করোনাকালেও চলমান রয়েছে সুপ্রীম কোর্টে সরকারি আইনি সেবা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১১ জানুয়ারি, ২০২১ ১২:৫৮ অপরাহ্ণ
সুপ্রীম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস

২৫মার্চ, ২০২০ বুধবার। করোনা মোকাবিলায় সরকার সকল অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষণা করে। প্রায় ৬৬ দিন অফিস বন্ধ থাকার পর ৩১ মে, ২০২০ তারিখে অফিস-আদালত সরকার কর্তৃক নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে খুলতে শুরু করে।

কিন্তু করোনার কারণে স্বাভাবিক জীবন যেমন ওষ্ঠাগত তেমনি সরকারি আইন সহায়তা প্রত্যাশিদেরও কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরন করে অফিসে আসতে হচ্ছে। অন্যান্য সময়ের চেয়ে প্যানেল আইনজীবীরাও খুবই সচেতন এবং কোর্টেও তাদের সীমিত উপস্থিতি।

শুধু তাই নয়, প্রথমবারের মতো দেশে চালু হলো ভার্চুয়াল কোর্ট। এমনই এক পরিস্থিতিতে সুপ্রীম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস প্যানেল আইনজীবীদের সাথে নিয়ে সরকারি আইনি সেবা প্রদান অব্যাহত রেখে চলেছে।

নিজেরা সুস্থ থাকার পাশাপাশি অফিসে আগত আইন সহায়তা প্রত্যাশিদের সুস্থতার দিকে লক্ষ্য রেখে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার কেন্দ্রীয় কার্যালয় হতে বিভিন্ন সময়ে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানের পাশাপাশি এই করোনাকালীন সময়েও কিভাবে নিরাপদ থেকে সরকারি আইনগত সহায়তা অব্যাহত রাখা যায় সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

সুপ্রীম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে সুপ্রীম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস কর্তৃক করোনাকালীন বিগত ৬ মাসে ১২৭৫ জন আইন সহায়তা প্রত্যাশিদের আইনি পরামর্শ প্রদান করা হয়। যাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৩৫৪ ও পুরুষের সংখ্যা ৮৮১।

অন্যদিকে ৫৪টি মামলায় আইনজীবী নিয়োগ করে অসহায় বিচারপ্রার্থীদের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা হয়। শুধু তাই নয়, প্যানেল আইনজীবীদের পেশাগত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের কারণে করোনাকালীন বিগত ৬ মাসে ৩৩টি মামলার নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে।

করোনাকালীন বিগত জুন-ডিসেম্বর, ২০২০ পর্যন্ত সুপ্রীম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসের পরিসংখ্যান

কেইস স্টাডি-১: বিশ বছর পর কনডেম সেল থেকে মুক্তি পেয়েই সুপ্রীমকোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসকে ধন্যবাদ জানালো শেখ জাহিদ

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদী শেখ জাহিদ, কয়েদী নং-১৫২৭/এ, পিতা-শেখ ইলিয়াছ আহমেদ, সাং-নারকেলী চাঁদপুর, থানা-রুপসা, জেলা-খুলনা।

১৬ জানুয়ারী, ১৯৯৭ তারিখে শেখ জাহিদের পত্নী রহিমা ও মেয়ে রেশমা খুন হন। রহিমার বাবা সংশ্লিষ্ট থানায় এজাহার দায়ের করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা দন্ডবিধির ৩০২ ধারানুযায়ী চার্জশীট দাখিল করেন শেখ জাহিদের বিরুদ্ধে।

১৮ জানুয়ারী, ১৯৯৮ সালে আদালতে আত্মসমর্পন করেন শেখ জাহিদ। ২৫ জুন, ২০০০ তারিখে শেখ জাহিদকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেন বিচারিক আদালত (Trial Court)। পরবর্তীতে হাইকোর্ট বিভাগে ঔধরষ অঢ়ঢ়বধষ (জেল আপীল নং-২৫৩৩/২০০০) ও Jail Appeal (ডেথ রেফারেন্স নং-২৩/২০০০) করা হয়।

৩১ জুলাই, ২০০৪ তারিখে হাইকোর্ট বিভাগ মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে জেল আপীলটি খারিজ করে দেয়। বিচারিক আদালত ও হাইকোর্ট বিভাগে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত শেখ জাহিদ সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগে জেল পিটিশন দাখিল করেন (জেল পিটিশন নং-১/২০০৫)।

১ মার্চ, ২০২০ তারিখে খুলনা জেলা কারাগার জেল পিটিশন নং ১/২০০৫ এর অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত হতে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার সুপ্রীম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে একটি চিঠি প্রেরণ করেন।

তাৎক্ষণিকভাবে কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি জনাব এম. ইনায়েতুর রহিম আপীল বিভাগের রেজিস্ট্রারের সহিত জরুরী ভিত্তিতে কথা বলে চিঠির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।

কয়েদী শেখ জাহিদের মামলার যাবতীয় তথ্য নিয়ে সুপ্রীম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস আপীল বিভাগের রেজিস্ট্রার মহোদয়ের সহিত কথা বলেন এবং ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০০৭ সালে সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ কর্তৃক পেপারবুক প্রস্তুত করার নির্দেশনা সম্পর্কেও অবগত করান।

তাৎক্ষণিকভাবে আপীল বিভাগের রেজিস্ট্রার মহোদয় সংশ্লিষ্ট সকল শাখার কর্মকর্তাদের ডেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে খুলনা জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করা হয়।

অবশেষে গত ২৫ আগস্ট, ২০২০ তারিখে শেখ জাহিদের জেল পিটিশন মামলাটি সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ কর্তৃক খালাস প্রদান করে নিষ্পত্তি হয়।

২০ বছর কনডেম সেল থেকে মুক্ত হয়েই লিগ্যাল এইড অফিসকে ধন্যবাদ জানান শেখ জাহিদ। মুজিব বর্ষে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় সরকারি আইনি সেবা প্রাপ্তির মাধ্যমে দীর্ঘ কারাবাসের পর মুক্ত হয়েই যখন ধন্যবাদ দেয়, তখন মনে হয় কতটা সার্থক ও সফল ভাবে চলছে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার অধীন প্রতিটি লিগ্যাল এইড অফিস।

কেইস স্টাডি-২: জাহালামকে আপীল বিভাগে আইনি সহায়তা

টাঙ্গাইলের নাগরপুরের জাহালম পেশায় একজন পাটকল শ্রমিক। কাজের সুবাদে স্ত্রী সন্তানসহ বাস করতেন নরসিংদীতে। ছোটবেলায় তার বাবা অন্যত্র বিয়ে করায় জাহালমের মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে তাদের তিনভাই তিন বোনকে করে বড় করেছেন।

ঘটনাক্রমে ২০১৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারী দুর্নীতি দমন কমিশনের ৩৩ টি মামলার মধ্যে ২৬টি মামলার জের ধরে নরসিংদী থেকে তাকে ভুলবশতঃ আবু সালেক হিসেবে আটক করে পাঠিয়ে দেয়া হয় টাঙ্গাইলের নাগরপুর থানায়।

পরে সেখান থেকে তোলা হয় টাঙ্গাইলের আদালতে, আদালত তাকে প্রায় ১৮ কোটি টাকার জালিয়াতির অভিযোগে জেলখানায় পাঠানোর নির্দেশ দেন। সবশেষে তার ঠাঁই হয় কাশিমপুর-২ কারাগারে। পরবর্তীতে মানবাধিকার কমিশন তদন্ত করে দেখতে পায় যে ভুল আসামী হিসেবে প্রায় তিন বছর ধরে কারাগারে আছে জাহালম।

৩০ জানুয়ারি ২০১৯ একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তা হাইকোর্টের নজরে আনেন আইনজীবী অমিত দাশগুপ্ত। পরে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ জাহালমকে ২৬ মামলা থেকে অব্যহতি দিয়ে মুক্তির আদেশ দেন। তবে আরও ৭ মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল না হওয়ায় সে বিষয়ে আদেশ দেননি আদালত।

২০১৯ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি মুক্তি পায় সে। শুনানি নিয়ে আদালত জাহালমের আটকাদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে স্বাতঃপ্রণোদিত রুল জারি করেন।

জাহালমকে ১৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য ব্র্যাক ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এক মাসের মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংককে এই অর্থ পরিশোধ করতে বলেন।

যেহেতু জাহালমকে ‘আবু সালেক’ হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন ব্র্যাক ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা। সে কারণে ব্র্যাক ব্যাংককে এই জরিমানা দিতে বলা হয়।

একই সঙ্গে এই ভুল তদন্তের সঙ্গে কারা জড়িত, তাঁদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। অন্যদিকে আপীল বিভাগে আইন সহায়তার প্রত্যাশায় সুপ্রীম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে আবেদন করে জাহালম।

ইতিমধ্যে আপীল বিভাগে আইনজীবী নিয়োগ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করে রেখেছে সুপ্রীম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটি। অসহায় মানুষদের আইনগত সহায়তা প্রদান করতে সুপ্রীমকোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস বদ্ধপরিকর।

কেইস স্টাডি-৩: অধিকার ফিরে পেল প্রতিবন্ধী নারী নাজমা আক্তার

রাজবাড়ী জেলার মোছাঃ নাজমা আক্তার একজন গৃহিণী। বিগত ২১/১২/২০০৮ ইং তারিখে উভয় পক্ষের সম্মতিতে পারিবারিকভাবে মোঃ জাকির হোসেনের সাথে বিয়ে হয়। নাজমা আক্তারের বকেয়া দেনমোহর কোন অর্থ, সম্পদ বা স্বর্ণালংকার দ্বারা পরিশোধিত না।

বিবাহিত জীবনে জাকিয়া সুলতানা (০৭) ও রাহাত হোসেন (০৫) নামে তাদের দুটি সন্তান আছে। নাজমা আক্তারের স্বামী জাকির হোসেন তার কাছে যৌতুক দাবী করলে নাজমা আক্তার তা দিতে অস্বীকার করলে জাকির হোসেন ইচ্ছাকৃত ভাবে নাজমা ও তার সন্তানদের ছেড়ে অন্যত্র বসবাস শুরু করেন এবং খোরপোষ দেওয়া হতে বিরত থাকে।

উল্লেখ্য জাকির হোসেন পূর্ব বিবাহিত যা গোপন করে ভুল ঠিকানা দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে নাজমা আক্তারকে বিয়ে করে। বর্তমানে সে তার ১ম স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য জীবন যাপন পরিচালনা করছে।

নাজমা আক্তার একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী বিধায় বিয়ের সময় নাজমা কে তার পিত্রালয় থেকে ৫/৭ লক্ষ টাকার আসবাবপত্র সহ বিভিন্ন প্রকার ব্যবহার সামগ্রী উপঢৌকন হিসেবে প্রদান করে যা পরবর্তীতে তার স্বামী জাকির হোসেন বিক্রয় করে ফেলেন।

২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে নাজমা তার স্বামীর বাড়িতে গিয়ে তার অনাদায়ী দেনমোহর এবং তার ও তার সন্তানদের খোরপোষ দাবী করলে জাকির হোসেন দিতে অস্বীকার করেন। ফলে গত ০১/১২/২০১৫ ইং তারিখে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলা নং- ১৪২/২০১৫।

পারিবারিক আদালত গত ০৭/১১/২০১৬ ইং তারিখে নাজমাকে তার বকেয়া দেনমোহরের টাকা ও তাদের ভরণপোষণের টাকা পরিশোধের জন্য জাকির হোসেনকে নির্দেশ দেন। এরপর জাকির হোসেন রাজবাড়ী যুগ্ম জেলা জজ আদালতে পারিবারিক আপীল (১৪/২০১৭) করেন।

কিন্তু আপীল আদালত গত ২৭/০২/২০১৮ ইং তারিখে জাকির হোসেনের আপীলটি নামঞ্জুর করেন এবং পারিবারিক আদালতের ডিক্রি বহাল রাখেন। পরবর্তীতে জাকির হোসেন হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন ২৯৩৬/২০১৮ দায়ের করেন। উক্ত রিভিশনের বিপক্ষে নাজমা আক্তার আইন সহায়তার জন্য সুপ্রীমকোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে আসেন।

সুপ্রীম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে মামলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং গত ২২/১২/২০২০ ইং তারিখে হাইকোর্ট রুল ডিসচার্জ করে পূর্বের রায় ও ডিক্রি বহাল রাখেন।

বর্তমান করোনাকালীন পরিস্থিতির মধ্যেও একজন অসহায় প্রতিবন্ধী নারীর অধিকার আদায়ের জন্য সুপ্রীমকোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটি দ্বারা নিযুক্ত আইনজীবীর মাধ্যমে যা করছেন তা সত্যিই বিরাট একটি প্রাপ্তি।