সংবিধানের আলোকে দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিতামুলক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবীর ভুমিকা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২১ ১১:৫৫ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ সেলিম মিয়া:

রাষ্ট্র সমাজ ব্যবস্থায় ঘোষ, দুর্নীতি, আইন লংঘন, অনিয়ম সব জায়গায় যেন নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে। সবার এসব সয়ে গেছে আমরা কেউ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি না। আমি কিন্তু প্রতিবাদ বলতে শুধু শারীরিক ভাবেই প্রতিবাদ বলছি না। প্রতিবাদ করা যায় মেধা, মননে, কলমে সর্বপরি যথাযথ আইন প্রয়োগে বাধ্য করার মাধ্যমে । অনেক সময় কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে শাসক গোষ্ঠীকে পরাস্ত করে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের পরিবর্তন করা যায়। শক্তিশালী বিরোধী দলের আন্দোলনে শাসক দল তটস্থ থাকে, অন্যায়, অবিচার, অনিয়ম করতে যেমন ভয় পায় তেমনি দীর্ঘ মেয়াদী সমাজের সিস্টেম পরিবর্তনের জন্য রাষ্ট এবং সমাজ ব্যবস্থার সব জায়গায় দরকার সংস্কার এবং জবাবদিহিতা তা না হলে সরকারের পরিবর্তন হলেও জনগণ এর ষোল আনা সুফল ভোগ করতে পারবে না। আর এটা সম্ভব বিচার বিভাগের মাধ্যমেই। চলুন দেখে নেওয়া যাক সব স্তরে জবাব দিহিতা নিশ্চিত করণে সংবিধান কি বলে।

সংবিধান এবং হাইকোর্ট ডিভিশন রুলস পর্যালোচনায় দেখা যায়, এক্ষেত্রে সুপ্রীম কোর্টের একজন আইনজীবী তার মেধার সঠিক প্রয়োগ ঘটানোর মাধ্যমে দেশের যে কোন জায়গায় যে কোন স্তরে গুরতর প্রকৃতির যে কোন পাব্লিক রং এর লাগাম টেনে ধরতে তথা নাগরিকের মানবাধিকার বা মৌলিক অধিকার বলবৎ করণের মাধ্যমে সমাজে আলোকবর্তিকা হিসাবে কাজ করতে পারে । রাষ্ট্রের যে কোন অংগে বা সমাজে যদি দেখা যায় যে গুরতর প্রকৃতির কোন পাবলিক রং হয়েছে বা হচ্ছে বা সংঘটিত হতে যাচ্ছে অথবা সংবিধানে বর্ণিত যে কোন নাগরিকের কোন মৌলিক অধিকার লংঘন হয়েছে তাহলে যে কোন নাগরিক নির্ধিতায় হাইকোর্ট বিভাগে প্রতিকারের জন্য আসতে পারেন । তবে হ্যা প্রচলিত আইনে যদি উক্ত অপরাধের প্রতিকার থাকেও তবুও আসতে পারেন যদি সেখানে দ্রুত প্রতিকারের কোন সম্ভাবনা না থাকে । এ ক্ষেত্রে সুপ্রীম কোর্টের একজন আইনজীবীর সাথে একজন সাংবাদিকও হাইকোর্ট বিভাগ থেকে প্রতিকারের ব্যপারে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে । এমন কি কেবলমাত্র একটি চিঠির মাধ্যমেও হাইকোর্ট বিভাগ থেকে এ বিষয়ে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।

মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের কোন রিট মোশন বেঞ্চ, সংবাদপত্র বা অন্য যে কোন মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ অথবা যে কোন ব্যক্তি কর্তৃক প্রধান বিচারপতিকে/হাইকোর্ট বিভাগের যে কোন বিচারককে/আদালতকে(হাইকোর্ট বিভাগকে)/রেজিস্ট্রারকে উদ্দেশ্য করে লেখা কোন চিঠি পর্যালোচনা করে সন্তোষ্ট হলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ মোতাবেক হাইকোর্ট বিভাগ তার স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত মনে করিলে যে কোন প্রতিকার দিতে পারেন।

উক্ত ক্ষেত্রে পত্রিকার প্রতিবেদন দেখে কিংবা টিভিতে সংবাদ প্রচার দেখেও মাননীয় বিচারপতিগনের সুয়োমোটো প্রতিকার দেওয়ার ট্রেডিশন আমরা প্রায়ই লক্ষ করছি।

ভারতীয় সুপ্রীম কোর্টের ইতিহাসে ভুরিভুরি প্রমাণ আছে যেখানে দরিদ্র মা, শিশু কিংবা পিতার লেখা পত্রকে রীট পিটিশন আকারে গ্রহণ করে মৌলিক অধিকার লংঘনের প্রতিকার দিয়েছে । এর মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্যযোগ্য Niabati Behera vs State of Orissa (1993) 2 SCC 746 মামলাটি। উপরোক্ত মামলায়, ২২ বছরের এক যুবককে পুলিশ একটি চুরির মামলায় গ্রেফতার করে নিয়ে যায়, পরের দিন যুবকটির লাশ পার্শ্ববর্তী রেল লাইনের উপর পড়ে থাকতে দেখা যায় এবং তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল । পুলিশ দিন শেষে লাশটিকে উদ্ধার করে । মৃত যুবকের মা ভারতীয় সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বরাবর একটি পত্র দেয় ঘটনার বিবরণ দিয়ে এবং উক্ত পত্রে ছেলে হত্যার জন্য সুপ্রীম কোর্টের কাছে ক্ষতিপুরণ দাবি করে। পরবর্তীতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং ফরেনসিক রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ভারতীয় সুপ্রীম কোর্ট ভিকটিমের মা নীলাবতি বেহারেকে ১,৫০,০০০ রুপি ক্ষতিপুরণের নির্দেশ দেয় । ভারতীয় সুপ্রীম কোর্টের মত ভুরিভুরি না হলেও বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টেরও এধরনের নজির রয়েছে Tayeeb vs Bangladesh 67 DLR (AD) 57 (2011) মামলায় আপীল বিভাগ স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে যে, মৌলিক অধিকার বলবৎ করণের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন দেওয়ার প্রয়োজন নেই । হাইকোর্ট বিভাগের কোন মোশন বেঞ্চ কোন পত্র, পত্রিকার খবর বা টেলিগ্রাম ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে সরকারের প্রতি রুল জারী করতে পারে ।

যদিও আইনের এই ব্যবহার হাইকোর্ট ডিভিশন রুলসে এবং উপরোক্ত মামলাটিতে কেবলমাত্র রিট পিটিশন এর বিষয়ে বলা হয়েছে, তবে অন্যান্য বিষয়  যেমন ক্রিমিনাল বিষয়ে একইভাবে চিঠির মাধ্যমে জনস্বার্থে কিংবা মক্কেলের স্বার্থে আবেদন করা যাবে। যেটা আমরা 53 DLR (2001) 414 রিপোর্টেড মামলাটি গো থরো করলে সম্যক ধারণা পেতে পারি। উক্ত মামলায়, ২০০১ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তৎকালীন অ্যাডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ডক্টর ফস্টিনা পেরেইরা বিভিন্ন দেশের ২৯ জন বন্দীদের মুক্তির জন্য তৎকালীন মাননীয় প্রধান বিচারপতি বরাবর একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন । সেই চিঠিটি তৎকালীন মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয় হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার কে নির্দেশ দেন একটি সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে উপস্থাপন করার জন্য এবং সেই নির্দেশ অনুযায়ী সেই চিঠির ভিত্তিতে সুয়োমোটো রুল ইস্যু করা হয় যাহা পরবর্তীতে হাইকোর্ট বিভাগের তৎকালীন মাননীয় বিচারপতি জনাব মোঃ হামিদুল হক এবং মাননীয় বিচারপতি জনাব নাজমুন আরা সুলতানা মহোদয়ের গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ কর্তৃক রুল এবসলিউট করে রায় প্রদান করা হয়েছিল এবং পিটিশনারের পক্ষের আইনজীবী নিজামুল হকের বক্তব্যের সাথে আদালত একমত হয়েছিলেন যে, জেল কোডের বিধি ৭৮ এবং ৫৭৮ মোতাবেক, নির্ধারিত দন্ড ভোগ করা শেষে কোন বন্দীকে জেলখানায় আটক রাখা সংবিধানে সন্নিবেশিত মৌলিক অধিকার বা মানবাধিকারের সুষ্পষ্ট লংঘন। সেক্ষেত্রে জেল কোডের বিধি ৭৮ মোতাবেক, জেল সুপারের প্রথমত দায়িত্ব হলো, আইনে বর্ণিত সকল ফরমালিটি সম্পন্ন করে টাইম এক্সপায়ার বন্দিদেরকে মুক্তি দেওয়া।

ইহা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা আবশ্যক যে, চিঠির ভিত্তিতে উদ্ভুত মামলার ক্ষেত্রে, হাইকোর্ট বিভাগের মাননীয় বিচারপতি মহোদয়ের আদেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বরাবর প্রেরণ করিবার ক্ষেত্রে কোন প্রকার রিকুইজিট প্রদান করতে হবে না । কোন প্রকার কোর্ট ফি প্রদান করিতে হইবে না অর্থাৎ যে বিজ্ঞ আইনজীবী জনস্বার্থে বা তার মক্কেলের স্বার্থে কোন বিষয়কে একটি সাধারণ চিঠি লিখে মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয় বরাবর কিংবা সংশ্লিষ্ট বিচারপতি মহোদয় বরাবর কিংবা হাইকোর্ট বিভাগ এর রেজিস্ট্রার বরাবর যে কোন পদ্ধতিতে প্রেরণ করিবেন তাহাকে তাহার চিঠি উদ্ভূত মামলার ক্ষেত্রে আর কোন প্রকার টাকা খরচ করিতে হইবে না।

এই বিষয় গুলো দেশের বেশিরভাগ নাগরিক জানে না, আবার খোদ সুপ্রীম কোর্টের বিজ্ঞ কিছু আইনজীবী প্রসিডিরটা জানলেও প্রচার নাই বা ন্যায় বিচার নিশ্চিত করণে সক্রিয় ভুমিকা পালনে বা জনস্বার্থে অনেকে ব্যস্ততার জন্য এগিয়ে এগিয়ে আসতে পারেন না। আমার মতে, এ বিষয়টার প্রচুর পাব্লিসিটি দরকার। সমাজের সব স্তরের নাগরিক জানুক যে কোন পাব্লিক রং হলেই সে সমাজের যত ক্ষমতাধর ব্যক্তি হউক না কেন আইনের আওতায় আসতে হয় কারন সংবিধান মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের উভয় বিভাগকে অপার ক্ষমতা দিয়েছে যা অন্য কোন কর্তৃপক্ষের নাই। তবে এ ক্ষেত্রে মহামান্য সুপ্রীম কোর্টকে অনেক সাহসি ভুমিকায় থাকতে হয়। সুপ্রীম কোর্ট সংসদ এবং নির্বাহী বিভাগেরও উপরে, সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইনও ব্যাখ্যা করে সুপ্রীম কোর্ট। আইনে যদি কোন রকম ব্যতয় থাকে বাতিল করে দিতে পারে সুপ্রীম কোর্ট। এছাড়া দেশে-বিদেশে সর্বোচ্চ আদালত আইন লংঘন হলে কারো বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে কুন্ঠা বোধ করেন নি। গত ২০ মার্চ, ২০১৬ ইং তারিখে সর্বোচ্চ আদালতকে নিয়ে মন্তব্যের জেরে আদালত অবমাননার অভিযোগে সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হককে আপিল বিভাগে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল পরে তারা হাজির হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আবেদনও করেছিল। পরে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে সরকারের দুই মন্ত্রীকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেছিল সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ এবং পরবর্তী ৭ দিনের মধ্যে ওই জরিমানার টাকা ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল ও সিডনি লিভার ফাউন্ডেশনে জমা দিতে বলা হয়েছিল যদি জরিমানা দিতে ব্যর্থ হন অনাদায়ে ৭ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

যদিও উক্ত ঘটনায় মাননীয় ২ মন্ত্রী আদালত অবমাননার অভিযোগ মাথায় নিয়ে নিজে থেকে সরে দাঁড়ায় নি বা প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে সরে দাড়াতে বলেন নি।

এছাড়া, সাবেক আইজিপি জনাব শহিদুল হক কর্তৃক সর্বোচ্চ আদালতের অবমাননার জন্য চাকুরি চলে গিয়েছিল। 58 DLR (AD) (2006) 150। উক্ত মামলায় সুপ্রীম কোর্টের তৎকালীন মাননীয় বিচারপতি সামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক মহোদয়ের গাড়ি সুপ্রীম কোর্টের ফ্ল্যাগ নিয়ে চলমান থাকা অবস্থায় পুলিশের অন্য গাড়িকে সেলুট দিলেও তার গাড়িকে সেলুট না দেওয়ায় পুলিশ সার্জেন্ট শোয়েবুর রহমান জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, আমরা হাইকোর্টের ফ্ল্যাগ সেলুট দিতে বাধ্য নয়, উপস্তিত আরও ২ জন সার্জেন্ট মোস্তাফিজ এবং রাসেল বলেছিল, ” আমগো ঠেকা পরে নাই কোর্টের ফ্লাগ সেলুট দেওয়ার”। উপরোক্ত ঘটনা ছাড়াও এক পুলিশ সার্জেন্ট হাফিজ মাহমুদ গত ১৯/০৬/২০০৩ ইং তারিখে সন্ধা ৬.৩০ সময় বনানীর কামাল আতাতুর্কের প্রবেশপথে ইচ্ছাকৃতভাবে সুপ্রীম কোর্টের ফ্ল্যাগ বাহী গাড়ি সেলুট দেওয়া থেকে বিরত থাকে এবং এটা চলতেই থাকে পরে এসব ঘটনায় উক্ত সার্জেন্টকে সশরীরে তলব করে পুলিশের আইজির বক্তব্য মাননীয় আদালত চাইলে আইজির বক্তব্য আদালত অবমাননা সুচক হওয়ায় সুয়োমোটো কন্টেম রুল ইস্যু করে এবং অনেক পরে একপর্যায়ে ভুলের জন্য পুলিশের তৎকালীন আইজি নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করলেও প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ আপীল শুনানিতে তা আমলে না নিয়ে বলেন, “His apology has not come from his heart but has come from his pen and is a products of afterthought and can not be accepted.”

সম্প্রতি ১২/০৭/২০২১ ইং তারিখে নেপালের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়েছেন কে পি শর্মা ওলি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নতুন প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা। গত কয়েকমাস কেয়ারটেকার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাজ চালাচ্ছিলেন ওলি। নতুন ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু বিরোধীরা আদালতে যান। সেখানে দাবি করা হয়, বিরোধী নেতা শের বাহাদুর দেউবাকে ফ্লোর টেস্টের সুযোগ দিতে হবে। অর্থাৎ, ওলিকে সরিয়ে তাকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী হয়ে সংসদে আস্থা ভোটে জেতার চেষ্টা করবেন দেউবা।নেপালের সুপ্রিম কোর্ট সেই দাবি মেনে নিয়েছে। এরকম উদাহারণের কমতি নেই, রয়েছে অনেক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

যাহোক পত্রিকার প্রতিবেদন দেখে আদালতের সুয়োমোটো প্রতিকার দেওয়ার ট্রেডিশন থাকলেও এখন দরকার দরিদ্র বিচারপ্রার্থীদের চিঠির মাধ্যমে স্বল্প খরচে বা বিনা খরচে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আইনি প্রতিকার দেওয়ার ট্রেডিশন চালু করার। তবে এক্ষেত্রে সুপ্রীম কোর্টের একজন আইনজীবীর পাশাপাশি একজন সাংবাদিকেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা উচিৎ।

এছাড়া সিআরপিসির ২৫ ধারায় বিধান অনুযায়ীও, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ পদাধীকার বলে সমগ্র দেশের জন্য জাস্টিস অব দি পিস হিসাবে ন্যায়বিচার লঙ্ঘনে দেশের যে কোন প্রান্তে যে কোন সময় কাজ করতে পারে। 58 DLR (AD) (2006) 150

এ মাধ্যমগুলি ব্যবহার করবে একজন আইনজীবী এবং জনসচেতনতার জন্য প্রচারের দায়িত্ব একজন সাংবাদিকদের।

আমি মনে করি, সবাই আইন জানলে, সব মহল থেকে সবাই সোচ্চার হলে, অন্যায় দেখে চুপ করে বসে না থেকে মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগের শরনাপন্ন হলে সমাজে আইন লংঘন কমে আসবে এবং প্রজাতন্ত্রে চাকুরিতে নিয়োজিত সকল কর্মকর্তা/কর্মচারী সংবিধানে সন্নিবেশিত মৌলিক অধিকার আর্টিকেল ৩১,৩২ ও ৩৫(৫) মেনে চলতে বাধ্য হবে অর্থাৎ আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষতঃ আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে এবং আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না। কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।

অর্থাৎ আইনের প্রয়োগ ঘটাতে পারলে কেবল মাত্র আইনের বিধান মোতাবেক সবাইকে কাজ করতে বাধ্য করা যাবে, সমাজে স্বেচ্ছাচারিতা, ঘোষ, দুর্নীতি মোটকথা আইন লংঘন কমে আসবে । তাই বর্তমান এই করোনায় বিপর্যস্ত বিচার বিভাগকে সচল রাখার অন্যতম একটা হাতিয়ার হতে পারে সরাসরি পত্রের মাধ্যমে আইনি প্রতিকার দেওয়া তাই মাননীয় প্রধান বিচারপতির কাছে আমার সবিনয় প্রার্থনা বিশেষ করে অসহায় ও দুঃস্থ ব্যক্তিরা আইনজীবীর সহায়তা ছাড়াও যাতে সরাসরি পত্রের মাধ্যমে করোনার এই ক্রান্তিকালে মৌলিক অধিকার লংঘনের প্রতিকার পেতে পারে এ ব্যাপারে আশু ব্যবস্থা গ্রহণ । সে জন্য প্রয়োজন, সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবীদেরও সদিচ্ছা এবং প্রযোজ্যক্ষেত্রে বিনা পয়সায় বা নাম মাত্র মুল্যে আইনি প্রতিকার দেওয়া। আমি ব্যক্তিগত ভাবে শুরু করতে চাচ্ছি, কেউ আইনের বিধান ব্যতিতো ক্ষতির সম্মুখীন হলে আমার কাছে আসুন কথা দিচ্ছি, সব ধরনের সহায়তা দিব।

এর সাথে প্রেকটিস লাইফের আরেকটি বাস্তবতা উল্লেখ না করলেই নয় তা হলো, কিছু কিছু আইনজীবীর প্রতি মানুষের আস্থা কম; অনেক আইনজীবী উচ্চ ফি নিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ অনেকের, আমরা জানি অনেক আইনজীবী মামলায় স্প্রিডি প্রতিকারের জন্য প্রচুর টাকা নেয় আবার ক্লায়েন্টরা দেয়ও; কিন্তু আমি বলব বাস্তবতায় এর জন্য দায়ী কারন মামলা লিস্টে উঠানো, শুনানীর জন্য আপগ্রেডেশন, অন্তর্বর্তীকালীন আবেদন, ভুল সংশোধনীর আবেদন, সাপ্লিমেন্টারি এফিডেভিট, উহার শুনানী, বেঞ্চ কর্মকর্তাদের দিয়ে আদেশ রায় টাইপ করানো, সেকশন থেকে আদেশের কপি তুলা, নোটিশ জারী করা সহ প্রত্যেকটি ঘাটে ঘাটে তদবির আর তদবির, মাঝে মাঝে জরুরী মামলা শুনানীর জন্য অবিশ্বাস্য পরিমান টাকা দিতে হয় তবে ঘোষ হিসাবে নয় স্প্রিড মানি হিসাবে, ভদ্র লোকের ভাষা বলে কথা। এছাড়া অধস্থন আদালত থেকে LCR নিয়ে আসার জন্য তদবির না করলে ৫/১০ বছর তো বটেই অনেক ক্ষেত্রে ১০/১৫ বছরেও LCR হাইকোর্টে আসবে না । মাঝে মধ্যে টাকার জোরে ফাইল গায়েবও হয়ে যায়। আমার একটা মিস ফাইল বছর দুয়েক যাবত গায়েব শত চেষ্টা করেও বের করতে পারছি না অথচ ফাইলটি আমি নিজে বের করে ওকালতনামা দাখিল করেছিলাম, বড় অংকের টাকার মামলার ক্ষেত্রে এগুলো বেশি হয়। এত সব জটিলতা নিমিষেই কেল্লাফতে যদি থাকে তার থাকে স্প্রিড মানি । এই পদ্ধতিগত জটিলতার জন্য কিন্তু সুপ্রীম কোর্ট নিজেই দায়ী । উচ্চ আদালত যেন তদবিরের কাছে জিম্মি । এত তদবিরে চাপে নিষ্পেসিত হয় বিবেক; স্থলন ঘটে সততার । মনে হয় এ পেশা থেকে যা আয় করি তাতো পুরাটাই কলুষিত, দুষিত। মাঝে মাঝে মনে হয় গরিবের জন্য উচ্চ আদালতে বিচার চাওয়া অন্যায় অথবা গরিবদের জন্য আমার অবচেতন মনে কেমন যেন বেজে উঠে, গরিবরা উচ্চ আদালতে বিচার চাহিয়া লজ্জা দিবেন না। এই ত্রাহি অবস্থা উত্তোরণের জন্য যদিও হেডলাইনটা দিয়েছিলাম দুর্নীতি বন্ধে বা ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় আইনজীবীর ভুমিকা বা দায়বদ্ধতা কিন্তু রাষ্ট্রের দুর্নীতি বা বেআইনি বন্ধে আইনজীবীরা ভুমিকা পালন করতে পারলেও সুপ্রীম কোর্টের কর্মচারীদের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম বা ঘোষ বাণিজ্য বন্ধে ভুমিকা মুলত কার হয়ত সচেতন পাঠক বুঝে গিয়েছেন। রাষ্ট্রের সব স্থরে যারা দুর্নীতি বা বেআইনি বন্ধে কাজ করবে সেই জায়গাই যদি কলুষিত থাকে তাহলে আইনজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ সকল নাগরিকের মনে প্রশ্ন থেকে যায়। এরুপ অবস্থায়ও মাননীয় প্রধান বিচারপতি একটু সদয় হলে আইনের মধ্যেই অসহায় ও দুঃস্থ ব্যক্তিরা আইনজীবীর সহায়তা ছাড়াও অর্থাৎ বিনা খরচে বা স্বল্প খরচে সরাসরি পত্রের মাধ্যমে কিংবা সাদা কাগজে দরখাস্ত লিখে মৌলিক অধিকার লংঘনের প্রতিকার চেয়ে মামলা করতে পারেন ।

এছাড়া আপনারা যারা শিক্ষিত যারা আমার লেখাটা পড়বেন বিশেষ করে সাংবাদিক ভাইদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনি আপনার আশে পাশের অসহায় নির্যাতিত মানুষটিকে একটু উপদেশ দিয়ে কিংবা একটি পত্র লিখতে সহায়তা করতে পারেন যাতে সে তার সংবিধানে সুরক্ষিত মৌলিক অধিকার লংঘনের ক্ষেত্রে অন্ততপক্ষে উচ্চ আদালতকে জানাতে পারে ।

হাইকোর্টে যে ভাবে পত্র লিখবেন ?

এ ধরনের পত্র লিখার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক হওয়া দরকার আছে ।

১। পুর্বেই বলেছি চিঠি প্রেরণের বিভিন্ন পদ্ধতি থাকলেও আমি বলব কোন (প্রযোজ্য ক্ষেত্র অনুযায়ী) রীট/ ক্রিমিনাল মোশন বেঞ্চের পরিচালনাকারী মাননীয় বিচারপতির নামে পত্রটি প্রেরণ করা উত্তম । মোশন বেঞ্চের পরিচালনাকারী মাননীয় বিচারপতির নাম হাইকোর্ট বিভাগের দৈনিক কার্যতালিকা থেকে নিতে পারেন অথবা সুপ্রীম কোর্টের ওয়েব সাইট থেকেও নিতে পারেন । কিংবা মাননীয় প্রধান বিচারপতির কাছে পত্র দিতে পারেন সেক্ষেত্রে মাননীয় প্রধান বিচারপতি উক্ত পত্র কোন মোশন বেঞ্চে প্রেরণ করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলতে পারেন ।

২। পত্রে নির্মমভাবে মানবাধিকার লংঘন/অপরাধের ঘটনার বিবরণ থাকা উচিৎ । কিভাবে সরকারী কর্তৃপক্ষের বা সরকারী ব্যক্তির দ্বারা, কখন কোন পরিস্থিতিতে ভিকটিমকে নির্যাতন করা হয়েছে বা মৌলিক অধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটেছে তার যথাসম্ভব বিস্তারিত বিবরণ থাকা উচিৎ ।

৩। পত্রে মানবাধিকার লংঘনের জন্য ক্ষতিপুরণ চাওয়া উচিৎ ।

লেখক: এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট