মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধে ‘গণহত্যা অস্বীকার আইন’ চাই

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৫ অক্টোবর, ২০১৯ ২:১২ অপরাহ্ণ
অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

সিরাজ প্রামাণিক: 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঘটানো গণহত্যাকাণ্ডের দিনটি জাতীয়ভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ইতোমধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছে। স্বাধীনতার প্রায় ৪৬ বছর পর গত ১৮ মার্চ ১০ম জাতীয় সংসদের সমাপনী দিনে এ স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন ‘গণহত্যা অস্বীকার আইন’ একটি সময়ের দাবী মাত্র।

গণহত্যা অস্বীকার করা কিংবা যুদ্ধের নৃশংসতাকে বিকৃতি করা বা যুদ্ধের ইতিহাসকে পুঁজি করে হিংসা ছড়ানো কিংবা এইসব লঘুকরণে কাজ করে গণহত্যাকারীদের রাজনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসার অপচেষ্টা কারীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আনতে যে আইন করা হয় সেটাই মূলত ‘গণহত্যা অস্বীকার আইন’ নামে পরিচিত। যেহেতু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সংগঠিত ইহুদী নিধন হলোকাস্ট নামে পরিচিত সে জন্যেই ইউরোপে এইরূপ বেশীর ভাগ আইনই ‘হলোকাস্ট ডিনায়েল ল’ নামে পরিচিত। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আদালতে, সংসদে, সকল ধরণের গণমাধ্যমে যে ভুঁড়ি ভুঁড়ি গণহত্যাকে অস্বীকার করার নজির আমরা দেখেছি তাতে করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধে এই আইন প্রণয় অনিবার্য হয়ে পড়েছে। এছাড়াও নব্য নাৎসিদের মত করে তারা গানের বদলে ধর্মকে পুঁজি করে নতুন প্রজন্মে দেশের মুক্তির সংগ্রামের প্রতি যে হিংসা বাক্য রচনা করে চলেছে আমাদের অর্জন এবং সার্বভৌম রক্ষার্থেই এই আইন করা অত্যাবশ্যক।

ইতিহাস বিকৃতি প্রতিহতকরণ ও গণহত্যার মতো অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে ইউরোপের ১৪টি দেশ ‘হলোকস্ট অস্বীকৃতি আইন’ প্রণয়ন করেছে। যে আইনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যার পরিসংখ্যান অস্বীকার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও নিহত শহীদদের সংখ্যা অস্বীকার করার অর্থ হচ্ছে ভারতে অবস্থানরত মুজিবনগর সরকারকে অস্বীকার করা, ভারতে অবস্থান নেওয়া এক কোটি শরণার্থীকে অস্বীকার করা, মুক্তিবাহিনীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধে অংশ নেওয়াকে অস্বীকার করা, ৩০ লাখ বাংলাদেশি শহীদ হওয়া ছাড়াও অসংখ্য ভারতীয় সেনার শহীদ হওয়াকে অস্বীকার করা, ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় জেনারেল অরোরার কাছে পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণকে অস্বীকার করা, বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সৈন্যদের আত্মত্যাগকে অস্বীকার করা এবং তদানীন্তন ভারতের বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতাকে অস্বীকার করা। সম্মিলিত এই অস্বীকারগুলো নিঃসন্দেহে কালের ইতিহাসে সবচেয়ে গর্হিত ‘অপরাধ’ এবং তা শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই নয়, ভারতের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। এই অপরাধকে দমন করতে ও ভবিষ্যতে এশিয়ার এ অঞ্চলে যেকোনো ধরনের গণহত্যাকে আগাম প্রতিরোধ করতে দুই দেশের সরকারেরই উচিত হবে ইউরোপের ‘ল অ্যাগেইনেস্ট ডিনায়াল অব হলোকাস্ট ল’-এর মতো ‘১৯৭১ সালের গণহত্যা অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে আইন’ করা। বাংলাদেশ ও ভারত সরকার যদি এই আইন তৈরির উদ্যোগ নেয়, তাহলে নিঃসন্দেহে আশা করা যেতে পারে যে একাত্তরে যুদ্ধকালীন বাংলাদেশকে সাহায্য ও সমর্থনদানকারী অন্যান্য দেশের সরকারগুলোও এমন আইন তৈরির উদ্যোগ নেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শত্রুদেশ হলেও জার্মানি যেমন যুদ্ধোত্তর এই আইনটি নিজ দেশে করেছে, তেমনি যুদ্ধকালীন শত্রুদেশ পাকিস্তানও এই আইনটি করবে বলে আশা করা যেতে পারে।

ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইউরোপে পুনরায় নব্য নাৎসিজম এর চর্চা বা প্রচার শুরু হয়। তাদের অন্যতম হাতিয়ারই ছিল নিজেদের নৃশংসতম কৃতকর্মগুলোকে অস্বীকার করা। নির্মম হলেও সত্য, এই প্রক্রিয়াটি আমাদের বাঙলায়ও হানাদারের দোসররা সফলভাবে করছে। ইউরোপিয়ান দেশগুলো নব্য নাৎসি’দের কূটকৌশল আঁচ করতে পেরেই ‘গণহত্যা অস্বীকার আইন’ তৈরী করে। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল গণহত্যার সঠিক ইতিহাসকে গণমানুষের সামনে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা এবং নব্য নাৎসি’দের প্রসার আর প্রচারকে অংকুরে বাধাপ্রাপ্ত করা কিংবা বিনষ্ট করা। নাৎসি বিরোধী আইন ইউরোপের সকল দেশে না থাকলেও সরাসরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি’দের গণহত্যার শিকার দেশসমূহে কঠোরভাবে প্রণীত হয়। এই আইনের আরেকটি ধারা ছিল যেটি বর্ণবাদ এবং হিংসা’র বাণীকে নিরুৎসাহিত করে। বর্তমানে যে সকল দেশে ‘জেনসাইড ডিনায়েল ল’ কিংবা ‘হলোকাস্ট ডিনায়েল ল’ আছে সেসব দেশ সমূহঃ অস্ট্রিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, ফ্রান্স, জার্মানি, লিস্টেনস্টেইন, লিথুনিয়া, নেদ্যারল্যান্ড, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, স্পেন ও সুইজারল্যান্ড। এই ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন নাৎসিদের প্রচার, তাদের স্বস্তিকা চিহ্ন ব্যবহার, নব্য নাৎসিবাদ নিয়ে লেখালেখি, গণহত্যা অস্বীকার এবং তাদের আদর্শকে ধারণ করে কাজ করাকে নিষিদ্ধ করে। এই পথ ধরে পর্তুগাল, হাঙ্গেরি, লাটভিয়া, জার্মানি, নরওয়ে, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড এবং ইসরায়েল হিটলারের দাম্ভিক আত্মজীবনী ‘মাইন ক্যাম্প’-কেও নিষিদ্ধ করে।

গোটা ইউরোপ জুড়ে সকল রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রাপ্ত সারাংশানুযায়ী, ‘এই অস্বীকার প্রক্রিয়া হচ্ছে গণহত্যাকারীদের আবারো মূল ধারায় নিয়ে আসা’। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে আমাদের বাংলাদেশে। তাহলে এখন করণীয় কী? আর্মেনিয়ান গণহত্যা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মান গণহত্যা, কিংবা ফ্রান্স এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশে যেভাবে গণহত্যাকারীদের আদর্শ নির্মূলে আইন করেছে আমাদেরও সে পথেই হাঁটতে হবে! একমাত্র অনুরূপ আইন প্রণয়নই এই অপশক্তিকে নির্মূল করার একমাত্র হাতিয়ার। এই আইনে যে যে অপরাধকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিৎ সেগুলো হলঃ

১। গণহত্যাকে অস্বীকার করা কিংবা ভারসাম্য দেয়ার চেষ্টা করা অথবা লঘুকরণের প্রচেষ্টা করা।

২। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসকে কটাক্ষ করা বা ইতিহাস বিকৃতি করা।

৩। মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধসমূহকেও অস্বীকার করা কিংবা ভারসাম্য দেয়ার চেষ্টা করা অথবা লঘূকরণের প্রচেষ্টা করা।

৪। ১৯৭১ সালে যে আদর্শে আমাদের মুক্তির সংগ্রাম পরিচালিত হয় সে আদর্শের প্রতি অনুরূপ ভাব প্রকাশ করা।

৫। যেকোনো প্রকারের গণমাধ্যমে বর্ণবাদ কিংবা হিংসার বানীর প্রচার করা।

৬। যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামাতে ইসলামের সকল প্রকার সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা সাথে সাথে তাদের আদর্শের প্রচার, মিডিয়াতে বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের প্রকাশসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড নাৎসি এবং নব্যও-নাৎসিজমের মত করে নিষিদ্ধ করা।

মূল এই বিষয়গুলোকে মাথায় রেখেই আইনটি করতে হবে। সাহায্য নেয়া যেতে পারে অনুরূপ জার্মান, ফ্রান্স কিংবা অষ্ট্রিয়ার পেনাল কোডের। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিচারবিভাগীয় কমিটি বর্তমানে চলমান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালদ্বয়ের রায়ের সাথে সমন্বয় রেখেই এই আইন করতে পারে এবং করাটাই সমীচীন।

যে পথ ধরে আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি সে পথেই আমাদেরকে গণহত্যা অস্বীকারকারীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আর এ জন্যে ‘জেনোসাইড ডিনায়েল ল’ এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিরোধে আইন এখন সময়ের কঠোর দাবী। কেবল আজ কিংবা আগামীকালের জন্যে নয়, বরং আগামী প্রতিটা কালের, প্রতিটা যুগের, প্রতিটা সভ্যতার প্রত্যেক লহমার জন্য একটি শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যমুক্ত সমাজতান্ত্রিক নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি অনিবার্য দাবী।

প্রফেসর বার্নার্ড লুইস আন্তর্জাতিক অঙ্গনের একজন বিখ্যাত মানুষ। যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে তিনি কেবল লেখালেখিই করেন তা নয়, পশ্চিমের বিদগ্ধ সমাজে তাঁকে নেতৃস্থানীয় ইতিহাসবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিনিয়র বুশও তাঁর নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির এই অধ্যাপকের পরামর্শ চেয়ে বসতেন যখন তখন। এই লুইস একবার ফরাসী পত্রিকায় এক সাক্ষাতকারে আর্মেনিয়ার গণহত্যা নিয়ে কিছু মন্তব্য করে বসেন। তিনি বলেন, আর্মেনিয়ায় যে হত্যাযজ্ঞ হয়েছে, সেটি গণহত্যার সংজ্ঞায় পড়ে না। কাজেই সেখানে গণহত্যা হয়েছে, এমনটি বলা যাবে না। পশ্চিমের একজন শীর্ষ ইতিহাসবিদ, গবেষক হিসেবে লুইস তাঁর গবেষণালব্ধ তথ্য দিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করতেই পারেন। কিন্তু তাঁর এই বক্তব্য নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় আর্মেনিয়ানদের মধ্যে। সেই প্রতিক্রিয়ার সূত্র ধরে একটি ফরাসী আদালত তাঁকে এক ফ্রাঙ্ক জরিমানা করে। পশ্চিমের খ্যাতনামা এই ইতিহাসবিদকে ১৩ মাস জেল খাটতে হয়েছে। তাঁর অপরাধ ছিল, তিনি হলোকাস্ট অস্বীকার করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নাজি বাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছিল তাঁকে ঠিক ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করতে চাননি ইতিহাসের এই গবেষক। ভিয়েনার একটি আদালত তাঁকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন। তের মাস জেল খাটার পর অবশ্য তিনি ছাড়া পান।

আর মার্কিন অধ্যাপক পিটার আর্লিন্ডারকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল রুয়ান্ডার একটি আদালত। আইনজীবী এবং আইনের এই অধ্যাপক খোদ জাতিসংঘে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক মামলায় আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘসময়। কিন্তু রুয়ান্ডার গণহত্যাকে তিনি ঠিক ‘গণহত্যা’ হিসেবে মানতে চাননি। তিনি বলে ফেলেছিলেন, ১৯৯৫ সালে ১.৫ মিলিয়ন অটোম্যানের হত্যাকা- ঠিক গণহত্যার সংজ্ঞায় পড়ে না। এটি যুদ্ধের একটি বাই প্রোডাক্ট মাত্র। এই মন্তব্যের কারণে রুয়ান্ডার আদালত তাঁকে তিন বছরের কারাদ- দেন, তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। অধ্যাপক আর্লিন্ডার তখন রুয়ান্ডায় গণহত্যা বিষয়ক মামলায় একটি পক্ষের আইনি পরামর্শক হিসেবে কাজ করছিলেন। কিন্তু বেফাঁস এই মন্তব্যের কারণে তাকে গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করতে হয়।

ইউরোপীয় দেশগুলোতে ‘ল অ্যাগেইনস্ট ডিনায়াল অব হলোকাস্ট’ বলে একটা আইন আছে। রীতিমতো সংসদে পাশ করা আইন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির নাজি বাহিনী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যে গণহত্যা চালিয়েছে, তাকে অস্বীকার করার চেষ্টা, এমনকি গণহত্যার তীব্রতা লঘু করে দেখার প্রচেষ্টাও এই আইনে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, হলোকাস্টের তীব্রতা নিয়ে, মৃতদের সংখ্যা নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি বা প্রশ্ন তোলা ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ‘হলোকাস্ট’ নিয়ে যারা ভিন্নমত পোষণ করেন তারা শব্দের মারপ্যাঁচে ‘ডিনায়াল’ বা অস্বীকৃতিকে ‘রিভিশনিজম’ দিয়ে ঢাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হলোকাস্ট নিয়ে ইউরোপীয় আইন সেটিকেও ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ হিসেবে আমলে নেওয়ার বিধান করেছে। অর্থাৎ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গণহত্যা হয়েছে এবং নাজি বাহিনী সেই গণহত্যা চালিয়েছে এটা সত্য বলে ধরে নিতে হবে। এর বাইরে কোনো তত্ত্বের কচকচানি বা পাণ্ডিত্য দিয়ে ভিন্ন কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করা যাবে না।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কত লোক মারা গিয়েছিলো, তার কি একটি একটি করে কেউ লাশ গুনেছে? বিশ্বের কোনো যুদ্ধেই কি গুনে গুনে মৃতদেহের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার, বাংলাদেশে যেন মুক্তিযুদ্ধের চেয়েও কতজন মারা গিয়েছে সেই সংখ্যাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়েও কেউ কেউ এই তর্কটা করেন, মনেপ্রাণে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা তো করেনই। ত্রিশ লাখ নয়, মাত্র তিন লাখ লোকের প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে এই বক্তব্য প্রতিষ্ঠায় তাদের কী প্রাণান্তকর চেষ্টা!

আসলে হলোকাস্ট ডিনায়ালের মতো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা ডিনায়ালের একটি প্রবণতা যুদ্ধকালীন সময় থেকেই চলে আসছে। ‘জেনোসাইড ডিনায়ালের’ এই গোষ্ঠীই বিভিন্ন সময় গণহত্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে, বিতর্ক তুলে একে আড়াল করে ফেলতে চায়। কিন্তু যারা তিন লাখের তত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক করেন, তারা এই সংখ্যা কোথায় পেলেন? তারা কি লাশ গুণে গুণে তিন লাখের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন?

আমাদের মনে রাখতে হবে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই চলবে না। এই আইনের ব্যাপক প্রচার, প্রসার, প্রয়োগ এবং এর পক্ষে জনমত গঠন করতে সরকারের সদি”ছা থাকতে হবে। দেশে এবং বিদেশে। বিভিন্ন দেশে আমাদের দূতাবাসগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। আমরা জানি, মধ্য প্রাচ্যের অনেক দেশেই এই অপরাধগুলো – বিশেষ করে যুদ্ধপরাধিদের পক্ষে প্রচার -বিশেষ করে ঘটছে। এগুলো মাথায় রেখে নিম্নের প্রস্তাবগুলোর দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।

১। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি বহুদিন ধরেই চলে আসছে। কাজেই আইনটি প্রণয়নের পূর্বে যারা ইতিহাস বিকৃত করেছেন তাদের ক্ষেত্রে কি করনীয়, তা সুস্পষ্টভাবে থাকা প্রয়োজন।

২। যে কোনও বিদেশি ব্যক্তি বা সংগঠন দেশের ভেতরে থাকা অবস্থায় যদি এই আইনের পরিপন্থী কোনও কাজ করেন, তাদের জন্য আরও কঠিন শাস্তির বিধান রাখা হোক। প্রয়োজনে যেন তাদেরকে বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত করা যায়, এমন শাস্তির বিধান রাখতে হবে।

৩। কোনও বিদেশি ব্যক্তি বা সংগঠন বিদেশের মাটিতে বসে এমন অপরাধ করলে তাদের ক্ষেত্রে কী শাস্তির ব্যবস্থা হবে, সেটা এই আইনে পরিষ্কার করতে হবে। আমরা সব সময় দেখি অনেক বিদেশি সংগঠনের পছন্দের কাজের তালিকায় থাকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে হেয় করা। এগুলো খুবই অনভিপ্রেত।

৪। শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ব সমাদৃত নুরেম্বার্গ ট্রায়াল অনুসরণ/উল্লেখ করা যেতে পারে। এমন কিছু বলা থাকলে, বহির্বিশ্বে আমাদের এই আইনের গ্রহণযোগ্যতা হবে আরও বেশি।

শেষ কথা, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে দেশের জন্ম হয়েছে, সেই দেশেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিকৃতি একটি কলঙ্কজনক ব্যাপার। পৃথিবীর অনেক দেশে এধরণের বিকৃতিকে নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করে আইন রয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এ আইনটি হবে একটি মাইলফলক। আমাদের গৌরবময় ইতিহাসের বিকৃতি ও অবমাননা রোধ করতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

প্রিয় পাঠক! আসুন আমরা একটি ইতিবাচক সংবাদের অপেক্ষায় থাকি। যেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকার পাতায় দেখতে পাবো ‘ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধে ‘গণহত্যা অস্বীকার আইন’ তৈরী হয়েছে।’ সেদিন আমাদের সংবিধানের শ্বাসত বাণী চিরন্তন রুপ পাবে। শুরু হবে নতুন এক যুগের।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী, আইন গ্রন্থ প্রণেতা ও গবেষক। Email: seraj.pramanik@gmail.com