কোটা সংস্কারের দাবিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ

প্রতিবেদক : ল'ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ
প্রকাশিত: ৯ এপ্রিল, ২০১৮ ৩:৪৩ অপরাহ্ণ

কোটা সংস্কার এবং আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন, ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও মহাসড়ক অবরোধ করেছেন।

কোটা সংস্কারের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আজ সোমবার (৯ এপ্রিল) সকাল থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট), নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও রংপুরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও মহাসড়ক অবরোধ করেন।

এর মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা।

রাজশাহী
কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শাহবাগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রুয়েটের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে আজ সকাল থেকে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সড়ক জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

সকাল আটটার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সমবেত হতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টার দিকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের সড়ক অবরোধ করে রাখেন। এতে সড়কের দুই দিকেই যান জটের সৃষ্টি হয়।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা আন্দোলনের সমন্বয়ক মাসুদ মোন্নাফ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কোটা সংস্কার নিয়ে বিশেষ দল দেখা করতে গেছে। আমাদের পক্ষে রায় না এলে আন্দোলন অনির্দিষ্টকালের জন্য চলবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অধিকাংশ বিভাগেরই ক্লাস হয়নি। এদিকে একই দাবিতে রুয়েটের শিক্ষার্থীরাও ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের সামনে অবরোধ করে রাখেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর লুৎফর রহমান জানান, সারা দেশেই আন্দোলন হচ্ছে। ফলে এখানে এই আন্দোলন ঠেকানোর কোনো উপায় নেই। তাঁরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছেন। তাঁরা প্রশাসনের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তাঁরা কেউ কোনো ধরনের সহিংসতার দিকে যাবেন না। তাঁদের কেউ সহিংসতা ঘটানোর চেষ্টা করলে তাঁরাই তাকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করবেন। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে সব পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রাস্তায় জনদুর্ভোগ হচ্ছে। এখানে করার কিছু নেই। যত তাড়াতাড়ি এর সমাধান হয়, ততই মঙ্গল।

এদিকে দাবি পূরণ না হলে রুয়েটে কাল মঙ্গলবার আবারও ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বেলা একটার দিকে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, এখনো অবরোধে অনড় রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

নোয়াখালী
কোটা সংস্কারের দাবিতে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সকাল ১০টার দিকে ক্লাস বর্জন করে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকে এবং সংলগ্ন সোনাপুর-সুবর্ণচর (চর জব্বর) সড়কে অবস্থান নেন। এতে ওই সড়ক দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

সকাল সাড়ে ১০টা থেকে আনুমানিক বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা সোনাপুর-সুবর্ণচর সড়ক অবরোধ করে রাখেন। পরে তাঁরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে আবারও ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন এবং শহীদ মিনার চত্বরে অবস্থান নেন। এ সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী বক্তব্য দেন। তাঁরা কোটা সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস বর্জন ও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মুহাম্মদ মুশফিকুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, তিনি একটি বৈঠকে আছেন। পরে কথা বলবেন।

একই বিষয়ে জানার জন্য রেজিস্ট্রার মো. মমিনুল হকের মুঠোফোনে ফোন দিয়ে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

সুধারাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন ও পরিদর্শক (অপারেশন) নুরে আলমকে ফোন করলে তাঁরা ফোন ধরেননি।

সাভার
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ডেইরি গেটের সামনের মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাঁদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। পুলিশ সেখানে জলকামান নিয়ে অবস্থান করে এবং শত শত কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে কমপক্ষে ১৫ জন শিক্ষার্থী আহত হন। পুলিশের ধাওয়ায় দৌড়াতে গিয়েও আহত হন কয়েক শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর জুলকার নাইন কাঁদানে গ্যাসের প্রভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

অবরোধের একপর্যায়ে পুলিশের ধাওয়ায় শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ঢুকে যান। ওই সময় মহাসড়ক দিয়ে কিছু যানবাহন চলাচলের সুযোগ পায়। তবে বেলা দেড়টার দিকে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে পুলিশ পিছু হটে। ফলে মহাসড়কে আবারও যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

রংপুর
বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত শহরের মডার্ন মোড়ে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর মডেল কলেজ, রংপুর সরকারি কলেজের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। তাঁরা সড়ক অবরোধ করে স্লোগান দিতে থাকেন। কোটা সংস্কারের দাবি মানা না হলে তাঁরা আরও কঠোর কর্মসূচি নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বেলা একটার দিকে অবরোধ তুলে নেন।

এদিকে শিক্ষার্থীদের অবরোধের সময় মহাসড়কে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী জেলার সঙ্গে ঢাকায় চলাচলকারী যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও আন্তজেলা বাস দুপাশে আটকে থাকে।

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাঁদের ক্লাস বর্জন করে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করছেন।

কুষ্টিয়া
কোটা সংস্কারের দাবিতে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাঁদের ক্লাস বর্জন করে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করছেন। সকাল থেকে শুরু হওয়া ওই বিক্ষোভ মিছিল পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করছে। বিভিন্ন বিভাগ ও হল থেকে ছাত্রছাত্রীরা বের হয়ে মিছিলে যোগ দিচ্ছেন। আজ বেশির ভাগ বিভাগেই ক্লাস-পরীক্ষা হয়নি। তবে প্রক্টর মাহবুবর রহমান দাবি করেন, ক্যাম্পাসে ক্লাস পরীক্ষা স্বাভাবিক রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক ছাত্রী গণমাধ্যমকে বলেন, সকাল নয়টা থেকে ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা সবাই এই যৌক্তিক আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। এ জন্য কোনো ক্লাস হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ‘ফেসবুকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ছবি দেখে খুবই খারাপ লাগছে। মেধার মূল্য বোঝা উচিত সবার। তা না হলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না। তাই আমিও আন্দোলনে যুক্ত হয়েছি।’

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রক্টর মাহবুবর রহমান বলেন, ‘ক্যাম্পাসে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। আমি প্রধান ফটকের সামনে আছি। আশা করছি, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এই ক্যাম্পাসে ঘটবে না।’ প্রথম আলো