ঢাকা , ২৪শে জুন ২০১৮ ইং , ১০ই আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
প্রচ্ছদ » আর্টিকেল » আইন ও আবছায়া

আইন ও আবছায়া

কারাদণ্ড

হুমায়ূন কবির:

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বলতে কি বুঝায়? আমৃত্যু কারাদণ্ডই আবার কী? দণ্ডের এই দুটি টার্ম কি একই অর্থে ব্যবহৃত হয়? সম্প্রতি অতীত হওয়া বিতর্ক নিয়ে আসুন আরেকবার তর্ক করি।

১.
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বলতে শাব্দিক ভাবে আমরা বুঝি একজন মানুষের অবশিষ্ট জীবন কারাভোগ। কিন্তু শাব্দিকভাবে স্বচ্ছ এই অর্থ ঘোলাটে হয়ে গেছে আমাদের প্রচলিত আইনের কয়েকটি পরিচিত বিধান ও মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের পরস্পর বিরোধী রায়ের কারণে।

এখন দেখে নেই আইনের কোন বিধানগুলো এই বিতর্কের জন্য দায়ী….

– দণ্ডবিধির ৫৭ ধারা
– কারাবিধির ৭৫১(এফ) বিধি
– ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫ (এ) ধারা
– উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত

দণ্ডবিধির ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে ভগ্নাংশের হিসাবের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন ৩০ বছর ধরে নেওয়া হবে। দণ্ডববিধির ৬৫, ১১৬, ১১৯, ৫১১ ধারা বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট যে দণ্ডবিধির ৫৭ ধারা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে কোন ভাবেই ৩০ বছরে সীমিত করেনি।

কারাবিধির ৭৫১(এফ) বিধি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে সংজ্ঞায়িত করেছে। ১৯৯৬ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত সার্কুলারের মাধ্যমে সংশোধিত এই বিধি অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে ৩০ বছর কারাদণ্ড। প্রিজন এক্ট ১৮৯৪ এর ধারা ৫৯ এর উপধারা ৫ অনুযায়ী গঠিত কারাবিধির একুশ অধ্যায়ে বর্ণিত সকল বিধি মূলত শাস্তি মওকুফের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেহেতু বিধি ৭৫১(এফ) একুশ অধ্যায়ে বর্ণিত সেহেতু যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে ৩০ বছর এটা শুধুমাত্র কয়েদীদের দন্ড মওকুফের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

এখন এটাও স্পষ্ট হল যে দন্ডবিধির ৫৭ ধারার মত কারাবিধির ৭৫১ (এফ) বিধিও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে ৩০ বছরে সীমিত করেনি।

এবার আসি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫ (এ) ধারায়। এ ধারার বিধান অনুযায়ী মৃত্যুদন্ড ব্যতীত অন্যক্ষেত্রে অপরাধীকে প্রদত্ত কারাদণ্ড থেকে বিচার চলাকালীন জেলহাজত বাস বাদ যাবে। এই ধারায় শুধুমাত্র মৃত্যুদন্ডকে আলাদা করা হয়েছে যাবজ্জীবনকে আলাদা করা হয়নি। সুতরাং এই ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের কারাদণ্ড।

উচ্চ আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড সম্পর্কে পরস্পর বিরোধী বিভিন্ন সিদ্ধান্ত রয়েছে।

_ফরিদ আলী বনাম রাষ্ট্র মামলায় বলা হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বলতে ৩০ বছর কারাদণ্ড বুঝাবে।
_মো: হোসেন বনাম রাষ্ট্র মামলায় বলা হয়েছে যাবজ্জীবন দন্ড প্রাপ্ত আসামীর জীবনের সমস্ত দিনগুলো কারাগারে কাটাতে হবে না বরং ৩০ বছর পার হওয়ার পর আসামি ছাড়া পেতে পারেন।

এছাড়া ২০১৩ সালে আপীল বিভাগের একটি রায়ে বিচারক নাজমুল আরা সুলতানার নেতৃত্বে চার সদস্য বিশিষ্ট একটি বেঞ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বলতে সাড়ে ২২ বছর উল্লেখ করেছেন।

[ এখানে বলে বলে রাখা ভাল যে, কারা বছর নিয়ে আমাদের অনেকের মাঝে একটি ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। আমরা অনেকেই মনেকরি জেলখানায় ১ বছর = ৯ মাস। কিন্তু প্রকৃত সত্য হল প্রিজন অ্যাক্ট ১৮৯৪ (Prison Act, 1894) এর ধারা ৫৯ এর উপধারা ৫ অনুযায়ী প্রণীত কারাবিধির ৭৫১-৭৬৮ বিধি অনুযায়ী বিভিন্ন উপলক্ষ্যে কয়েদিদের কারাদণ্ডের সময়কাল মওকুফ হয়। এই মওকুফ কালীন সময় সর্ব্বোচ ১ বছরের ১/৪ ভাগের সমান অর্থাৎ সর্ব্বোচ ৩ মাস। সুতরাং ১২ মাস থেকে মওকুফ কালীন সর্ব্বোচ সময় ৩ মাস বিয়োগ করে কারাবছর = ৯ মাসের সহজ সমীকরণটি ভুল। কেননা মওকুফ কালীন এ সময় সকল কয়েদির ক্ষেত্রে সমান নয়। ]

২.

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড সম্পর্কে প্রিভি কাউন্সিল সর্বপ্রথম ১৯৪৫ সালে পন্ডিত কিশোরী লাল মামলায় সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। প্রিভি কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হল দণ্ডিত ব্যক্তির আমৃত্যু কারাবাস।

পরবর্তীতে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ ১৯৬১ সালে Gopal Vinayak Godse Vs. State of Maharashtra ( AIR ) 1961, SC 600. মামলার রায়ের ৫ নং প্যারাগ্রাফে উল্লেখ করেন, ” A sentence of transportation of life or imprisonment for life must prima facie be treated as transportation or imprisonment for the whole of the remaining period of the convicted person’s natural life “.

২০১৭ বাংলদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগ সাভারের একটি হত্যা মামলার রায়ে আসামি আতাউর রহমান ও আনোয়ার এর মৃত্যুদন্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন প্রদান করেন। উপর্যুক্ত মামলার রায়ে ” যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানেই আমৃত্যু কারাবাস ” হিসাবে একটি পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন। রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রের প্রধান কুশলীর বক্তব্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড তখনই আমৃত্যু কারাদণ্ড হিসেবে গন্য হবে যখন মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হব। পরবর্তীতে পুর্নাঙ্গ প্রকাশ পেলে এই বিভ্রান্তি দূর হয়। ৯২ পৃষ্ঠার ঐ রায়ের ৮৯ ও ৯০ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ” Life imprisonment within the meaning of section 53 read with section 45 of the penal code means imprisonment for the rest of the life of the convict “.

৩.

এখন দেখি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের কিরূপ বিধান রয়েছে।

এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম আসে ইংল্যান্ডের বিধান। কেননা আমাদের আইন ব্যবস্থার প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ন আইনই ইংল্যান্ডের উপনিবেশ থাকাকালীন সময়ে তৈরি হয়েছে। ইংল্যান্ডে Life Imprisonment অর্থাৎ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হল অপরাধীর বাদবাকি জীবন কারাদণ্ড। তবে শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে বিচারক নূন্যতম মেয়াদ উল্লেখ করে দেন।

আসামি প্যারলে(Parole) অর্থাৎ কারাদন্ডের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে ভাল ব্যবহারের শর্ত সাপেক্ষ মুক্তির আবেদন অব্যশই এই নির্দিষ্ট মেয়াদ কারাভোগের পরে করতে হয়।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে অপরাধের ধরণ অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদন্ডের সাথে ন্যূনতম মেয়াদ উল্লেখ করে দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় Rome Statute of International Criminal Court এর অনুচ্ছেদ ১১০ এ বলা হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে আদালত ২৫ বছর কারাভোগের পর শাস্তি কমানোর কথা বিবেচনা করতে পারবে।

এছাড়া বর্তমানে বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র অনির্দিষ্ট সময়ের কারাদণ্ড বিলোপ করেছে। বিশ্বের মধ্যে সর্বপ্রথম পর্তুগাল ১৮৮৪ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি বিলোপ করে অপরাধের সর্ব্বোচ শাস্তি ২৫ বছর নির্ধারণ করে। সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া এবং স্পেন ৪০ বছর কারাদণ্ড, বসনিয়া-হার্যেগোবিনা ৪৫ বছর কারাদণ্ড নির্ধারন করেছে। দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া, এল সালবেদর, কোস্টারিকা, ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, উরুগুয়ে, বল্বিয়া, ইকুয়েডর, এবং ডোমিনিকান রিপাবলিক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বিলোপ করেছে। এলসালবেদরে ৭৫ বছর, কলম্বিয়ায় ৬০ বছর, কোস্টারিকা ও পানামায় ৫০ বছর, হন্ডুরাসে ৪০ বছর, ইকুয়েডরে ৩৫ বছর, নিকারাগুয়া, বলিবিয়া, উরুগুয়ে ও ভেনিজুয়েলায় ৩০ বছর, এবং প্যারাগুয়ে ২৫ বছর কারাদণ্ডকে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে নির্ধারণ করেছে।

৪.

বিশ্বের সর্বত্রই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আমৃত্যু কারাবাস হিসেবে ব্যবহৃত হয় যদিনা আসামির সাজা মওকুফ হয়।

আমাদের দেশেও উচ্চ আদালতের কয়েকটি সিদ্ধান্ত ব্যতীত কোন আইন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে কোন নির্দিষ্ট মেয়াদে সীমাবদ্ধ করেনি। দণ্ডবিধির ৫৩ ধারা অনুযায়ী শাস্তি ৫ প্রকার। মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, কারাদণ্ড, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ, জরিমানা। প্রতিটি শাস্তিই স্বতন্ত্র। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড যদি নির্দিষ্ট মেয়াদের কারাদণ্ড হত তাহলে আলাদা ভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড উল্লেখ না করে শুধুমাত্র কারাদণ্ডের বিধান করলেই হত। কিন্তু সেটা করা হয়নি। কেননা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড সম্পূর্ণ সতন্ত্র একটি শাস্তি এবং এর অর্থ আমৃত্যু কারাদণ্ড।

আইন পাঠের ক্ষেত্রে এটা লক্ষনীয় যে, দণ্ড হ্রাসের ক্ষেত্রে আইনে দুটি টার্ম ব্যবহৃত হয়েছে।
১. Remission
২. Commutation
কারাদণ্ড হ্রাসের ক্ষেত্রে সাধারণত Remission শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। অপরদিকে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে Commutation শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ( দণ্ডবিধির ধারা ৫৪, ৫৫ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৪০১, ৪০২ লক্ষনীয় ) কেননা মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এরূপ শাস্তি যা কিনা নির্দিষ্ট পরিমাণে হ্রাস করা যায় না। এজন্য এই শাস্তি ভিন্ন অন্য শাস্তি প্রদান করতে হয় বিধায় Commutation শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।

সুতরাং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বলতে বুঝায় অপরাধীর মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কারাবাস অর্থাৎ আমৃত্যু কারাদণ্ড। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত আসামী তখনই মুক্তি পেতে পারে যখন সরকার দয়া পরবশ হয়ে দণ্ডবিধির ৫৫, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ কিংবা রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৯ অনুযায়ী ক্ষমা প্রদান করেন।

লেখক: শিক্ষানবিশ আইনজীবী, ঢাকা জজ কোর্ট