কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | দেশের আইন অঙ্গন ও বিচার বিভাগে অভিজ্ঞ বিচারক এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের প্রয়াণে যে গভীর শূন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে অবিলম্বে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস (কাজল)। তরুণ প্রজন্মের একাংশের মধ্যে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে দ্রুত অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বার ও বেঞ্চ উভয় জায়গাতেই মেধার ঘাটতি কাটাতে এখনই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
আপিল বিভাগের ১ নম্বর এজলাস কক্ষে অনুষ্ঠিত এই বিদায় সংবর্ধনা সভায় প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ বিপুলসংখ্যক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
জ্যেষ্ঠদের প্রয়াণ ও মানের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমাদের অভিজ্ঞ বিচারপতিরা পর্যায়ক্রমে অবসরে চলে যাচ্ছেন। এর পাশাপাশি দেশের কিংবদন্তি জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা মৃত্যুর মাধ্যমে আমাদের মাঝ থেকে একেবারে হারিয়ে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা হারিয়েছি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, বিচারপতি টিএইচ খান এবং সর্বশেষ সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারকে। উনারা যে মানের এবং যে উচ্চতার আইনজ্ঞ ছিলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা বর্তমানে সেই মানের আইনজীবী তৈরি করতে পারছি না। এর ফলে বিচার বিভাগ ও পুরো আইনাঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতা বিরাজ করছে।”
তরুণদের ‘শর্টকাট’ প্রবৃত্তি ও মেধার অভাব
তরুণ আইনজীবীদের পড়াশোনা ও পেশাগত দায়বদ্ধতার ঘাটতি নিয়ে গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন:
এখনকার তরুণ আইনজীবীদের মধ্যে পড়াশোনা ও অধ্যাবসায়ের বড় অভাব দেখা যাচ্ছে। সবাই কেমন যেন একটি শর্টকাট (সহজ) রাস্তায় রাতারাতি বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হতে চায়। আসল জ্ঞান অর্জন করতে চায় না। কিন্তু এই মহান পেশায় যদি সততা ও গভীর অধ্যবসায় না থাকে, তবে কেউ কখনো ভালো আইনজীবী হতে পারে না। এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আইন অঙ্গনে এক অপূরণীয় মেধা ও যোগ্যতার শূন্যতা সৃষ্টি হবে। আমাদের এখনই এই মেধার ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
তিনি বার কাউন্সিলের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে জানান, মেধাবীদের এই পেশায় আকৃষ্ট করতে এবং যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে অতি সম্প্রতি বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের প্রবর্তন করা হয়েছে।
প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ ও নীতি-নৈতিকতার তাগিদ
বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে ব্যারিস্টার কাজল বলেন, “আমি যখন আমার আইন পেশার শুরুতে সুপ্রিম কোর্টে ওকালতি শুরু করেছিলাম, তখন যে সমস্ত জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের সামনে দাঁড়িয়ে মামলা পরিচালনা করতাম, আজকে সেই মানের ও সেই উচ্চতার নীতি-নৈতিকতাসম্পন্ন বিচারপতির বড্ড অভাব। বার এবং বেঞ্চ—উভয় ক্ষেত্রেই আইনজীবীদের মধ্যে এবং বিচারকদের মধ্যে মেধার যে দৃশ্যমান ঘাটতি রয়েছে, তা দূর করতে হবে। আগামী দিনের প্রজন্মকে একটি সৎ, যোগ্য, নীতিবান ও মেধাবী আইনজীবী সমাজ এবং দক্ষ বিচারক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন ও সরকারকে এখনই যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে।”
আইনি বিশেষজ্ঞরা অ্যাটর্নি জেনারেলের এই সাহসী ও বাস্তবসম্মত বক্তব্যকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, দেশের বিচার ব্যবস্থার গুণগত মান বজায় রাখতে বার ও বেঞ্চের মেধাভিত্তিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।

