বিচার বিভাগের অবদান


প্রকাশিত :২৫.১২.২০১৬, ৩:২৯ অপরাহ্ণ

surendrakumarsinhaপ্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা

দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে আমরা হয়েছি স্বাধীন, পেয়েছি সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমাদের এ স্বাধীনতা একদিকে যেমন বেদনার, অন্যদিকে বীরত্বের এবং পরম গৌরবের। আমার বক্তব্যের শুরুতেই স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন এক স্বাধীন বিচার বিভাগের- যেখানে শোষিত, নির্যাতিত এবং অসহায় মানুষ স্বল্প খরচে দ্রুত ন্যায়বিচার পাবে। যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ-সে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আজকের এ বিজয়ের মাসে জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও গভীর শ্রদ্ধা। ২ লক্ষ মা-বোন যারা স্বাধীনতার জন্য সম্ভ্রম হারিয়েছেন তাঁদের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, আন্তরিক ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা।

 বিচার বিভাগের গুরুত্ব

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিচার বিভাগের ভূমিকা অপরিসীম। আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ; আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের দায়িত্ব এবং স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে বিধৃত রয়েছে। তাই বলা হয়—“The system of checks and balances is applicable to all three and none must overstep their respective limits. The inevitable tension between the organs must be viewed as a creative one, which ultimately results in strengthening the foundations of constitutionalism”। তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ এর সীমিত সম্পদ ও বাজেটের মাধ্যমে নিরন্তর দায়িত্ব পালন করছে। বিচার বিভাগ-এর উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে রাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একটি দেশের বিচার বিভাগের দক্ষতা এবং দ্রুত বিচারের উপর ভিত্তি করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হয়। সর্বোপরি, বিচার বিভাগের কর্ম দক্ষতার উপর একটি দেশের সভ্যতার মাপকাঠি পরস্ফুিট হয়ে উঠে। অন্যকথায় বলা যায় যে, কোনো দেশের সরকারের কৃতিত্ব পরিমাপ করার সর্বোত্তম মাপকাঠি হচ্ছে তাঁর বিচার বিভাগের দক্ষতা ও যোগ্যতা।

বিচার বিভাগের অবদান

দেশের ভাবমূর্তি সমুজ্জ্বল করতে বিচার বিভাগের অবদান অন্য কোনো বিভাগের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সকল ক্রান্তিলগ্নে বিচার বিভাগ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। যেখানে রাষ্ট্রের অন্য সকল বিভাগ ও প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়েছে বিচার বিভাগ সেখানেও সমহিমায় উজ্জ্বল। এর কিছু দৃষ্টান্ত আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি—

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার

বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদেরকে নৃশংসভাবে হত্যাকারীদের রক্ষার জন্য Indemnity আইন প্রণীত করে দীর্ঘদিন বিচার কাজ বন্ধ করা হয়েছিল, সুপ্রীম কোর্ট তা অবৈধ বলে ঘোষণা করে। হত্যার বিচার করে অপরাধীদেরকে আইন অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছে বিচার বিভাগ।

চার জাতীয় নেতার হত্যার বিচার

কারা অন্তরালে নৃশংসভাবে চার জাতীয় নেতাকে হত্যার বিচার কাজও বন্ধ করা হয়েছিল। এর বিচার স্বল্প সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করে, বিচার বিভাগ একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে গণহত্যা ও মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটনে যারা সহায়তা জুগিয়েছিল সেই যুদ্ধাপরাধীদের ৪২ বছর পর বিচারের মুখোমুখি করা হয়। তাদের কয়েকজনকে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর আওতায় আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হয়েছে। বিচার কাজ এখনো চলছে। বিচার বিভাগ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী অনেক Veteran যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে জনগণ তথা বিশ্ববাসীর আস্থা অর্জন করেছে। এ বিচার নুরেমবার্গ, সার্বিয়া ও কম্বোডিয়ার  যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সমপর্যায়ের স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে করা হয়েছে এবং হচ্ছে। ফলে সমগ্র জাতির দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা অনেকাংশেই পূরণ হয়েছে।

জেএমবি এবং জঙ্গিদের বিচারের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের অবদান

জেএমবির নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ও বিচারক হত্যা মামলার রায় প্রদান করে সব ধরনের সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স দেখিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং আইনের শাসন সুদৃঢ় করেছে বিচার বিভাগ।

১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা

১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় দ্রুত বিচার করে বিচার বিভাগ এধরনের ঘৃণিত অপরাধীদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করে জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বিচার

পূর্বতন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের অল্প কয়েক দিনের মধ্যে বিডিআর বিদ্রোহ ঘটিয়ে সরকার তথা পুরো দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য চেষ্টা করা হয়েছিল। বিডিআর হত্যা মামলা কোন্ আদালতে বিচার হবে সে নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা ছিল। সর্বোচ্চ আদালত এর উপদেষ্টামূলক এখতিয়ার প্রয়োগ করে এ বিষয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান দিয়েছেন। যার ফলে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য অপরাধের দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে।

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির বিধান বাতিল

গণতন্ত্রকে বিকশিত করার জন্য গণতান্ত্রিক সরকারের প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক সরকারের স্থলে অগণতান্ত্রিক সরকার সমাধান নয়। এটি রাজনীতিবিদদের দেউলিয়াপনা। ত্রয়োদশ সংশোধনীর ফলে অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনকে একটি মহলের খেয়ালখুশি মতো পরিচালনার ব্যবস্থা হয়েছিল। ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন রাষ্ট্রের মূলভিত্তি জনগণের সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পরিচয় খর্ব করায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত তা অসাংবিধানিক ও অবৈধ বলে ঘোষণা করে। উক্ত সংশোধনী বাতিল করে গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করতে নির্দেশ প্রদান করে বিচার বিভাগ। ফলে জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল এবং সামরিক শাসন অবৈধ ঘোষণা

দেশের সর্বোচ্চ আদালত পঞ্চম সংশোধনী এবং সপ্তম সংশোধনী বাতিল করে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে। পবিত্র সংবিধান থেকে সামরিক আইন তথা সামরিক শাসকদের সংশোধিত ও সন্নিবেশিত বিধানসমূহ মুছে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগের এই আদেশের ফলে সামরিক শাসনের সম্ভাবনা চিরতরে নির্বাসিত হয়েছে এবং গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করার সুযোগ পরাহত হয়েছে।

বিচারক স্বল্পতা

নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিচারকগণ আন্তরিকভাবে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করায় বিগত বছরগুলোর তুলনায় মামলা নিষ্পত্তির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশের বিচারকের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। আমেরিকায় ১০ লক্ষ মানুষের জন্য ১০৭ জন, কানাডায় ৭৫ জন, ইংল্যান্ডে ৫১ জন, অস্ট্রেলিয়ায় ৪১ জন, ভারতে ১৮ জন বিচারক রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে ১০ লক্ষ মানুষের জন্য মাত্র ১০ জন বিচারক রয়েছে। জনসংখ্যা এবং মামলার সংখ্যা অনুপাতে বিচারক নিয়োগ প্রদান করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে আপিল বিভাগে ৯ জন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৮৯ জন বিচারকের মধ্যে ৩ জন বিচারক International Crimes Tribunal-এর বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে ৪ জন বিচারক গুরুতর অসুস্থ। ফলে বিভিন্ন সময় বেঞ্চ গঠনের সময় আমাকে হিমশিম খেতে হয়। এদের মধ্য হতে ২০১৭ সালে ৭ জন বিচারক অবসর গ্রহণ করবেন। ফলে বেঞ্চ গঠনে জটিলতা আরো প্রকট হবে। ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আমি ৮ জন অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগের জন্য সরকারকে পরামর্শ প্রদান করি। দীর্ঘ আলোচনার পর পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এ সুপারিশ প্রেরণ করা হলেও দীর্ঘ চার মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও এ নিয়োগ প্রক্রিয়া আলোর মুখ দেখেনি।

দেশের নিম্ন আদালতসমূহে বিচারকের শূন্য পদ

নিম্ন আদালতের বিচারকের অনুমোদিত পদ সংখ্যা ১৬৫৫; এর মধ্যে ৩৮৭টি পদ শূন্য রয়েছে। অবশিষ্ট ১২৬৮ জন বিচারক দ্বারা ২৭ লক্ষাধিক মামলা নিষ্পত্তি করা অসম্ভব। তাছাড়া প্রতিদিন নতুন মামলা দায়ের হচ্ছে। সঙ্গত কারণে বর্তমানে শূন্য পদে দ্রুত বিচারক নিয়োগ দেওয়া আবশ্যক।

বিশেষ আদালতসমূহের স্থান সংকুলানের তীব্র অভাব

প্রায়শই সরকার নতুন আইন করে বিভিন্ন ধরনের ট্রাইব্যুনাল যেমন—নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল, এসিড অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, স্পেশাল জজ, পরিবেশ আদালত, পরিবেশ আপিল আদালত, ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনাল ইত্যাদি ট্রাইব্যুনাল গঠন করছে। এ সকল ট্রাইব্যুনালের জন্য কোনো পৃথক আদালত ভবন, পরি-কাঠামো নির্মাণ এবং রেকর্ড রুম ও বসার জায়গা অপরিহার্য হলেও সরকার এ বিষয়ে সব সময় উদাসীন। পৃথক আদালত ভবন, অবকাঠামো না থাকায় ব্রিটিশ আমলের নির্মিত জরাজীর্ণ ভবনে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে একাধিক বিচারক এক এজলাস সময় ভাগাভাগি করে বিচারকার্য চালিয়ে যাচ্ছে।

নিম্ন আদালতের বিভিন্ন পদে পদায়নের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি হিসেবে আমি গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহে সত্, দক্ষ ও মেধাবী বিচারক নিয়োগ দিতে চাইলেও  আমাকে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়।

ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অবকাঠামোগত সমস্যা

বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে ২০০৭ সালের পহেলা নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক হয়ে এর যাত্রা শুরু করে। অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়ে পৃথকীকৃত বিচার বিভাগ সামনের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে। তীব্র অবকাঠামোগত সমস্যা ও নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটগণ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে দ্রুত ও গুণগত বিচার নিষ্পত্তি নিশ্চিত করার ফলে বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থা ক্রমশ বাড়তে থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় দীর্ঘ ৯ বছর অতিক্রান্ত হলেও অদ্যাবধি ম্যাজিস্ট্রেসির জন্য পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামোগত স্থাপনা নির্মিত হয়নি। ৪২টি জেলায় ম্যাজিস্ট্রেসি বিল্ডিং নির্মাণের প্রকল্প গৃহীত হলেও এ পর্যন্ত মাত্র ৪টি জেলায় বিল্ডিং আংশিক হস্তান্তর করা হয়েছে। ৮টি জেলায় ম্যাজিস্ট্রেসি বিল্ডিং নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলেও ফার্নিচারের অভাবে তা এখনও ব্যবহার উপযোগী হয়নি। ২১টি জেলায় বিল্ডিং নির্মাণের কাজ ধীর গতিতে চলছে। ৯টি জেলায় বিল্ডিং নির্মাণের কাজ শুরুই হয়নি। অধিকন্তু ২৫টি জেলা জজ আদালতের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজেও উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি সাধিত হয়নি। ফলশ্রুতিতে ১৭০ জন বিচারককে এজলাস ভাগাভাগি করে বিচার কাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে বিচারিক কর্মঘণ্টার পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না।

বিচার বিভাগের জন্য তথ্য ও প্রযুক্তি সুবিধা

মামলা ব্যবস্থাপনায় সংস্কার এবং দক্ষ সেবাদানের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। সফ্টওয়্যারের সহায়তায় কোনো মামলার তথ্য এখন সার্চ কমান্ড দিয়ে বের করা সম্ভব। তথ্য প্রযুক্তির সর্বশেষ সুবিধাগুলো ব্যবহার করে সকল নাগরিকের কাছে তাদের পছন্দের ডিভাইসে মামলার তথ্য পাঠানোর কাজটিও নিশ্চিত করা কঠিন কাজ হবে না। সুপ্রিম কোর্টে আমরা তথ্য প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেক আগেই উপলব্ধি করি। কারণ তথ্য প্রযুক্তি দিয়েই কাজের গতি কয়েক গুণ বৃদ্ধি এবং সেবার জন্য অপেক্ষমাণ সর্বশেষ ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো সম্ভব। বিচার ব্যবস্থার ডিজিটাইজেশনের পথে এরই মধ্যে আমরা কিছু এগিয়েও গিয়েছি। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে অঙ্গীকারাবদ্ধ। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং a2i-এর যৌথ উদ্যোগে বিচার বিভাগীয় তথ্য বাতায়ন তৈরি করা হয়েছে। বিচার বিভাগের জন্য মনিটরিং ড্যাশ বোর্ড তৈরি করা হচ্ছে। উচ্চ ও নিম্ন আদালতে ই-কোর্ট ব্যবস্থা চালু, ডিজিটাল পদ্ধতিতে রেকর্ড ধারণ ও সংরক্ষণ, জেলা ভিত্তিক ও কেন্দ্রীয় কারাগারের মধ্যে ভিডিও কনফারেন্সের সুবিধা চালু, দেশের বিচার ব্যবস্থায় ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের প্রচলন এবং বিচারিক কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার তিন বছর মেয়াদি ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প গ্রহণ করার বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের উদ্যোগে বহুদূর এগিয়েছে। নিম্ন আদালতসহ সুপ্রিম কোর্টে ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প গ্রহণের জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী ও  তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করি এবং এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৪০০ কোটি টাকা প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়। Pre-ECNAC মিটিংয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কয়েকজন কর্মকর্তা এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি উত্থাপন করেন। পরে  Pre-ECNAC-এ পাস হওয়ার পরও একই মন্ত্রণালয় বিগত ৩১ অক্টোবর, ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের পত্রে সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়ন ও প্রেরণ স্থগিত রাখার অনুরোধ করে।

বিচার বিভাগকে ডিজিটালাইজড করার জন্য উক্ত প্রকল্পের কার্যক্রম জরুরি ভিত্তিতে শুরু করার বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটালাইজেশনের স্বপ্ন অনেকটা অপূর্ণ থেকে যাবে।

দীর্ঘদিন সাক্ষী না আসার ফলে ঝুলে থাকা ফৌজদারী মামলাগুলো নিষ্পত্তি

দেশের বিভিন্ন আদালতের বিচারকদের সাথে আলোচনা করে জানা যায় যে, সাক্ষী হাজির না করার ফলে ফৌজদারী মামলা অযথা বিলম্ব হচ্ছে। ফৌজদারী কার্যবিধির ১৭১(২) ধারা অনুযায়ী সাক্ষী হাজির করার দায়িত্ব পুলিশের। অপরাধীদের গ্রেফতার করার চেয়ে সবচেয়ে কঠিন কাজ সত্ ও দক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিবেদন দাখিল করত সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিত নিশ্চিত করে প্রকৃত অপরাধীর সাজা নিশ্চিত করা। আমাদের দেশে পুলিশ প্রশাসন অপরাধীদের গ্রেফতার করার ব্যাপারে যতটা পারদর্শী, কিন্তু সাক্ষী উপস্থিতির ক্ষেত্রে ততটা পারদর্শী নয়। সে কারণে মামলার ফলাফল প্রচণ্ডভাবে হতাশাজনক হয়। সকল প্রসেস জারি করার পরও সাক্ষী হাজির না হলে ম্যাজিস্ট্রেটগণ ফৌজদারী কার্যবিধির ২৪৯ ধারায় মামলার কার্যক্রম বন্ধ করতে পারেন। মনে রাখতে হবে এই পুরাতন মামলা আমাদের জন্য যেমন বিড়ম্বনার তেমনি বিচার প্রার্থীর কাছেও এগুলো বোঝা।

কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত কারাবন্দিদের অর্থদণ্ড পরিশোধ সহজীকরণ

কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত কারাবন্দিদের অর্থদণ্ড পরিশোধ সহজীকরণ করার বিষয়ে গত ০২/০৯/২০১৬ খ্রিস্টাব্দ তারিখে হাইকোর্ট বিভাগ হতে ০৫/২০১৬এ নম্বর সার্কুলার জারি করা হয়। এতে কারাবন্দিদের অর্থদণ্ড পরিশোধে ভোগান্তির পরিমাণ বহুলাংশে লাঘব হবে।

বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি ও মামলা নিষ্পত্তির অগ্রগতি

প্রধান বিচারপতির দায়িত্বভার গ্রহণের পর আমি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ অনেকগুলো জেলা পর্যায়ের আদালত পরিদর্শন করেছি। এ সময় বিভিন্ন জেলায় জুডিসিয়াল কনফারেন্সে যোগদান করি এবং মূল্যবান নির্দেশনা প্রদান করি। জুডিসিয়াল কনফারেন্স এবং পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্স নিয়মিত অনুষ্ঠানের বিষয়ে ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট হতে সার্কুলার জারি করা হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং সুপ্রিম কোর্টের নিরবচ্ছিন্ন মনিটরিং এবং প্র্যাকটিস ডিরেকশন ইস্যুর ফলে বিচারকদের মধ্যে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির স্পৃহা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায় যা পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দৃশ্যমান হবে। পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট হয় যে, বর্তমান বছরে দেশের নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালতে মামলা নিষ্পত্তির হার বিগত বছরের এ সময়ের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে বর্তমানে ৯৮ জন (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ৩ জনসহ) বিচারক কর্মরত আছে। নিম্ন আদালতে ১৫০০ বিচারকের মধ্যে প্রেষণ ব্যতীত কেবল ১৩০০ বিচারক বিচারকার্য পরিচালনা করছে। এত অল্পসংখ্যক বিচারক দ্বারা ৩০ লাখের অধিক বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। তাছাড়া প্রতিদিন নতুন মামলা দায়ের হচ্ছে। সঙ্গত কারণে বর্তমানে নিম্ন আদালতের শূন্য পদসমূহে দ্রুত বিচারক নিয়োগ দেওয়া আবশ্যক।

ন্যাশনাল জুডিসিয়াল একাডেমি প্রতিষ্ঠার জন্য ২৫ একর জমি বরাদ্দ সংক্রান্ত

সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির জন্য প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের প্রতিবেশী দেশসহ পৃথিবীর সকল দেশে বিচারক ও বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে আধুনিক প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ দেওয়ার জন্য National Judicial Academy প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আমাদের দেশের উচ্চ আদালতের বিচারকদের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের কয়েকজন বিচারপতি ভারতের ভূপালে অবস্থিত National Judicial Academy তে স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। এ প্রশিক্ষণ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের জানার পরিধিকে আরো বিস্তৃত করেছে মর্মে তারা অভিমত ব্যক্ত করেন। একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক মধ্যম মানের National Judicial Academy স্থাপন করার জন্য কমপক্ষে ২৫ একর জমি প্রয়োজন। ২৫ একর জমি পাওয়া গেলে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে এবং দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থার অর্থায়নে একটি National Judicial Academy স্থাপন করার কাজ শুরু করা সম্ভব।

সুপ্রিম কোর্টের অবকাঠামোগত উন্নয়ন

বিচার সংক্রান্ত বসতু ও ঐতিহাসিক স্মারকসমূহ সংগ্রহ করে সুপ্রিম কোর্ট জাদুঘর ও একটি আর্কাইভ থাকা আবশ্যক। কিন্তু দুঃখের বিষয় স্থান সংকুলানের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। ৩০ জুন, ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের পরে পুরাতন হাইকোর্ট ভবন হতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলেও এর কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, জেল হত্যা মামলা, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হত্যার মতো মর্মান্তিক মামলাগুলো যদি জেলা আদালতে হতে পারে তাহলে যুদ্ধাপরাধীর মামলার বিচার সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনের বাইরে হতে কোনো অসুবিধা নেই। সুপ্রিম কোর্টে বিচারকদের বসার accommodation সংকট রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের উদ্যোগে পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন

সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে এই প্রথম সুপ্রিম কোর্ট ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এর যৌথ উদ্যোগে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক দুই দিন ব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ২৫-২৬ নভেম্বর, ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দ হোটেল রেডিসনে অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলন দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য বিচারক, পরিবেশ বিশেষজ্ঞের একটি মিলনমেলায় পরিণত হয়। উক্ত সম্মেলনে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ এবং বিভিন্ন দেশের আদালত, পরিবেশ এবং জলবায়ু সংরক্ষণে গৃহীত ভূমিকা, পদক্ষেপ এবং উহা বাস্তবায়নের উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। এতে বিচারকদের মধ্যে পরিবেশ এবং জলবায়ু সম্পর্কে একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাছাড়া এতে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর হয়েছে।

দুর্নীতি রোধে বিচার বিভাগের ভূমিকা

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্তরায় দুর্নীতি, সন্ত্রাসবাদ ও চোরাচালানি। দুর্নীতি দেশের উন্নয়নের প্রায় ৪০ শতাংশ ধ্বংস করে। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা কেবল বিচার বিভাগই তৈরি করে। দেশের গত ২/৩ বছরে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তার পিছনে বিচার বিভাগের অবদান অনস্বীকার্য। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখিয়েছে বিচার বিভাগ। সুপ্রিম কোর্ট দুর্নীতির মামলা থেকে শুরু করে, স্বর্ণ চোরাচালান সব ধরনের মামলাতে কোনোরকম ছাড় দেয়নি।

আমি রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গ-বিভাগ বা সংস্থার সমালোচনা করছি না। রাষ্ট্রের প্রতিটি সংস্থা অন্য সংস্থার ওপর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। শুধু সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলোই নয় রাষ্ট্রের বিভাগগুলোও এ প্রতিযোগিতার বাইরে নেই। কেবল বিচার বিভাগই এর ব্যতিক্রম। যারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকে, তাঁদের মধ্যে এ আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা বেশি মাত্রায় প্রতীয়মান হয়। কিন্তু বিচার বিভাগ এ প্রতিযোগিতায় কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি এবং করবেও না। বরং আমরা সব সময় চেষ্টা করেছি রাষ্ট্রের বিভাগ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার। শাসনতন্ত্র আমাদের ওপর যতটুকু দায়িত্ব এবং ক্ষমতা অর্পণ করেছে আমরা শুধু ততটুকুই করব। আমি আশা করব রাষ্ট্রের অন্যান্য বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানও বিচার বিভাগকে সেভাবেই সহযোগিতা করবে।

 

(গতকাল ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় ‘জাতীয় বিচার বিভাগীয় সম্মেলন, ২০১৬। এই সম্মেলনে প্রধান বিচারপ্রতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্হার প্রদত্ত ভাষণ সংক্ষেপিতরূপে প্রকাশিত হলো।)

সূত্র: ইত্তেফাক



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon