৪০ লাখে ধর্ষণ মামলায় আপস, এরপর আদালতে উল্টো সাক্ষ্য

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৯ জানুয়ারি, ২০২১ ৩:১৭ অপরাহ্ণ

এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর তাঁকে ও তাঁর মাকে নির্যাতনের পর মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল বগুড়ার শ্রমিক লীগের নেতা তুফান সরকারসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। সেই তুফান গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ উঠতে থাকে। তুফানকে নিয়ে আলোচনা জাতীয় সংসদ পর্যন্ত গড়ায়। ছাত্রীকে ধর্ষণের সেই আলোচিত মামলায় গত রোববার তুফান সরকার জামিন পেয়েছেন।

আদালত–সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নির্যাতনের শিকার মা ও মেয়ে রোববার আদালতে গিয়ে উল্টো সাক্ষ্য দেন। তাঁরা বলেন তুফানের বিরুদ্ধে তাঁদের কোনো অভিযোগ নেই, কোনো ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেনি, ভুল–বোঝাবুঝি থেকে ওই মামলা হয়েছে। এরপর বগুড়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালত-১-এর বিচারক এ কে এম ফজলুল হক অভিযুক্ত তুফান সরকারের জামিন মঞ্জুর করেন।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ছলে–বলে–কৌশলে তুফানের পরিবার ওই মা এবং মেয়েকে আপসে বাধ্য করে। ৪০ লাখ টাকা চুক্তিতে মা ও মেয়ে আদালতে গিয়ে উল্টো সাক্ষ্য দিতে সম্মত হন। বিষয়টি ওই ছাত্রী ও তাঁর মা স্বীকারও করেছেন।

ওই ছাত্রীর মা ও মামলার বাদী সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, মেয়েকে তিনি অন্যত্র বিয়ে দিয়েছেন। মেয়ে এখন সংসার করছেন। কারাগারে থাকা মামলার প্রধান আসামি তুফান সরকারের পরিবারের অনুরোধে ৪০ লাখ টাকার বিনিময়ে মীমাংসা করতে রাজি হয়েছেন তাঁরা। মামলা আপস করার শর্তে তাঁরা ইতিমধ্যেই (সাক্ষ্যের আগে) অর্ধেক টাকা দিয়েছেন। অবশিষ্ট টাকা তখনো হাতে পাননি তিনি।

মামলার অভিযোগ গঠনের পর আপসের সুযোগ আছে কি না, জানতে চাইলে মামলার বাদী বলেন, ‘সেটা আসামিপক্ষের বিষয়। সাক্ষ্য না দিলে বা কিংবা দুর্বল সাক্ষ্য দিলে মামলা এমনিতেই শেষ হয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ধর্ষণ এবং মাথার চুল ন্যাড়া করে দেওয়ার ঘটনায় দুটি মামলা চলমান। শুধু তুফান সরকারের কাকুতি–মিনতিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে বিচারাধীন ধর্ষণ মামলাটি আপসে রাজি হয়েছেন তাঁরা। চুল কেটে মাথা ন্যাড়া ও নির্যাতন করার ঘটনায় অন্য আদালতে বিচারাধীন মামলাটিতে তাঁরা আপস করবেন না।

ঘটনার শিকার ওই ছাত্রী বলেন, ‘আমার জীবনে যে ক্ষতি হয়েছে, তা আর ফিরে পাব না। এখন বাকিটা জীবন ভালোভাবে বাঁচতে চাই। বিয়ে করেছি, সংসার করছি। দুটো মামলার মধ্যে ধর্ষণ মামলা আপসে মা রাজি হয়েছেন। তবে তুফান কত টাকা ক্ষতিপূরণ দিচ্ছেন, সেটা আমি জানি না।’

তবে বগুড়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১–এর রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি নরেশ মুখার্জি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আলোচিত এই ধর্ষণ মামলার ভিকটিম ঘটনার পর আদালতে হাজির হয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। আসামিদের কয়েকজন আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। পুলিশ তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে। আদালত চার্জ গঠন করেছে। এখন মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। এই পর্যায়ে আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরার মুখে মামলার প্রধান সাক্ষী (বাদী) আদালতে দাঁড়িয়ে বলছেন কবেকার ঘটনা, তা তিনি জানেন না। মামলার অভিযোগের ব্যাপারে তিনি অবগত নন। মামলার এজাহারে জোর করে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। ভিকটিম আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, প্রধান আসামির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। ধর্ষণের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।’

আদালতের বাইরে অর্থের বিনিময়ে আপস প্রসঙ্গে আইনজীবী নরেশ মুখার্জি বলেন, ‘মামলার এ পর্যায়ে আদালতে আপসের কোনো সুযোগ নেই। তবে আদালতের বাইরে কোনো কিছু হয়ে থাকলে, তা আমাদের জানা নেই।’

বাদীর সঙ্গে আসামিপক্ষের কোনো আপস হয়েছে কি না, সে ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চাননি আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুল মান্নাফ। তিনি বলেন, ‘যা জানার আদালত থেকে জেনে নিন।’

ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় জামিন পেলেও গতকাল সোমবার কারাগার থেকে ছাড়া পাননি বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের বহিষ্কৃত আহ্বায়ক তুফান সরকার।

বগুড়া কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক মনির আহমেদ সোমবার রাতে গণমাধ্যমকে বলেন, ধর্ষণ মামলায় জামিনের নথি আদালত থেকে রোববার কারাগারে পৌঁছেছে। তবে তুফান সরকারের বিরুদ্ধে আরও ছয়টি মামলা আদালতে বিচারাধীন। এর মধ্যে পাঁচটি মামলায় জামিনে থাকলেও ‘প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট’ রয়েছে। দুদকের একটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ১৯ জুলাই বাসায় ডেকে এনে ওই ছাত্রীকে তুফান সরকার ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ। ঘটনার জেরে ২৮ জুলাই তুফানের স্ত্রী তাছমিন রহমান এবং তাঁর বড় বোন ও পৌর কাউন্সিলর মার্জিয়া হাসান মেয়েটি এবং তাঁর মাকে বাড়িতে নিয়ে নির্যাতনের পর মা-মেয়ের মাথার চুল কেটে ন্যাড়া করে দেন।

সূত্র: প্রথম আলো