বিচারাঙ্গনের বঙ্কিমচন্দ্র

প্রতিবেদক : ল'ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ
প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২১ ১:০১ অপরাহ্ণ
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বাংলার সাহিত্যকাশে সবচেয়ে উজ্জল নক্ষত্রদের অন্যতম বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সাহিত্যকর্মের জগৎে তিনি যেমন আলো ছড়িয়েছেন তেমনি তার পেশাগত জীবন ও ছিল আলোকময়। অথচ সাহিত্যিক পরিচয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছে তার বিচারক পরিচয়,পেয়েছেন সাহিত্য সম্রাট, বাংলা উপন্যাসের জনক প্রভৃতি খেতাব।

আমরা তার জীবনের খন্ডিতাংশ পাঠ করি। আমি বিশ্বাস করি নক্ষত্রদের আংশিক পাঠ হতে নেই। আমার ব্যক্তিজীবনে একদিকে সাহিত্যের প্রতি রয়েছে প্রবল আকর্ষণ, অন্যদিকে আইনের শিক্ষার্থী হওয়ায় বঙ্কিমচন্দ্রের বিচারিক জীবন সম্পর্কে জানা এবং তা তুলে ধরার তাগিদ ছিল অনেক দিনের। তার বিচারিক জীবন জানা ব্যতিত বঙ্কিমচন্দ্র পাঠ অসম্পূর্ণ। কেননা, বিচারিক জীবন তার জীবনের দীর্ঘএকটা অংশ জুড়ে রয়েছে। ৩৩ বছর ১ মাস তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিচারক জীবনের অভিজ্ঞতা তার সাহিত্য কর্মকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে। কেননা বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবনধারা সম্পর্কে একটা সম্যক ধারনা লাভ করেছিলেন। যার পরিচয় তার বিভিন্ন সৃষ্টিকর্ম এবং চরিত্রায়নেই দেখা যায়।

কমলাকান্তের দপ্তর, কৃষ্ণকান্তের উইল বা মুচি রামগুড়ের জীবন চরিত বা দেবী চৌধুরানি তার সেরা সৃষ্টিকর্মগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর প্রত্যেকটিতেই তার বিচারিক জীবনের চিন্তাধারা ও দর্শন ফুটে উঠেছে। তার প্রায় প্রতিটি রচনায় চরিত্রায়নের ক্ষেত্রে বিচারাঙ্গনে তার সামনে আসা বিভিন্ন মামলার চরিত্রগুলোর ছায়া ছিল। তিনি যখন চাকুরিতে প্রবেশ করেন তখন তার বয়স ছিল ২০ বছর। তার পিতা যাদব চন্দ্র ও ছিলেন ডেপুটি কালেক্টর। তাদের পরিবারকে বিচারক পরিবার ও বলা যেতে পারে। কেননা তার চার ভাই এবং তার জ্যাঠাতো(চাচাতো) ভাই মিলিয়ে ৫ জন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তবে কেবল তিনিই ভাইদের সধ্যে সাহিত্যিক পরিচয়ে সমাদৃত নন। তার মেজদা সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় বিশেষভাবে পরিচিত। তার পালামউ বাংলা সাহিত্যের প্রথম ভ্রমনকাহিনী।

বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যকর্মের বিভিন্ন দিক এখনো আবিষ্কৃত হচ্ছে কিন্তু তার দীর্ঘ বিচারক জীবন প্রায় অনাবিষ্কৃতই রয়ে গিয়েছে। অথচ তার বিচারিক জীবন তার সৃষ্টিকর্মের অন্যতম উৎস। তার বিচারিক জীবনের ওপর সর্বপ্রথম আলো ফেলেন শ্রী গোপালচন্দ্র রায়। শ্রী গোপালচন্দ্রকে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয় এজন্য। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম কর্মস্থল ছিল যশোর। এরপর খুলনা, বহররমপুর, হুগলি,বারাসাত, হাওড়া প্রভৃতি জায়গায় বিচারিক কাজ করেন। শ্রী গোপালচন্দ্র তার গবেষনাগ্রন্থের জন্য তার এ সকল কর্মস্থল, আদালতে কাজ করা বিভিন্ন উকিল-মোক্তার, অধস্তন আদালতের নথিপত্র এবং তার বিচারাধীন এলাকার বিভিন্ন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি এবং তার পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকারের ওপর গবেষণা করে এই গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।

বিচারিক জীবনে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। যার স্বীকৃতি স্বরুপ ব্রিটিশ সরকার তাকে ১৮৯১ সালে রায় বাহাদুর এবং ১৮৯৪ সালে কম্পানিয়ন অফ দ্যা মোষ্ট এমিনেন্ট অর্ডার অফ দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ার উপাধিতে ভূষিত করেন। তারপরও তার বিচারিক জীবনে অতৃপ্তি ছিল। সে সময়ে ভারতীয়দের জন্য আইসিএস এর পর সর্বোচ্চ চাকুরি ছিল ডেপুটি মেজিস্ট্রেট। যদিও পরবর্তীতে ভারতীয়দের জন্য বিচারক হবার পথ স্বল্প পরিসরে উন্মুক্ত হয় এবং তিনি জজ হবার জন্য আবেদন করেন কিন্তু তার লেখায় ব্রিটিশবিরোধী উপাদান থাকায় তার আবেদন গৃহীত হয়নি। কলকাতা হাইকোর্টের ভারতীয় প্রথম প্রধান বিচারপতি রমেশ চন্দ্র মিত্রের আবেদন গ্রহন করা হয়। এ আক্ষেপ বঙ্কিমচন্দ্রের সারাজীবন ছিল এবং বলতেন রমেশ মিত্র হাইকোর্টের জজ আর আমি সরকারের ক্ষুদ্র চাকুরিজীবী। কেননা, রমেশ মিত্র এবং বঙ্কিমচন্দ্র সমসাময়িক ছিলেন।

তার সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করতে গিয়ে অনেকে তাকে সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এগুলো তার চিন্তার নয় বরং চরিত্রায়নের সীমাবদ্ধতা। লেখকের লেখায় তো তৎকালীন সমাজব্যবস্থার চিত্রই ফুটে ওঠে বিশেষত। সমাজের প্রচলিত শব্দের ব্যবহারে তাকে সাম্প্রদায়িক তকমা সেটে দিয়ে তাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা যায়না। সাহিত্যাঙ্গনে ধর্মভিক্তিক সমালোচনা কিছুটা থাকলেও বিচারিক জীবনে তিনি ছিলেন সকল ধর্ম, বর্ণের মানুষের কাছে সমভাবে পূজ্য।

একটা ঘটনা বলে শেষ করতে চাই- ১৮৯১ সালে জুলাইয়ে গার্ডেন রিচ অঞ্চলে মুসলমানদের দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্ম নিয়ে বিরোধ বাধে এবং এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। আদালতের গোচরে আসলে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তদন্তকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষের ৩০ জন মুসলমানকে আদালতে এসে শান্তি রক্ষার মুচলেকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে নথিপত্র এলে তিনি নেড়েচেড়ে দেখেন এটা মুসলিমদের ধর্ম নিয়ে বিরোধ তাই তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠিয়ে দেন যেনো তদন্তের ভার অন্য কোন মুসলিম ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসক সাহেব আলিপুরের অন্য এক মুসলিম ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর তদন্তভার অর্পন করেন। এই সংবাদ দুইপক্ষের মৌলভীর কানে আসলে তারা আইনজীবি মারফত এই আদেশের বিরুদ্ধে আবেদন জানিয়ে বলেন অন্য বিচারকদের ওপর তাদের আস্থা নেই এবং তদন্তের ভার যেনো বঙ্কিমচন্দ্রের ওপর দেওয়া হয়। ধর্মীয় বিষয়ে সংঘাত সৃষ্টি হবার পরও নিজ ধর্মাবলম্বীর লোক রেখে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বঙ্কিমচন্দ্রের জন্য মৌলভীদের আবেদনই বলে তার নিষ্ঠা এবং সততা সকলের কাছে কতোটা গ্রহনযোগ্য ছিল।।

২৬ জুন ছিল এই নক্ষত্রের আবির্ভাব বা জন্ম দিবস। তাকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধায়, নক্ষত্রদের শারিরিক মৃত্যু হতে পারে কিন্তু আত্মিক মৃত্যু হয়না। যতোদিন বাঙালি এবং বাংলা ভাষা থাকবে ততোদিন আপনি থাকবেন আমাদের হৃদয় আকাশে…

উৎস:১/বঙ্কিমচন্দ্রের বিচারিক জীবন- গোপালচন্দ্র রায়
২/প্রবন্ধ :বিচারক বঙ্কিমচন্দ্র-স্বপন বসু
৩/জুডিশিয়াল প্রসিডিংস ১৮৬১-৯১
৪/উইকিপিডিয়া।

লেখক: অঁজিষ্ণু অভি, শিক্ষানবীশ আইনজীবী, ঢাকা জজকোর্ট