মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী, কক্সবাজার প্রতিনিধি | কক্সবাজারে সাড়ে ১০ বছর আগে চতুর্থ শ্রেণির এক স্কুলছাত্রকে অপহরণ করে ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির চাঞ্চল্যকর মামলায় মো: ফারুক (২৮) নামের এক যুবককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায়ে অর্থদণ্ড অনাদায়ে আসামিকে আরও ২ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ৯ জুলাই ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) রোকেয়া আক্তার এই রায় ঘোষণা করেন।
ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী মোহাম্মদ শামীম রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেন— কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম উমখালী গ্রামের মো: শাহজাহানের পুত্র মো: ফারুক (২৮)।
রাষ্ট্রপক্ষে একই আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মীর মোশাররফ হোসেন টিটু অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মামলাটি পরিচালনা করেন।
রায় ঘোষণার সময় দণ্ডিত আসামি আদালতে অনুপস্থিত ও পলাতক থাকায় বিচারক তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা (Arrest Warrant) জারির নির্দেশ দিয়েছেন।
পারিবারিক বিরোধ থেকে নিষ্পাপ শিশুকে অপহরণ
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, দণ্ডিত আসামি মো: ফারুকের সাথে রামু উপজেলার চাকমারকুল ইউনিয়নের তেচ্চিপুল এলাকার নুরুল আমিনের কন্যা ময়না বেগমের বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের মাত্র ৫ মাসের মাথায় পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝির কারণে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে বিগত ২০১৫ সালের ১১ অক্টোবর বিকেল ৪টার দিকে নুরুল আমিনের ১১ বছর বয়সী পুত্র এবং স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র সাজাদ হোসেন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল। সে তার বাড়ির সামনের রাস্তায় পৌঁছালে পূর্বপরিকল্পিতভাবে মো: ফারুক তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়।
অপহরণ সম্পন্ন করার পর মো: ফারুক তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন থেকে অপহৃত শিশু সাজাদের মা হামিদা বেগমকে কল করে এবং সন্তানকে জীবিত ফেরত পেতে ২ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। এই জঘন্য ঘটনায় অপহৃত শিশুর মা হামিদা বেগম বাদী হয়ে অপহরণকারী মো: ফারুক, তার পিতা মো: শাহজাহান ও মাতা নুরুন্নাহার বেগমকে আসামি করে রামু থানায় একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত ও দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (IO) তদন্ত শেষে ঘটনার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় মো: শাহজাহান ও নুরুন্নাহার বেগমকে দায় হতে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন জানিয়ে প্রধান অভিযুক্ত মো: ফারুকের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। আদালত চার্জশিট গ্রহণ করে মো: ফারুকের বিরুদ্ধে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় চার্জ গঠন করেন।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালত মামলাটিতে রাষ্ট্রপক্ষের প্রয়োজনীয় সাক্ষী গ্রহণ, সাক্ষীদের আসামিপক্ষে জেরা, উদ্ধারকৃত আলামত প্রদর্শন এবং উভয় পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে রায় ঘোষণার জন্য বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দিন ধার্য করেন।
বিজ্ঞ বিচারক রোকেয়া আক্তার সমস্ত তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭ ধারায় আসামি মো: ফারুককে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডের এই রায় প্রদান করেন।
ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী মোহাম্মদ শামীম জানান, রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী দণ্ডিত আসামি মো: ফারুক আদালতে আত্মসমর্পণ করার পর অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তার হওয়ার দিন থেকে তার এই সাজা সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করা হবে।

