকেত!

উত্তরণের ৫ দফা প্রস্তাবনা

আইন পেশার এই অবক্ষয় ও সংকট থেকে beauties বা সুন্দরভাবে বেরিয়ে আসতে চাইলে আমাদের নিম্নোক্ত প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপগুলো নেওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করি:

১. নির্দিষ্ট পরামর্শ ফি নির্ধারণ: প্রত্যেক আইনজীবী তাঁর অভিজ্ঞতা ও স্ট্যাটাস অনুযায়ী একটি ন্যূনতম ‘পরামর্শ ফি’ (Consultation Fee) নির্ধারণ করবেন এবং মক্কেল সাক্ষাৎ লগ্নেই সেটি চেম্বারে প্রদান করতে বাধ্য থাকবেন।

২. লিখিত পারিশ্রমিক চুক্তি: একজন আইনজীবী কোনো মামলা রিসিভ করার পর সেটি কীভাবে পরিচালনা করবেন এবং তার জন্য ধাপ অনুযায়ী কী পরিমাণ পারিশ্রমিক নেবেন, তা শুরুতেই নির্ধারণ করে নিতে হবে।

৩. মুহুরি-নির্ভর ওকালতি বর্জন: সিন্ডিকেট ও মুহুরি-নির্ভর ওকালতি সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করতে হবে এবং মুহুরি বা ক্লার্কদের সরাসরি মক্কেলের কাছ থেকে মামলা রিসিভ করার প্র্যাকটিস বন্ধ করতে হবে।

৪. সরাসরি মক্কেলের সাথে যোগাযোগ: অবশ্যই সরাসরি মূল ক্লায়েন্টের সাথে বিস্তারিত কথা বলে মামলার মেরিট বুঝে ফাইল গ্রহণ করতে হবে। ক্লায়েন্ট না দেখে বা থার্ড পার্টির মাধ্যমে মামলা পরিচালনা থেকে বিরত থাকা উচিত।

৫. ঘুষের প্রস্তাব শক্ত হাতে দমন: কোনো ক্লায়েন্ট চেম্বারে এসে বেআইনি লেনদেন বা ঘুষের কথা বললে, আইনজীবীকে তৎক্ষণাৎ শক্ত হাতে তা দমন করতে হবে এবং পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখতে হবে।

শেষ কথা: বিচার বিভাগের গতিশীলতার চাবিকাঠি

এখনই উপযুক্ত সময় ওকালতি পেশাটিকে আরও গঠনমূলক, আধুনিক ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার। আমাদের অবশ্যই মনে রাখা উচিত—কাঙ্ক্ষিত পারিশ্রমিক ও মানসিক প্রশান্তি না পেলে কোনো পেশাই সুন্দরভাবে পরিচালিত হতে পারে না। আবার অহেতুক মক্কেলকে জিম্মি করে অতিরিক্ত বা অন্যায্য টাকা গ্রহণও আমাদের পেশায় কোনো সুখ বা বরকত বয়ে আনে না।

ক্লাইন্ট ও উকিলের মধ্যকার সম্পর্কটি সম্পূর্ণ বিশ্বাসের। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় উভয় পক্ষকেই আরও বেশি সচেতন হতে হবে। একজন বিচারক আদালতে তখনই সঠিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, যখন একজন আইনজীবী মেধা ও সততা দিয়ে নিখুঁতভাবে একটি মামলা উপস্থাপন করেন। মনে রাখতে হবে, আইনজীবীর সামান্য অবহেলায় হয়তো কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়ে যান, আবার কেউ হয়তো নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে চিরতরে নিঃস্ব হয়ে যান।

সুতরাং, একজন আইনজীবীকে যেমন তাঁর সর্বোচ্চ মেধা দিয়ে মামলা পরিচালনা করতে হবে, ঠিক তেমনি একজন ক্লায়েন্টকেও তথাকথিত টেবিলের তলার ঘুষের ওপর নির্ভর না করে আইনজীবীর ফি এবং আইনি লড়াইয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আর তখনই আমরা একটি গতিশীল, দুর্নীতিমুক্ত এবং প্রকৃত স্বাধীন জুডিশিয়ারি অর্জন করতে পারবো।

লেখক: আবদুল্লাহ আল আশিক, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।