ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণে প্রধান আলামত নারীর শরীর

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৬ নভেম্বর, ২০১৭ ১২:০০ অপরাহ্ণ
ছবি - জান্নাতুল শরীয়াত দিশা

জান্নাতুল শরীয়াত দিশা : 

সম্প্রতি প্রতিদিনের খবরের কাগজে ও বর্তমান মিডিয়া জগতে যে বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে চলেছে, সেটি হল ধর্ষণ। প্রতিদিন যে হারে দেশজুড়ে ধর্ষণের ঘটনা রিপোর্ট করা হচ্ছে, সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমানে “ধর্ষণ” যেন মহামারী আকার ধারণ করতে চলেছে।

বিশেষ করে, বিগত কয়েক বছরে ধর্ষণের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। যার ফলশ্রুতিতে প্রতিদিনের পথচলার পথে ঘটে যাওয়া “ধর্ষণ” বা নারী নিগ্রহের ঘটনাসমূহের তথ্য সংগ্রহ, বিচার-বিশ্লেষন করা কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। তবুও সরকারী ও বিভিন্ন গবেষনা সংস্থার সমীক্ষা থেকে যে সকল তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তাতেই দেশবাসীর চোখ রীতিমত কপালে উঠার মতো।

ধর্ষণের আইনত ব্যাখ্যা

বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী- কোন নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে অথবা কোন নারীর সম্মতি ছাড়া অথবা কোন নারীকে মৃত্যু বা শারীরিক আঘাতের ভয় দেখিয়ে সম্মতি দিতে বাধ্য করলে অথবা নাবালিকা অর্থাৎ ১৬ বছরের কম বয়স্ক শিশু সম্মতি দিলে কিংবা না দিলে (সে যদি নিজ স্ত্রীও হয়) অথবা কোনো নারীকে বিয়ে না করেই ব্যক্তিটি তার আইনসংগত স্বামী এ বিশ্বাস দিয়ে যদি কোন পুরুষ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে তাকে আইনের ভাষায় ধর্ষণ বলা হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ৯ ধারা অনুযায়ী ধর্ষণের অপরাধের যে সকল বিধান রয়েছে তা হলঃ ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে ধর্ষণকারীর জন্য রয়েছে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড এবং ইহার অতিরিক্ত অনুর্ধ্ব এক লক্ষ টাকা অর্থদন্ডের বিধান। একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে ধর্ষণকালে বা ধর্ষণের পর যদি তার মৃত্যু ঘটে তবে উক্ত দলের সকলের জন্যই এই শাস্তি প্রযোজ্য হবে। ধর্ষণের চেষ্টা করলে ধর্ষণকারীর সর্বোচ্চ দশ বছর এবং সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদন্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডের ও বিধান। কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানো বা আহত করার চেষ্টা করলে ধর্ষণকারী যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডিত হবেন।

সামাজিক প্রতিবন্ধকতা 

সচরাসচর একজন নারীর ধর্ষণের পরে সমাজে এমনকি তার নিজ পরিবারেও তার গ্রহণযোগ্যতা কমে আসে। সমাজের চোখে বারংবার তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। কোন কিছু না করেও সকলের অবজ্ঞা, দোষারোপকে মাথা পেতে নিতে হয়। এমনকি একজন বিবাহিত মহিলা ধর্ষিত হলে, তার মাথা গুজানোর স্থান মিলে না কোথাও; না তার স্বামীর কাছে, না তার বাবামায়ের কাছে। নিন্দা অপমানের বোঝা মাথায় নিয়ে বেড়াতে হয়। কারণ সবার কাছে সেই দোষী, নিশ্চয় মেয়েটি এমন কিছু করেছে যার জন্যে তার আজকে এই দিন দেখতে হচ্ছে। নিশ্চয়ই মেয়েটির চরিত্র ভালো না, নিশ্চয়ই মেয়েটির পরিবার ভালো না, পরিবার ভালো শিক্ষা দেয় নি। কারণ তাদের ধারণা ভালো চরিত্রের বা ভালো ঘরের মেয়েরা কখনো ধর্ষিত হয় না। এরকম নানান ধরনের লাঞ্ছনার শিকার হতে হয় একজন ভিকটিমকে।

আইনী প্রতিবন্ধকতা

যখন একটি সমাজে বা এলাকায় এরকম ধর্ষণ জাতীয় ঘটনা ঘটে, তখন সামাজিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি একজন ভিকটিমকে আইনের বিভিন্ন বাধা-প্রতিবন্ধকতাও পার করতে হয়। যখন একজন ধর্ষিতা সমাজের বিভিন্ন বাধা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়া, চক্ষুলজ্জা, ভয়-ভীতি সবকিছু দূরে ঠেলে আইনের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে, কোর্টে এসে মামলা করে। তখন সেই ধর্ষণের শিকার নারীকে বার বার ঘটনার বিবরণ দেয়াসহ আরো নানান ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। প্রতি পদে পদে একজন ধর্ষিতা নারীকে হতে হয় লাঞ্ছিত ও পোহাতে হয় বিভিন্ন বিব্রতমূলক পরিস্থিতি।

হয়তো বা বার বার তার বলা ঘটনাকে মিথ্যে বলে প্রমানিত করার চেষ্টা করা হয় নতুবা ঘটনার শিকারী নারীকে খারাপ হিসেবে কোর্টে প্রমান করার জোর প্রবণতা দেখা যায়। আর এসব করতে করতে মামলার দীর্ঘ পথ চলার শুরু হয় যেখানে বিচারকার্য সম্পন্ন হতে লেগে যায় বছরের পর বছর।

এছাড়াও মামলা থানায় নিতে বা মামলা চলাকালে আসামীপক্ষের উকিল যেভাবে ভিকটিমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তাতে একজন ধর্ষণের ঘটনার শিকারী আরেকবার ধর্ষণের শিকার হয়। তবে, অধিকাংশ সময়ই দেখা গেছে কিছু সংখ্যক ভিকটিম বিচার পেলেও অনেক মামলা ঝুলেই পড়ে থাকে। যেখানে আইনে সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে যে, বিশেষ ক্ষেত্র ব্যতিরেকে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন করতে হবে। যেখানে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে মামলা শেষ হতে দশ বিশ বছরও লেগে যাচ্ছে। এ বিচারহীনতার কারণেই আমাদের দেশেই ধর্ষণের বিষয়গুলো আরো বেশী করে হচ্ছে।

আইনী প্রতিবন্ধকতার আরেকটি নেতিবাচক বিষয় “শারিরীক পরীক্ষার সার্টিফিকেট”। কারণ ধর্ষণের প্রধান আলামত নারীর শরীর। সুতরাং মেডিকেল পরীক্ষার পূর্বে কোনমতেই গোসল করা যাবে না, শুধু এখানেই এর শেষ নয়। ধর্ষণের সময় যে পোশাক পরা ছিল সেটাও ধোয়া যাবে না কারন অনেক সময় এ পোষাকও মামলার গুরুত্বপূর্ন সাক্ষ্য হিসেবে নেয়া হতে পারে। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব (৭২ ঘন্টার মধ্যে) মেডিকেল পরীক্ষা করাতে হবে নতুবা অনেক আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বাস্তবপক্ষে, আইনি লড়াইয়ের জন্য এ সার্টিফিকেট অবসম্ভাব্য, এ সার্টিফিকেট ছাড়া কোন বিচারই হবে না। ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায় যে, এরুপ সার্টিফিকেট হাতে পেতে পেতেই অনেক সময় চলে যায়। যার ফলে পর্যাপ্ত তথ্যাদি না পাওয়ার ফলে ধর্ষণের অপরাধটি বিচারের আওতায় নেয়া কষ্টসাধ্য হয়ে উঠে।

প্রতিকারের সম্ভাব্য উপায়বলী

বাংলাদেশ পুলিশের তথ্যে জানা গেছে যে বিগত ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪৮০০ এর বেশী ধর্ষণের মামলা হয়েছে। যেখানে মামলায় মাত্র তিন ৩-৪ শতাংশ পর্যন্ত সাজা হয়। আমাদের যে প্রচলিত নিয়ম, “একজন মহিলাকেই সব জায়গায় প্রমান করতে হয় যে সে ধর্ষিত হয়েছে। যেহেতু ধর্ষণ একটি গুরুতর অপরাধ যা মানবসভ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

অতএব, কেন একজন ধর্ষণের আসামী নিজেই তার নির্দোষীতার প্রমান দিক আদালতে যাতে করে একজন ধর্ষনের ঘটনায় শিকারী নারীকে আদালতে পুনঃধর্ষণের শিকার না হতে হয়।

উপরন্তু বাংলাদেশের সাধারন জনগণের মধ্যে একটি আদালত বিমুখতা রয়েছে। আর এভাবে আদালত থেকে দূরে থাকার জন্যই অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে এই ধরনের অপরাধ সংঘটন করে। সুতরাং আইন-আদালত থেকে দূরে নয়, বরং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ ধরনের অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধ করতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ; ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি