ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার: হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি খোদ আদালতেই!

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ৫:০৪ অপরাহ্ণ
সুপ্রিম কোর্টের বারান্দায় সন্তানকে স্তন্যপান করালেন মা। ছবি: অ্যাডভোকেট রোকসানা শিরিন

২০১৯ সালের কথা, ব্রেস্ট ফিডিং ও বেবি কেয়ার কর্নার স্থাপনে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে ২৪ অক্টোবর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। জনস্বার্থে ৯ মাস বয়সী শিশু উমাইর বিন সাদী ও তাঁর মা আইনজীবী ইশরাত হাসান ওই রিট করেন। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে প্রথম কোনো শিশুর পক্ষে রিট পিটিশন হয়। তবে ওই রিট করার জন্য আগেই আদালতের অনুমতি নিতে হয়েছিল।

ওই রিটের শুনানি নিয়ে একই বছরের ২৭ অক্টোবর দেশের সকল কর্মক্ষেত্র, এয়ারপোর্ট, বাস স্টেশন, রেলওয়ে স্টেশন, শপিং মলে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার ও বেবি কেয়ার কর্নার স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

এছাড়াও পাবলিক প্লেস ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনে নীতিমালা তৈরি করতে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চান আদালত।

এরপর চলতি বছরের গত ১৮ ফেব্রুয়ারি গার্মেন্টসসহ দেশের সকল কারখানায় পরবর্তী দুই মাসের মধ্যে ব্রেস্ট ফিডিং ও বেবি কেয়ার কর্নার স্থাপনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি আদালতের আদেশ প্রতিপালন করে ৬০ দিনের মধ্যে শ্রম মন্ত্রণালয় সচিব ও শ্রম অধিদফতরের চেয়ারম্যানকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন আদালত।

রিট আবেদনটির শুনানি নিয়ে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদালতের ওই আদেশের পর দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপিত হয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে এ জাতীয় কোনও কর্নার না থাকার কারণে সন্তানকে স্বাচ্ছন্দ্যে বুকের খাওয়াতে লুকোচুরি করতে হয় নারী আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের।

গত সপ্তাহের বুধবার (২ ডিসেম্বর) নিজের শিশুসন্তানসহ সুপ্রিম কোর্টে আসেন এক মা। কান্নারত ক্ষুদার্থ শিশুকে দুধ খাওয়ানো প্রয়োজন। কিন্তু মামলার কাজে আদালত ভবনে আইনজীবী, আইনজীবী সহকারী ও বিচারপ্রার্থীসহ অসংখ্য মানুষের ভিড়ে তা কিভাবে সম্ভব? অবুঝ শিশুর কান্না নিশ্চিতভাবে মায়ের অন্তরটাও ব্যথিত করে তুলছিল। এজন্য অন্য কোন উপায় না পেয়ে সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনের বারান্দায় একটি দেওয়ালের পাশ ঘেঁষে সংকুচিত হয়ে মুখ লুকিয়ে সন্তানকে দুগ্ধ পান করান ওই নারী। তার পাশেই পাহারায় দাঁড়িয়ে আরেক নারী (ওই নারীর ফুফাতো বোন) বারবার এদিক সেদিক তাকাচ্ছিলেন। আর এই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রোকসানা শিরিন।

নিপীড়িত-নির্যাতিত, অধিকার বঞ্চিত মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল আইন-আদালত। ন্যায়বিচার পেতে বিচারালয়ের বিকল্প নাই। প্রযোজ্যক্ষেত্রে আদালতের আদেশই আইন। ফলে জনস্বার্থে আদালত কর্তৃক নির্দেশিত কোন কাজ সকলের জন্য প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে কোর্ট প্রশাসনের জন্যও আদালতের রায় শিরোধার্য।

কোর্টের আদেশ যদি আদালত প্রসাশন মান্য না করে তবে সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে এরচেয়ে বড় বাধা আর কি হতে পারে? বিভিন্ন সময় আদালতের রায় বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে আদালত অবমাননার রুল জারি করতে দেখা গেছে। কিন্তু আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে খোদ কোর্ট প্রশাসনের উদাসিনতা হতাশাজনক।

এ ধরণের ঘটনা অপ্রত্যাশিত উল্লেখ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষ দ্রুততার সাথে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন জনসচেতনতা উন্নয়নমূলক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লিগ্যাল ভয়েস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার গাজী ফরহাদ রেজা।

এদিকে এ বিষয়ে রিটকারি আইনজীবী ইশরাত হাসান একটি অনলাইন গণমাধ্যমকে দেয়া এক বক্তব্যে বলেন, হাইকোর্ট রুল ও একটি নির্দেশনা অনুসারে দেশের সমস্ত পল্লী বিদ্যুৎ অফিস, শ্রম ট্রাইব্যুনাল, লঞ্চ টার্মিনাল, চট্টগ্রামের রেলওয়ে স্টেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার ইতিমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে।

এতে করে সরকার আদালতের রুল শুনানি চলমান থাকাকালে এবং একটি নির্দেশনা মেনে নিয়েই বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করেছেন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। অর্থাৎ এ মামলার রুল, আদেশ ও নির্দেশনা ইতিমধ্যে সরকার মেনে নিয়েছে। তাই সঙ্গত কারণেই সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করা উচিৎ বলেও মন্তব্য করেন অ্যাডভোকেট ইশরাত।