তদারকি ও বিচারক বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রচলিত আইনেই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর, ২০২০ ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ
চন্দন কান্তি নাথ

চন্দন কান্তি নাথ: আইন আছে বাস্তবে প্রয়োগ নাই। তাই তদারকি আবশ্যক। তদন্ত ও বিচার দুই জায়গাতেই তদারকি দরকার। তবে সব চেয়ে বেশী দরকার বিভিন্ন স্তরে বিচারক নিয়োগ। বিচার বিভাগের ১৮০০ বিচারকের মধ্যে নিম্ন স্তরে বর্তমানে ১২০০-১৩০০ বিচারক আছে। কিন্তু উপরের স্তরে বিচারক পর্যাপ্ত দরকার এবং এক্ষেত্রে পদ বাড়ানোর গতি খুবই ধীর। একই বিচারকের উপর নতুন আদালত তৈরী না করে নতুন নতুন আইনে বিচারকার্য পরিচালনার বোঝা চাপানো হয়েছে যুগের পর যুগ।

সংবিধানের ৩৫(৩ ) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ফৌজদারী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারলাভের অধিকারী হবেন। কিন্তু মানুষ দ্রুত বিচার পাচ্ছে না। এটা দিবালোকের মত পরিষ্কার।

নিজ জেলায় কাজের মাঝে একবার ধর্ষণ কোর্টের অর্থাৎ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের বিচারক স্যারের কাছে গেলাম। তিন কোর্টে ছয় হাজার মামলা। এর উপর এই কোর্টগুলো একই সঙ্গে শিশু কোর্ট এবং মানব পাচার ট্রাইব্যুনালও! বর্তমান মামলার জট নিরসনে ট্রাইব্যুনালগুলো দুই দিনে একটি করে মামলা নিষ্পত্তি করলেও আদালত গুলোর ২০ (বিশ) বছর সময় লাগবে তা শেষ করতে। ধর্ষণের বিচার কিভাবে হবে?

বাংলাদেশ আর বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে ফিরে যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চলতি বছরের ১৫ অক্টোবর গণভবন থেকে লোক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ৭০তম বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে আর ফিরে যাবে না বাংলাদেশ। প্রত্যেকের জন্যই নিশ্চিত করা হবে ন্যায়বিচার। তাই মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর ইচ্ছা পূরণ করার জন্যে বিভিন্ন স্তরে পদ সৃষ্টির ফাইল তাঁর সামনে নিতে হবে এবং দ্রুত বিচারক নিয়োগ হওয়া উচিত।

এমনকি বছরের শুরুতে আইন কমিশনের মাননীয় চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বলেছেন, গত ১১ বছরে বিচার বিভাগের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো প্রশংসনীয়। তবে বিচারাধীন মামলাজট কমাতে না পারাটা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। তাই বিচার বিভাগের চলমান মামলাজট নিরসনে যত দ্রুত সম্ভব অন্তত পাঁচ হাজার বিচারক নিয়োগ দিতে হবে। মামলার তুলনায় বিচারকের সংখ্যা কম হওয়ায়ই মামলাজট বাড়ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, কয়েক বছর আগের হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৩২ কোটি মানুষের জন্য ৮৬ হাজার বিচারক ছিল। এখন হয়তো এটা আরও বেড়েছে। সে হিসাবে আমাদের দেশে ১৬ কোটি মানুষের জন্য ৪৩ হাজার বিচারক থাকার কথা। আমাদের ১৬ কোটি মানুষের জন্য মাত্র ১৭০০ থেকে ১৮০০ বিচারক কাজ করছেন। সে তুলনায় আমাদের বিচারকরা অনেক পরিশ্রম করছেন।ফলে মামলাজট দূর করতে আমাদের এই মুহূর্তে অন্তত পাঁচ হাজার বিচারক প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, বিচারক নিয়োগের পাশাপাশি বিচারকদের লজিস্টিক সাপোর্টটাও জরুরি। প্রতিটি বিচারকের জন্য পাঁচ-ছয়জন স্টাফ প্রয়োজন। এজলাস সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা খবর পাই এখনো কোনো কোনো আদালতে বিচারকরা ভাগাভাগি করে এজলাসে ওঠেন। তাই প্রয়োজনীয় এজলাস বৃদ্ধিতেও সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। পর্যাপ্ত বিচারক থাকলে অনেক কঠিন গুরুতর মামলাও ৭ দিনে বিচার সম্ভব।

বাগেরহাটের মাননীয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ আদালতের বিচারক গত ১১ অক্টোবর মামলাটি আমলে নিয়ে পরদিন চার্জ গঠন করে। ১৩ অক্টোবর বাদী পক্ষের মোট ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। ১৪ অক্টোবর মামলার সংশ্লিষ্ট সাক্ষী চিকিৎসক, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, নারী পুলিশ সদস্য এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য গ্রহণ হয়। ১৫ অক্টোবর আসাসির আত্মপক্ষ সমর্থনে সাফাই সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। ১৮ অক্টোবর বিকালে বিচারক দীর্ঘ সময় বাদী ও বিবাদী পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে সোমবার রায়ের দিন ঘোষণা করেন এবং রায় দেন ও ইতিহাস তৈরী করেন। তাই বিচারক নিয়োগের পাশাপাশি বিচারক দের উপর এবং তদন্তকালে বিচারক কর্তৃক তদন্ত কর্মকর্তার উপর তদারকি দরকার।

দেশে দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লাগে ১৫–২০ বছর বা তারও বেশি! দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থা সংস্কার করার জন্যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার আইন মন্ত্রীগণ ২০১২ ও ২০১৭ সনে দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তির জন্যে দুটি ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছেন। আর স্বল্প খরচে ন্যায়বিচার হচ্ছে আদালতের বাইরে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ এর মাধ্যমে। আগে এটা বাধ্যতামূলক ছিলো না। ২০১২ সনে “May” এর স্থানে “Shall” করা হয়। ২০১৬ সনের ১৭ ই জানুয়ারি এটার কার্যকারিতা দেয়া হয়। ২০১৭ সনে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারকেও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি করার দায়িত্ব দেয়া হয়। অথচ উক্ত আইন এখনও অনেক জায়গায় কার্যকর হয়নি। আইনজীবী, আপোষকারী ও লিগ্যাল এইড অফিসারকে মামলা নিষ্পত্তি কার্যক্রমে যুক্ত করা যায়নি।

আগের প্রক্রিয়ায় দেরি হত বিধায় উপরে উল্লেখিত মতে ২০১২ সনে সংশোধন এনে আদেশ ৫ এ বলা হয় সমন ৫ দিনের মধ্যে জারি করতে হবে, না হলে এটা জারি কর্মকর্তার অসদাচরণ হবে। কুরিয়ার সার্ভিস, ফ্যাক্স কিংবা ই-মেইলসহ পত্রিকার মাধ্যমেও সমন পাঠানো যাবে বলে নতুন আইনে আছে। পরে আদালত সন্তুষ্ট হলে সমন জারি হয়েছে গণ্য করা যাবে। বিবাদী আদালতে হাজির হলে সংশোধন মতে ৩০ দিনে, বিশেষ কারণে সর্বোচ্চ ৬০ দিনে জবাব দাখিল করবেন।

আবার লিখিত জবাবের পরে সংশোধন অনুসারে অবশ্যই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। আগেই বলা হয়েছে পূর্বের ‘May’ এর পরিবর্তে ‘shall’ স্থাপন করা হয়েছে। তাতে আছে লিখিত বক্তব্য দাখিলের পরে, যদি প্রতিযোগী সমস্ত পক্ষ ব্যক্তিগতভাবে বা স্ব স্ব পক্ষে আদালতে উপস্থিত থাকে, আদালত অবশ্যই শুনানি স্থগিত করে মামলাটিতে বিরোধ বা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মধ্যস্থতা করবেন। অথবা মামলা-মোকদ্দমাতে বিরোধ বা বিরোধগুলি পক্ষদের নিযুক্ত প্রার্থীদের অথবা নিযুক্ত আইনজীবীদের বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির জন্যে মামলা দিবেন। অথবা মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য উদ্যোগ গ্রহণের জেলা জজ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত প্যানেল থেকে মধ্যস্থতাকারীকে (Mediator) মামলাটি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি করতে দিবেন। আপিল ও একই রূপে বিরোধ (dispute) নিষ্পত্তি করা যাবে।

সালিশ আইন ২০০১ অনুসারেও পক্ষরা বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারেন। এমনকি ইতিমধ্যে যে মামলা ২০১২ এর আগে আপিলে বিচারাধীন (pending) আছে তাও উপরোক্ত বিধান মোতাবেক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বিধান মতে নিষ্পত্তি করা যাবে। ব্যর্থ হলে পুনরায় আগের পদ্ধতিতে মামলা নিষ্পত্তি করা যাবে। আবার মামলায় লিখিত জবাব দাখিল কিংবা আর্জি দাখিল হলে বিচার্য বিষয় (issue) গঠন করতে হয়। কোন ঘটনার বা আইনের গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি (material Proposition) একপক্ষ দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে এবং অপরপক্ষে অস্বীকার করে, তখনই বিচার্য বিষয়ের উদ্ভব হয়।

বিচার্য বিষয় দুই প্রকারের- ১) তথ্যগত বিচার্য বিষয়, ২) আইনগত বিচার্য বিষয় এবং এটি অবশ্যই জবাব দাখিলের পর (যেটি পরে) অথবা প্রথম শুনানির (first hearing) পর ১৫ দিনের দিনের মধ্যে গঠন করতে হবে। বিচার্য বিষয় প্রণয়নের তারিখ হতে দশ দিনের মধ্যে লিখিতভাবে প্রশ্নমালা প্রদান করতে পারবেন এবং শপথনামার (by affidavit) দ্বারা ১০ দিনের ভিতর প্রশ্নমালার উত্তর দাখিল করতে হবে। আর অর্ডার ১৪ বিধি ৮ মোতাবেক ১২০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত শুনানির (final hearing) জন্যে আদালত তারিখ দিবেন। আবার আদালত অর্ডার ১৮ বিধি ১৯ মোতাবেক ১২০ দিনের মধ্যে মামলার শুনানি শেষ করবেন। আবার বিচার শুরু হলে সংশোধন দরখাস্ত দিয়ে অনেক সময় নষ্ট হয় তাই নতুন সংশোধনে বলা হয়

‘no application for amendment shall be allowed after the trial has commenced, unless the Court is of opinion that in spite of due diligence, the party could not have raised the matter before the commencement of trial:

Provided further that if an application for amendment is made after the trial has commenced and the Court is of opinion that the application is made to delay the proceedings, the Court shall make an order for the payment to the objector such cost by way of compensation as if thinks fit.’

এছাড়াও অর্ডার ১৭ তে বলা হয়, পক্ষরা মুলতবি চাইলে কস্ট (cost) দেওয়া যাবে। শুনানি শুরু হলে পরবর্তি শুনানি (further hearing) লাগাতার হবে যতক্ষণ সাক্ষী শেষ না হয় এবং একটি পক্ষকে কস্ট দিলেও ৩ (তিন) বারের অধিক সময় দেয়া হবে না আবার আবশ্যিক শুনানির (peremptory hearing) সময় একটি পক্ষকে কস্ট দিলেও ৩ (তিন) বারের অধিক সময় দেয়া হবে না আছে। উভয় পক্ষ দরখাস্ত দিলে কস্ট রাষ্ট্র পাবে যেখানে কস্ট এর কথা আছে সেখানে কস্ট না দিলে কিংবা অন্য ক্ষেত্রে একতরফা ডিক্রি (expartee decree) অথবা মামলা খারিজ করার বিধান আছে। এমনকি আদালত নিজেও কারণ ছাড়া মামলা মুলতবি করতে পারবেন না।

আবার মামলা দ্রুত করার জন্যে আদালত যথেষ্ট যুক্তি থাকলে কোনো সাক্ষী বা কাগজপত্রের তথ্য বা তথ্যসমূহ শপথনামা (affidavit) দ্বারা প্রমাণ করার সুযোগ দিতে পারবেন বলে অর্ডার ১৯ এ লেখা আছে। তবে কোনও পক্ষ সরল বিশ্বাসে (bonafide) কামনা করলে আদালত সাক্ষীকে হাজির করে জেরা করার অনুমতি অবশ্যই দিবেন। কিন্তু এক্ষেত্রে আদালতের নিকট এর প্রয়োজন প্রতীয়মান হতে হবে। ধারা ৩৩ ও আদেশ ২০ মোতাবেক মামলার শুনানি হওয়ার পর আদালত রায় ঘোষণা করবে এবং এরূপ রায়ের ভিত্তিতে ডিক্রি প্রণীত হবে। আবার অর্ডার ২০ বিধি ৫ অ (5A) মোতাবেক রায় ঘোষণার ৭ (সাত) দিনের মধ্যেই ডিক্রি প্রস্তুত করতে হবে।

আবার কেউ অনর্থক মামলা আনলে বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা (Contest) করলে এবং তা দীর্ঘদিন চলার পর কেউ খরচ এর সম্মুখীন হলে আদালত ৩৫ ধারা অনুসারে যে কোনো পক্ষকে খরচ প্রদানের আদেশ প্রদান করতে পারে এবং মামলার খরচের উপর অনধিক শতকরা বার্ষিক ছয় টাকা হারে সুদ প্রদানের নির্দেশ দিতে পারেন এবং এটি খরচের ন্যায় আদায়যোগ্য হবে। কাকে বা কোন সম্পত্তি হতে কি পরিমাণ খরচ প্রদান করতে হবে, তা নির্ধারণ করার এবং উপরে বর্ণিত মতে প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করার পূর্ণ ক্ষমতা আদালতের থাকবে।

উপরের কার্যক্রম ছাড়াও অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, স্থানীয় পরিদর্শন, স্থানীয় তদন্ত, রিসিভার (receiver) নিয়োগ, রায়ের পূর্বে গ্রেফতার এবং ক্রোকের আদেশ আদালত দেয় বা দিতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রেও উক্ত দরখাস্ত গুলো ও দ্রুত নিষ্পত্তি করার বিভিন্ন বিধান আইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। আইন অনুসারে মধ্যস্থতা (mediation, arbitration) হলে, দ্রুত সমন জারি ও জবাব দাখিল হলে, খরচসহ সংশোধন আবেদন (Amendment petition) সংশোধন হলে, ইস্যু গঠন দ্রুত হলে, শপথনামা (affidavit) সংক্রান্ত বিধান ও ৩০, ৩৫ ধারার বিধান প্রয়োগ হলে, শুনানি সংক্রান্ত অর্ডার ১৭ এর বিধান এর সঠিক প্রয়োগ হলে, ৮৯ ধারার বিধান মোতাবেক মধ্যস্থতা (mediator) প্যানেল হলে এবং তারা সঠিক ভাবে কাজ করলে, বিচারক, আইনজীবী আদালতের কর্মচারীরা তাদের দায়িত্ব পালন করলে বিচার দ্রুত হওয়ার কথা। কিন্তু তদারকি না থাকায় আইন এর সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না।

আবার ফৌজদারি মামলায় পুলিশ একটি তদন্ত ২৪ ঘন্টায় শেষ করবেন এটাই আইনে আছে। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৭(১) ধারায় আছে – যখন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে হেফাজতে আটক রাখা হয় এবং এটি প্রতীয়মান হয় যে, ৬১ ধারায় নির্ধারিত ২৪ ঘন্টা সময়ের মধ্যে তদন্ত সমাপ্ত করা যাবে না। তাহলে সঙ্গে সঙ্গে অতঃপর নির্ধারিত ডায়েরীতে লিখিত ঘটনা সম্পকিত নকল নিকটবর্তী ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট প্রেরণ করবেন এবং একই সময়ে আসামীকে উক্ত ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট প্রেরণ করবেন। উক্ত ধারায় ২৪ ঘন্টাতে তদন্ত করার কথা থাকলেও পিআরবি (Police Regulations, Bengal) এর ২৬১ তে আছে তদন্ত কর্মকর্তা বিরতি বিহীন তদন্ত করবেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ মোতাবেক সার্কেল এএসপি নিয়মিত তদন্ত কার্যক্রম তদারকি করবেন, যত কঠিন মামলা হোক যদি নিয়মিত তদারকি হয় একটা মামলায় ১৫ দিনের বেশি তদন্ত শেষ করতে লাগবে না। আবার উক্ত বিধিতে আরো আছে – একইভাবে ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত পাঠালে তা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে হবে, না পারলে ২৬১ মোতাবেক পুলিশ অবশ্যই কেন পারলেন না এবং কখন পারবেন তার রিপোর্ট পাঠাবেন।

এছাড়াও সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত দ্রুত করার জন্যে বলতে পারেন। আর একবার তদন্ত শুরু হলে প্রতিদিন তদন্ত করার কথা আইনে আছে। ফৌজদারী বিধি ও আদেশ (Criminal Rules and Order, 2009) এর ৭৫(২) বিধিতে আছে –

The Magistrate shall impress the investigation officer to complete the investigation as expediciously as possible.

উক্ত বিধির ৭৫ (১) অনুসারে যখন পুলিশ ফাইল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উত্থাপিত হবে তখনই তদন্তের কেস ডায়েরি উত্থাপন করতে হবে। উপরে উল্লেখিত ফৌজদারি কার্য বিধির ১৬৭ (১) মোতাবেক আসামী আদালতে পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে তদন্তের কেস ডায়েরি পাঠাতে হবে বলেও বলা আছে। ৫৫ ডিএলআর (হাই কোর্ট ডিভিশন) পৃষ্ঠা ৩৬৩ এর ২০ নম্বর প্যারাতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭ (১) এর “অতঃপর নির্ধারিত ডায়েরীতে লিখিত ঘটনা সম্পকিত নকল” দিয়ে বুঝিয়েছেন এটা উক্ত ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৭২ এর তদন্তের কেস ডায়েরি যা অবশ্যই আসামীকে হাজির করার সময়ই উপস্থাপন করতে হবে।

পিআরবি এর ২১ এ আছে ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ এর কাজে হস্তক্ষেপ করবে না কিন্তু যারা স্বীকার (cognizance) করেন তাদের তদন্ত কার্যক্রমে দায়িত্ব আছে মর্মে স্মরণ করানো হয়েছে। পুলিশ এর পুলিশ আইন, ১৮৬১ (The Police Act, 1861) এর ২৩(১) (৬) ধারায় আছে – উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত সকল প্রকার বৈধ আদেশ দ্রুত পালন ও কার্যকরী করা ও অপরাধের বৃত্তান্ত অনুসন্ধান বা উদঘাটন করা পুলিশ এর দায়িত্ব। উক্ত আইনের ২৯ ধারায় আছে – কর্তব্যচ্যুতির কোন নিয়ম স্বেচ্ছাকৃত অমান্য করলে এবং উপর্যুক্ত কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করলে তাকে শাস্তির মুখোমুখি করা যাবে। আবার বিশেষ আইনে ও বিশেষ বিধান আছে।

আবার তদন্ত শেষ হওয়ার পর আইনে দ্রুত বিচারের কথা আইনে আছে। আইনে সর্বোচ্চ ১৮০ দিনে ম্যাজিস্ট্রেটকে বিচার শেষ করার কথা আছে। তবে ফৌজদারি কার্যবিধির সঠিক প্রয়োগ হলে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক একটা বিচার ১-৭ দিন (বিরতি বিহীন) আর দায়রা (সেশন) আদালত কর্তৃক ৩৬০ দিনের মধ্যে ১-৩০ দিনের ভিতর (বিরতি বিহীন) বিচার কাজ শেষ করা যায়। তবে অবশ্যই পুলিশকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭১(২) মোতাবেক সাক্ষী নিয়মিত হাজির করতে হবে।

আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য তা হলো ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের কোনো প্রসেস দেয়ার কথা আইনে উল্লেখ নাই কিন্তু সেশন কোর্টে আছে। প্রাসঙ্গিক দুটি ধারা পাশাপাশি পড়লে তা বুঝা যায়। ফৌজদারি কার্যবিধি ধারা ২৪৪(১) এ আছে – ম্যাজিস্ট্রেট যদি পূর্ববর্তী ধারা অনুসারে আসামীকে দণ্ড দান না করেন, অথবা আসামী যদি উক্তরূপে স্বীকারোক্তি না করে তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট ফরিয়াদীর (complainant) (যদি থাকে) বক্তব্য শ্রবণে অগ্রসর হবেন, এবং বাদী পক্ষের (prosecution) সমর্থনে প্রদত্ত সমস্ত সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন এবং আসামীর বক্তব্যও শ্রবণ করবেন এবং আত্মপক্ষ সমর্থনে তার প্রদত্ত সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন। তবে ম্যাজিস্ট্রেট ফরিয়াদী (complainant) বা আসামীর আবেদন ক্রমে কোন সাক্ষীর প্রতি হাজির হবার অথবা কোন দলিল বা কোন জিনিস হাজির করার নির্দেশ দিয়ে সমন ইস্যু করতে পারবেন। একইভাবে ২৬৫ (চ) তে আছে – আসামী যদি দোষ স্বীকার করতে অস্বীকার করে বা দোষ স্বীকার না করে বা বিচার প্রার্থনা করে, অথবা ২৬৫-ঙ ধারা অনুসারে দণ্ড প্রাপ্ত না হয়, তাহলে আদালত সাক্ষীদের জবানবন্দী গ্রহণের জন্য একটি তারিখ ধার্য করবেন এবং বাদী পক্ষের (prosecution) আবেদনক্রমে কোন সাক্ষীকে উপস্থিত হতে বা কোন দলিল বা অন্য কিছু আদালতে উপস্থিত করতে বাধ্য করার জন্য যেকোন পরোয়ানা দিতে পারবেন। উক্ত ধারায় “may” ব্যবহার করে বুঝানো হয়েছে সাক্ষী আনার দায়িত্ব পুলিশের। আদালত প্রসেস দিতেও পারেন না-ও দিতে পারেন। আর প্রসেস দিতে হলেও বর্তমান ডিজিটাল যুগে সহজে সে প্রসেস পুলিশের ই-মেইল এ পাঠানো যায়।

ইতিমধ্যেই পুলিশ অনেক জায়গায় সাক্ষীর মোবাইল নম্বর যুক্ত করছে যা বিচারের সময় সাক্ষী হাজির করার ক্ষেত্রে খুব কাজ দেয়। পুলিশ সাক্ষী না আনলে অথবা সাক্ষী নিজে না আসলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮৫ (ক) তেও সমাধান আছে। তাতে আছে – যদি কোন সাক্ষীকে কোন ফৌজদারী আদালতে হাজির হবার জন্য সমন জারী করা হয় এবং তদানুযায়ী কোন নির্দিষ্ট স্থানে ও সময়ে হাজির হতে আইনত বাধ্য হওয়া সত্ত্বেও কোন বৈধ কারণ ব্যতিত হাজির হতে অবহেলা করে বা হাজির হতে অস্বীকার করে অথবা তথা হতে নির্ধারিত সময়ের পূর্বে বে-আইনীভাবে চলে যায়, তাহলে যে আদালতের নিকট উক্ত সাক্ষী হাজির হতে বাধ্য সেই আদালত যদি বিবেচনা করেন যে ন্যায় বিচারের স্বার্থে এরূপ সাক্ষীর সংক্ষিপ্ত বিচার হওয়া উচিত, তাহলে উক্ত আদালত এরূপ অপরাধ আমলে নিবেন এবং উক্ত অপরাধীকে কেন এই ধারা মতে শাস্তি দেয়া হবে না তার কারণ দর্শাবার সুযোগ দিয়া অনধিক দুইশত পঞ্চাশ টাকা জরিমানা করবেন। ২৬৫ (ছ) তে ধার্য তারিখে আদালত বাদী পক্ষের সমর্থনে উপস্থিত সমস্ত সাক্ষ্য গ্রহণ করার কথা আছে। আর এভাবে মূল আইনেই দ্রুত তদন্ত ও বিচার সম্ভব।

বাংলাদেশে জেলা আদালত এবং জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টগুলোতে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন পাবলিক প্রসিকিউটররা এবং তাঁদের সহায়তা করেন অতিরিক্ত ও সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটররা। সেখানেও তাদের সম্মানি বৃদ্ধি কিংবা অ্যাটর্নি সার্ভিস (Attorney Service) চালু করে তাদের দায়বদ্ধতা বাড়ানো যায়।

তাই বিচার হীনতার অবসান চাইলে দ্রুত বিভিন্ন স্তরে পদ বাড়িয়ে বিচারক নিয়োগের বিকল্প নাই। বিচারক, পুলিশ এবং প্রসিকিউটরসহ আইনজীবীদের গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকার মাধ্যমে প্রচলিত আইনের সঠিক প্রয়োগে দ্রুত তদন্ত ও বিচার করা যাবে।

উপরোক্ত আলোচনা অনুসারে যার যার জায়গায় সবাই নিজ দায়িত্ব পালন করলেই আইন অনুযায়ী দ্রুত তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন হবে। অতএব এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়, মূলতঃ তদারকি ও বিভিন্ন স্তরে দ্রুত বিচারকের পদ বৃদ্ধি করা এবং বিচারক নিয়োগই বিচার হীনতার কিংবা ধর্ষকের বিচারের একমাত্র সমাধান।

চন্দন কান্তি নাথ: সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট