বিপ্লব চন্দ্র দাস, আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি | আদালতে জামিন পাওয়ার উদ্দেশ্যে সরকারি হাসপাতালের ভুয়া ও জাল চিকিৎসার কাগজপত্র (মেডিকেল সার্টিফিকেট) দাখিল করার অপরাধে আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২ জন স্টাফসহ ৩ জনকে ৫ দিনের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা জেলার আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক ইফতি হাসান ইমরান গত বুধবার (১ জুলাই) এই সংক্ষিপ্ত বিচার সম্পন্ন করে তাৎক্ষণিক সাজা প্রদানের আদেশ দেন।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. আবু বকর সিদ্দিক এই আদেশের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
যেভাবে ধরা পড়লো জালিয়াতি
আদালতের নথির বিবরণ অনুযায়ী, জি.আর. ৪/২০২৬ (তাল) নং মামলার ১নং আসামি মোঃ হারুন খান বিজ্ঞ আদালতে স্বেচ্ছায় হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন। শুনানির সময় তিনি দাবি করেন যে, মামলার এজাহারে উল্লেখিত অপরাধের ঘটনার তারিখের আগের দিন তিনি আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অসুস্থ হয়ে ভর্তি হন এবং টানা ৩ দিন সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। নিজের দাবির সপক্ষে তিনি আদালত পরিদর্শনের জন্য হাসপাতাল থেকে ইস্যুকৃত একটি চিকিৎসার ছাড়পত্র (ডিসচার্জ সার্টিফিকেট) দাখিল করেন।
তবে আসামির দাখিল করা উক্ত চিকিৎসা ছাড়পত্রটির সঠিকতা নিয়ে আদালতের তীব্র সন্দেহ সৃষ্টি হয়। এর প্রেক্ষিতে ম্যাজিস্ট্রেট আমতলী হাসপাতালের মূল ভর্তি ও রিলিজ রেজিস্ট্রার বই আদালতে তলব করেন। হাসপাতাল থেকে আনা মূল রেজিস্টার পর্যালোচনা করে আদালত ছাড়পত্রের ক্রমিক নম্বরের ঘরে মারাত্মক গরমিল দেখতে পান।
আসামির স্ত্রীর স্বীকারোক্তি ও জালিয়াতি চক্রের সন্ধান
রেজিস্ট্রারে গরমিল পাওয়ায় আদালত আসামি মো. হারুন এবং তাঁর স্ত্রী তাসলিমাকে এজলাসে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এক পর্যায়ে আদালতের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সত্য স্বীকার করে তাসলিমা জানান যে, আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইমার্জেন্সি অ্যাটেনডেন্ট নজরুল ইসলাম পহলান এবং একই হাসপাতালের অবৈতনিক সহকারী মো. নূরল হক টাকার বিনিময়ে তাঁদের এই জাল ছাড়পত্রটি তৈরি করে দিয়েছেন।
তাসলিমার এই জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে আদালত তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালের ইমার্জেন্সি অ্যাটেনডেন্ট নজরুল ইসলাম ও অবৈতনিক সহকারী মো. নুরুল হককে সশরীরে আদালতে তলব করেন। আদালতে হাজির করার পর তাঁদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তাঁরা উভয়েই অপরাধ স্বীকার করে নেন এবং জানান যে, আসামি মো. হারুন খানের নামে আমতলী হাসপাতাল থেকে দেওয়া চিকিৎসা ছাড়পত্রটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং তাঁরা নিজেরা অবৈধ সুবিধার বিনিময়ে এটি জাল-জালিয়াতি করে তৈরি করেছেন।
তাৎক্ষণিক সামারি ট্রায়াল ও সাজা ঘোষণা
আসামি ও সরকারি হাসপাতালের দায়িত্বরত স্টাফদের মুখে জালিয়াতির প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি পাওয়ার পর ম্যাজিস্ট্রেট জনাব ইফতি হাসান ইমরান কালক্ষেপণ না করে এজলাসেই তাৎক্ষণিক সংক্ষিপ্ত বিচার বা সামারি ট্রায়াল পরিচালনা করেন। আদালত জালিয়াতির অপরাধে আসামি হারুনের স্ত্রী তাসলিমা, হাসপাতালের ইমার্জেন্সি অ্যাটেনডেন্ট নজরুল ইসলাম পহলান এবং অবৈতনিক সহকারী মো. নূরুল হককে ০৫ (পাঁচ) দিনের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে সরাসরি হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
বিচারকের এমন দূরদর্শী ও সাহসী পদক্ষেপ এবং নিজ উদ্যোগে জালিয়াতি ধরে তাৎক্ষণিক সাজা প্রদানের ঘটনাটি বরগুনার আইনি অঙ্গনসহ স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক প্রশংসিত ও আলোচিত হয়েছে। সচেতন মহল মনে করছেন, জামিন বা মামলা থেকে বাঁচতে যারা আদালতে প্রায়শই ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট বা জাল কাগজপত্র দাখিল করেন, এই রায় তাদের জন্য একটি কঠোর আইনি বার্তা হিসেবে কাজ করবে।

