প্রশমন ও প্রকোপনমূলক পরিস্থিতির ব্যবহার : ছিনতাইয়ের জন্য হত্যা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১২ জুলাই, ২০২১ ৫:৪৬ অপরাহ্ণ
আবদুল্লাহ আল মামুন, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ

আবদুল্লাহ আল মামুন:

আজ প্রথম আলোতে একটা খবর পড়ছিলাম। চট্টগ্রামের পটিয়ায় একজন রিক্সাচালককে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে লাশ রাস্তার পাশের খাদে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কিশোরটির রিক্সাটি এখনো উদ্ধার করা যায়নি। কিশোরটি প্রতিদিন সকাল ৬টায় বের হতো। রাত ৯টায় ঘরে ফিরতো। রাতে বাসায় না ফেরায় খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। পরে, কিশোরটির লাশ পাওয়া যায়। আপাততঃ পুলিশ ধারণা করছে রিক্সাটি ছিনতাইয়ের জন্য কিশোরটিকে হত্যা করা হয়েছে। রিক্সাটি উদ্ধার করতে পারলে হত্যার রহস্য উদঘাটিত হবে। আমরা হয়তো দুয়েকদিন বা কিছুদিনের মধ্যেই সেটা দেখতে পাবো। আমরা ছিনতাইয়ের জন্য হত্যা করা বা গামছা পার্টি, অজ্ঞান পার্টি এদের কথা জানি, যারা তাদের সামান্য প্রয়োজনের জন্য একজন ব্যক্তির জীবন কেড়ে নেয়। এই ধরণের অপরাধীদের শাস্তি কি? অপরাধ প্রমাণিত হলে আপনি কি শাস্তি দেবেন? মৃত্যুদণ্ড নাকি যাবজ্জীবন?

নীচের মামলাটি পড়তে পারেন। এটা চট্টগ্রামের মিরসরাই থানার ঘটনা।একই ধরণের ঘটনায় অপরাধ প্রমাণীত হওয়ার পরে আদালত কি শাস্তি দিয়েছেন জেনে নিতে পারেন।নির্দ্বিধায় পোষ্ট শেয়ার করতে পারেন। এই পোষ্টগুলোর উদ্দেশ্য আইনের জগতের বা এর বাইরের মানুষকে আদালতের কাজ সম্পর্কে জানানো এবং আদালতের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস আরো বৃদ্ধি করা। একই সাথে ভিকটিম বা তাদের পরিবারকে আশ্বস্ত করা যে, ন্যায় বিচার অবশ্যই আদালত করবেন। ধৈর্য্য ধরুন। হত্যার মতো ঘৃণ্য অপরাধ আদালতের বাইরে আপোষ করবেন না।

Shahid Ullah @Shahid & ors Vs. The State,4 SCOB [2015]AD11-( রায় দিয়েছেন Nazmun Ara Sultana,J-বর্তমান মাননীয় মহাপরিচালক,বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট, ঢাকা)- এই মামলার ঘটনা অনুযায়ী ভিকটিম রেজাউল করিম@ আজিম একজন বেবি ট্যাক্সির চালক ছিলেন। তার বাড়ি ছিলো চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানায়। তিনি ১৯-০৫-২০০৪ খ্রিঃ তারিখ চট্টমেট্রো-থ- ১১- ৪৫ ৭১ সিএনজি ট্যাক্সিটি নিয়ে বের হন। কিন্তু,বাড়িতে ফিরে আসেননি। এজাহারকারী (ভিকটিমের ভাই)২০-০৫-২০০৪ খ্রিঃ তারিখ মিরসরাই থানা থেকে খবর পান যে, তার ভাইয়ের মৃতদেহ মিরসরাই থানার দাঁতমারা তাকিয়া ঝলন্তী রাবার বাগান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।এজাহারকারী আরো অন্যান্য কয়েকজনসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে তার ভাইয়ের লাশ সনাক্ত করেন। তিনি দুইজন অভিযুক্তকে(সাইফুল ইসলাম @ শহীদ ও শহীদুল্লাহ@ শহীদ) ঘটনাস্থলে ধৃত অবস্থায় দেখেন। উপস্থিত লোকজনের সামনে উভয় অভিযুক্ত স্বীকার করে যে, পালিয়ে যাওয়া অপর অভিযুক্ত মীর হোসাইনসহ সিএনজি ট্যাক্সি ছিনতাই এর জন্য তারা ফটিকছড়ি হতে ভিকটিমের ট্যাক্সি ভাড়া করেন এবং নির্জন ঘটনাস্থলে এসে সিএনজি থামিয়ে ভিকটিমকে ধরে রাবার বাগানে ডুকিয়ে উপুর্যুপুরি ছুরিকাঘাতে ভিকটিমকে হত্যা করেন। ভিকটিমকে হত্যা করার পরে তাদের রক্ত মাখা কাপড় চোপড় পরিবর্তনের সময় নিকটস্থ মার্কেটের লোকজন অভিযুক্তকে দেখে আটক করে ফেলে।এ সময় তাদের অপর সহযোগী মীর হোসাইন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

স্থানীয় লোকজনের জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করে তারা সিএনজি হাইজ্যাক করে ভিকটিমকে হত্যা করেছে।স্থানীয় লোকজন মিরসরাই থানায় খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে এবং অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম @ শহীদ ও শহীদুল্লাহ@ শহীদের দেখানো মতে পুলিশ ভিকটিমের লাশ উদ্ধার করে। অতঃপর এজাহারকারী ফটিকছড়ি থানায় ৩০২,৩৯২,৩৪ ধারায় মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তকালে ৩ জন অভিযুক্তই ১৬৪ ধারায় বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট অপরাধ স্বীকার করে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য প্রদান করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা সত্যতা পেয়ে উপরোক্ত ধারায় চার্জশীট প্রদান করলে আদালত ৩০২,৩৪ ধারায় অভিযোগ গঠন করেন। রাষ্ট্র পক্ষ থেকে ১১ জন সাক্ষী উপস্থাপন এবং ২ জন সাক্ষীকে Tender করা হয়। দায়রা জজ,চট্টগ্রাম মামলার সাক্ষ্য প্রমাণ অনুযায়ী ৩জন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করেন। অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম@ শহীদ ও শহীদুল্লাহ@শহীদকে জরিমানাসহ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। অপর অভিযুক্ত মীর হোসাইনকে জরিমানাসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

৩জন অভিযুক্ত হাইকোর্টে জেল আপীল দায়ের করেন।হাইকোর্ট সকল আপীল একসাথে শ্রবণ করেন এবং অভিযুক্তদের সাজা অপরিবর্তিত রেখে আপীল নামঞ্জুর করেন।

অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম@শহীদ এবং শহীদুল্লাহ @ শহীদ তাদের জেল পিটিশনে উল্লেখ করেছিলেন যে, তাদেরকে ঐ এলাকার কিছু সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোক সন্দেহের বশে সম্পূর্ণ অন্যায়, মিথ্যাভাবে এই মামলায় জড়িত করেছেন। ঐ লোকজন তাদেরকে নির্মমভাবে মারধোর করে পুলিশের নিকট হস্তান্তর করেছিলেন।পুলিশও তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছিলো এবং এই নির্যাতনের কারণে তারা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ১৬৪ ধারায় অপরাধ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।তাই,তাদের ১৬৪ ধারার বক্তব্য সত্য এবং স্বেচ্ছায় প্রদত্ত নয়। অভিযুক্ত শহীদুল্লাহ@ শহীদ উপরোক্ত বক্তব্যের সাথে সাথে আরো দাবী করেছিলেন, তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম তথা পঙ্গু এবং তার ডান পা তিনি স্বাভাবিকভাবে নাড়াতেও পারেন না। তার চলাফেরা করতেও কষ্ট হয়।তাই, মামলায় বর্ণিত অপরাধ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

অভিযুক্ত পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবী তার বক্তব্যে উপরোক্ত বক্তব্য হুবহু দাবী করেন। একই সাথে আরো বলেন যে, অভিযুক্ত শহীদ শারীরিকভাবে পঙ্গু হওয়ায় শারীরিক কারণে রাষ্ট্রপক্ষের বর্ননামতো কথিত অপরাধ তার পক্ষে সংঘটন করা সম্ভব নয়। উভয় অভিযুক্তের আরোপকৃত শাস্তিকে অনেক বেশী কঠোর দাবী করে শাস্তি কমানোর তথা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করার বিষয়ে তিনি আদালতের সুবিবেচনা প্রসূত সিদ্ধান্ত কামনা করেন।

অন্যদিকে, রাষ্ট্র পক্ষে বিজ্ঞ ডেপুটি এটর্ণি জেনারেল বলেন,অভিযুক্তদ্বয় কর্তৃক কৃত অপরাধ অত্যন্ত ঘৃণ্য, জঘন্য এবং হিংস্র প্রকৃতির।অভিযুক্তদ্বয় কর্তৃক কৃত অপরাধ বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য, প্রমাণ দ্বারা রাষ্ট্র পক্ষ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। অপরাধের হিংস্রতা,নৃশংতা, প্রকৃতি এবং ধরন বিবেচনা করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে অভিযুক্তদ্বয়ের প্রতি কোন ধরণের অনুকম্পা প্রদর্শন সমীচীন হবে না। অভিযুক্তদ্বয় আদালতের নিকট হতে কোন ধরণের সহানুভূতি বা কম শাস্তি পেতে পারে না। তিনি উভয় অভিযুক্তের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি বহাল রাখার প্রার্থনা জানান।

আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য,অধঃস্তন উভয় আদালতের রায়,পর্যালোচনা এবং মামলার সাক্ষ্য,প্রমাণ বিশ্লেষণ করেন। ০৩ জন অভিযুক্তই ড্রাইভারকে হত্যা করে সিএনজি ট্যাক্সি ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে ভিকটিমকে ভাড়া করেছিলেন এবং কিছু দূর যাওয়ার পরে ঘটনাস্থলে ট্যাক্সিটি দাঁড় করান।ভিকটিমকে ধরে রাবার বাগানের ভেতরে নিয়ে যান এবং ছুরিকাঘাতে ভিকটিমকে হত্যা করে ট্যাক্সি নিয়ে পালানোর চেষ্টাকালে তাদের রক্তস্নাত কাপড় চোপড় দেখে ধৃত করেন। একজন অভিযুক্ত মীর হোসাইন পালাতে সক্ষম হলেও অভিযুক্ত সাইফুল এবং শহীদ ধৃত হন। লোকজনের জিজ্ঞাসাবাদে তারা ড্রাইভারকে হত্যা এবং সিএনজি ছিনতাই করেছেন স্বীকার করায় সাক্ষীগণ মিরসরাই থানার পুলিশকে খবর দেন। পুলিশের সামনেও তারা হত্যা এবং ছিনতাই এর বিষয় স্বীকার করেন। সাক্ষীদের সামনে পুলিশের নিকট অভিযুক্তদ্বয় রাবার বাগানের ভেতরে ভিকটিমের লাশ দেখিয়ে দিলে পুলিশ হতভাগ্য চালকের মৃতদেহ উদ্ধার করেন। সাক্ষীদের মধ্যে পি.ডব্লিউ-১,২,৩,৪,৫,৭ এবং পি.ডব্লিউ-৮ আদালতে তাদের সামনে উভয় অভিযুক্তের ছুরিকাঘাতে ভিকটিমকে হত্যা, ট্যাক্সি ছিনতাই, তাদের দেখানোমতে ভিকটিমের লাশ উদ্ধার সম্পর্কে বিস্তারিত সাক্ষ্য প্রদান করেন।

আদালত লক্ষ্য করেন, এই বিষয়ে উভয় অধঃস্তন আদালত বিস্তারিত ভাবে সাক্ষ্য পর্যালোচনা করেছেন। একই ভাবে অভিযুক্তদের ১৬৪ ধারার বক্তব্য সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ৩ জন অভিযুক্তই ১৬৪ ধারায় বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। তাদের বক্তব্য পরস্পরকে সমর্থন করেছিলো। উক্ত বক্তব্য সমূহে তারা যেমন নিজেদের ভূমিকা বর্ণনা করেছেন, তেমনি অপর অভিযুক্তের ভূমিকাও বর্ণনা করেছিলেন।উভয় অধঃস্তন আদালতের নিকট উক্ত বক্তব্য স্বেচ্ছায় প্রদত্ত এবং সত্য মর্মে প্রতীয়মান হয়েছিলো।সাক্ষীদের বক্তব্য,১৬৪ ধারার বক্তব্য এবং উপস্থাপিত সাক্ষ্য প্রমাণ পরস্পরকে সমর্থন করেছে।তাই,আদালত উক্ত ১৬৪ ধারার বক্তব্য সমূহকে অবিশ্বাস করার কোন নেই মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ফলে,আদালতের নিকট প্রতীয়মান হয়েছিলো যে, উভয় অধঃস্তন আদালত যথাযথভাবেই সাক্ষ্য, প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এবং অভিযুক্তদেরকে দোষী সাব্যস্ত করা সম্পর্কে উক্ত সিদ্ধান্ত যথার্থ।

অভিযুক্ত পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবী ১৬৪ ধারার বক্তব্য অভিযুক্তদেরকে অমানুষিক নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা হয়েছে মর্মে দাবী করলেও আদালত লক্ষ্য করেন যে, সম্পূর্ণ বিচারকালে অভিযুক্তরা কখনোই তাদের ১৬৪ ধারার বক্তব্যকে অস্বীকার করেননি। তারা কখনোই বলেননি যে, তাদের দোষ স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছায় প্রদত্ত নয়। সত্য নয়। বরং, তা নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা হয়েছে। বিজ্ঞ আইনজীবী মৌখিক ভাবে দাবী করলেও এর স্বপক্ষে কোন ধরণের প্রমাণ বা বিচ্যুতি আদালতে উপস্থাপন করতে পারেননি। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে অভিযুক্তদেরকে ৩৪২ ধারায় পরীক্ষা করা হয়েছিলো। উক্ত পরীক্ষার সময়েও বিচারকারী বিজ্ঞ দায়রা জজ তাদেরকে সামগ্রিক সাক্ষ্য, প্রমাণ এবং তাদের প্রদান করা ১৬৪ ধারার বিষয় উল্লেখ করে পরীক্ষা করেছিলেন। প্রশ্ন করেছিলেন। উক্ত পরীক্ষার সময়েও তারা বক্তব্য অস্বীকার করেননি। তাদের বক্তব্য লিপিবদ্ধকারী বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পি.ডব্লিউ- ১২ হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান করলেও অভিযুক্ত পক্ষ হতে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটকে লিপিবদ্ধকৃত ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছায় প্রদত্ত বা সত্য নয় মর্মে কোন ধরনের সাজেশন পর্যন্ত প্রদান করা হয়নি। এই বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের বিজ্ঞ কৌঁসুলি অভিযুক্তদ্বয়ের জেল আপীলে প্রদানকৃত বক্তব্যের প্রতি আদালতের দৃষ্টি আকর্ষন করেন। উক্ত বক্তব্যে অভিযুক্তদ্বয় দাবী করেছিলেন, এলাকার সন্ত্রাসীরা তাদেরকে আটক করে নির্মমভাবে প্রহার করে পুলিশের হাতে তুলে দিলে পুলিশও তাদেরকে নির্মম নির্যাতন করে ১৬৪ ধারার বক্তব্য আদায় করে। এই বিষয়ে আদালত বলেন, জেল পিটিশনে উল্লিখিত বিষয় সমূহ অভিযুক্তরা কখনোই বিচার আদালতে দাবী করেননি। উক্ত ব্যক্তিগণ বিচারিক আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। অভিযুক্তদের দাবীকৃত বিষয় সমূহ উক্ত সময়ে উপস্থাপন করার সুযোগ ছিলো। কিন্তু,সম্পূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযুক্তগণ নিজেদেরকে নির্দোষ দাবী করা ব্যতীত আর কোন দাবী করেননি। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ৩৪২ ধারার পরীক্ষার সময়ও কিছু বলেননি। এমনকি, হাইকোর্টের নিকট পর্যন্ত এই দাবী করা হয়নি। শুধুমাত্র আপীলেট ডিভিশনে এই দাবী করায় স্পষ্ট যে, এই দাবী অবান্তর। সুতরাং, মামলার পরিস্থিতি অনুযায়ী অভিযুক্তদের জেল আপীলে উল্লিখিত বক্তব্য বা দাবীর উপর নির্ভর করা যুক্তিযুক্ত নয় মর্মে আদালত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

উপরোক্ত পর্যবেক্ষনের প্রেক্ষিতে আদালত রাষ্ট্র পক্ষ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গঠিত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে মর্মে সিদ্ধান্তে উপনীত হন। আদালত বলেন-

  1. However, we find that in this case there are overwhelming evidence from the side of the prosecution to prove its case. The evidence of the prosecution witnesses have proved sufficiently that immediately after the murder of the deceased both these condemned prisoners were caught by the local people with their blood stained wearing clothes and at that time, on their asking, both these condemned prisoners confessed that they with an intention to hijack a C.N.G. baby taxi murdered the driver of that baby taxi and thereafter as per showing of these condemned prisoners the dead body of the deceased driver was recovered. The evidence of the prosecution witnesses have been corroborated fully by the own confessional statements of these condemned prisoners which have been found voluntary and true by both the trial court and the appellate court.
  2. We also do not see anything to find the confessional statements of these two accused condemned prisoners not voluntary and true. We do not find anything else also to differ with the findings of the trial court and the appellate court as to guilt of these two condemned prisoners. In our opinion also the charges against these two condemned prisoners have been proved beyond all reasonable doubt.

অতঃপর আদালত অভিযুক্তদের শাস্তি সম্পর্কে আলোচনা করেন। আদালত লক্ষ্য করেন, উভয় অভিযুক্ত বর্বর এবং ঘৃণ্য প্রকৃতির অপরাধ করেছে। উভয় অভিযুক্ত অপর অভিযুক্ত মীর হোসাইন এর সাথে ঠাণ্ডা মাথায় ড্রাইভারকে হত্যা করে সিএনজি ট্যাক্সি ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেছে।পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা ভিকটিমকে ভাড়া করেছে এবং নির্জন স্থানে থামিয়ে ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আদালত বলেন, আমাদের সমাজে এই ধরণের অপরাধ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ড্রাইভারকে হত্যা করে ট্যাক্সি বা অন্য গাড়ি ছিনতাইয়ের সময় অপরাধীগণ একটি মুহুর্তের জন্য ড্রাইভারকে হত্যা করতে কুণ্ঠিত বা চিন্তা করে না।অথচ, ঐ হতভাগ্য চালকের জীবন তার নিজের এবং তার আপনজনের নিকট অমূল্য। এই ধরণের হত্যাকারী বা খুনী অবশ্যই আদালতের নিকট থেকে কোন ধরণের অনুকম্পা পেতে পারে না। এই ধরনের অপরাধী পুরো সমাজের শত্রু এবং তাদের- কে কম শাস্তি প্রদানের বা শাস্তির ক্ষেত্রে নমনীয়তা প্রদর্শনের কোন কারণ নেই। তাই,আদালত অভিযুক্ত পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীর কম শাস্তি তথা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের বা শাস্তির বিষয়ে নমনীয়তা প্রদর্শন সংক্রান্ত বক্তব্য গ্রহণ করেননি।বরং,আদালতের মতে,এই মামলাটি অপরাধীদের উপর মৃত্যুদণ্ড আরোপের জন্য উপযুক্ত মামলা।আদালতের মতে,অধঃস্তন উভয় আদালত যুক্তিযুক্ত ভাবেই অভিযুক্তদ্বয়ের উপর মৃত্যুদণ্ড আরোপ করেছেন।তাই,আদালত দণ্ডিত অভিযুক্তদ্বয়ের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি বহাল রাখেন এবং জেল আপীল নামঞ্জুর করেন। আদালত বলেন-

  1. The offence which these two condemned prisoners committed is most heinous and brutal. These two condemned prisoners along with other accused Mir Hossain, with cool brain, made a plan to hijack a baby taxi by killing the driver and according to that pre- plan they hired the C.N.G. baby taxi of the deceased as passengers and took the baby taxi to a lonely place and thereafter they murdered the baby taxi driver brutally. This type of crime is on the increase in our society. For hijacking a baby taxi or any other vehicle the hijackers do not hesitate for a moment to take the life of the innocent driver of the vehicle which is very much precious for the near and dear ones of that poor driver. This type of killers/murderers cannot and should not get any mercy from the court of law. There is no reason for showing any leniency or mercy to this type of offenders who are enemy for the whole society. So we are unable to accept the submission of the learned advocate for the condemned prisoners to reduce the sentence of death to life imprisonment. In our opinion this is a fit case for imposing death sentence on killers. The trial court rightly imposed the death penalty on these two condemned prisoners and the High Court Division also rightly affirmed the sentences of death of these two condemned prisoners.
  2. In the circumstances this jail petition is dismissed.

আপীল বিভাগ এই মামলায় মৃত্যুদন্ডের শাস্তি বহাল রেখেছেন। আপীল বিভাগ মৃত্যুদন্ডের শাস্তি বহাল রাখার কারণ উল্লেখ করেছেন।

আমরা এই মামলার Crime Test (Aggravating Circumstance) অনুযায়ী দেখতে পাচ্ছি- ঘটনাটি পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩ জন অভিযুক্ত সংঘটন করেছেন।৩ জন অভিযুক্ত পরিকল্পনা করেছেন সিএনজি ভাড়া করে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে ড্রাইভারকে হত্যা করে সিএনজি নিয়ে পালাবেন এবং তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী অপরাধ সংঘটন করেছেন। এই ঘটনায় ঐ এলাকায় ট্যাক্সি চালনা করেন এমন যে কোন সিএনজি ড্রাইভার ঐ সময় হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারতেন। অর্থাৎ, ভিকটিম ছিলেন অনির্দিষ্ট। ভিকটিমের দূর্ভাগ্য হলো-ঘটনার সময়ে তিনি এই ৩জন অপরাধীর সামনে পড়ে গিয়েছিলেন এবং প্রাণ হারিয়েছিলেন। সুতরাং, অভিযুক্তরা এমন একটি অপরাধ সংঘটন করার পরিকল্পনা করেছিলেন যার শিকার যে কোন সিএনজি ড্রাইভার হতে পারতো এবং দূর্ভাগ্যজনকভাবে সেই হতভাগ্য শিকার ছিলেন ভিকটিম। অভিযুক্তরা ভিকটিমকে নির্জন রাবার বাগানে নিয়ে গিয়ে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছিলেন এবং ট্যাক্সি নিয়ে পালানোর সময় স্থানীয়দের হাতে ধৃত হয়েছিলেন। আদালত লক্ষ্য করেন, সমাজে অব্যাহত ভাবে গাড়ি ছিনতাইয়ের জন্য ড্রাইভারকে হত্যা করার মতো অপরাধ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।এই ধরনের অপরাধীরা অপরাধ সংঘটনের সময় হতভাগ্য ড্রাইভারকে নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তাও করে না। অর্থাৎ, ঠান্ডা মাথায় ভিকটিমকে হত্যা করা হয়। আদালতের মতে, অপরাধীরা পরিকল্পিত এবং ঠান্ডা মাথায় এই অপরাধ সংঘটন করেন। আমরা আমাদের সমাজে তাকালে দেখতে পাবো,এই মামলার ঘটনার মতো আরো অসংখ্য ঘটনায় ড্রাইভারকে হত্যা করে মোটর সাইকেল বা কার বা অটোরিক্সা বা মালামালসহ ট্রাক ছিনতাই করা হয়। একই ভাবে, সমাজে গামছা পার্টি বা অজ্ঞান পার্টি নামক কিছু অপরাধী সংঘটন রয়েছে যারা যাত্রীবেশে মাইক্রোবাস বা সিএনজি বা বাসে উঠে এবং একজন যাত্রীর সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার জন্য গলায় গামছা টেনে শ্বাসরোধে ভিকটিমকে হত্যা করে বা চেতনা নাশক বস্তু প্রয়োগের মাধ্যমে ভিকটিমকে অচেতন করে অপরাধ সংঘটন করে। অনেক সময়, গাড়ী থেকে ভিকটিমকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়। অপরাধের শিকার হওয়া ব্যক্তির পরিবার জানতেও পারেনা তাদের স্বজন কোথায়, কেমন আছে? শুধুমাত্র লাশ উদ্ধার হলে বা হাসপাতাল থেকে সংবাদ দিলে স্বজনরা ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারেন। এই ধরনের ভিকটিমদের লাশ ফ্লাইওভারের উপরে বা রাজধানী বা শহরগুলোর নির্জন স্থানে পাওয়া যায়।অনেক সময় মাসের পর মাস ভিকটিমকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। আবার, ভিকটিমের মৃত্যু হলে অজ্ঞাতনামা হিসেবে হারিয়ে যাওয়ার উদাহরণ কম নয়। অর্থাৎ, এই ধরনের অপরাধীরা বেপরোয়া এবং তারা তাদের কার্যসিদ্ধির জন্য ভিকটিমের প্রাণ কেড়ে নিতে বিন্দুমাত্র চিন্তাও করেনা।সুতরাং, এই মামলায় সংঘটিত অপরাধটি পূর্বপরিকল্পিত, নৃশংস, মর্মান্তিক, বিভৎস, নারকীয় এবং ঠাণ্ডা মাথায় করা হয়েছিলো। ভিকটিমের সাথে অভিযুক্তদের দূরতম কোন সম্পর্ক বা পরিচিতি বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা বিরোধ ছিলো না। অভিযুক্ত বা ভিকটিম ছিলেন সম্পূর্ণ অপরিচিত। অর্থাৎ,ভিকটিম অভিযুক্তদের প্ররোচিত করার মতো অবস্থায় ছিলেন না।

একটি সংঘটিত অপরাধে সমাজের যে কোন ব্যক্তি ভিকটিম হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে, সেটি অবশ্যই Aggravating Circumstance হিসেবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিবেচ্য হতে পারে। এই ধরনের ঘটনার উদাহরণ হলো-রমনার বটমূলে বোমা হামলা,চটগ্রামের লালদিঘীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে নির্বিচারে গুলি,সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের উপরে বোমা হামলা, বোমা হামলা করে দুই বিচারককে হত্যা, ২১ আগষ্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপরে গ্রেনেড হামলা, হোলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলা প্রভৃতি।এই ঘটনাগুলোর প্রতিটি নৃশংস, নারকীয় এবং পূর্বপরিকল্পিত। এই মামলাগুলোর প্রত্যেকটিতে ভিকটিম ছিলেন অনির্দিষ্ট। প্রতিটি মামলায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত যে কোন ব্যক্তি আক্রান্ত এবং নিহত হতে পারতেন। একইভাবে হামলাকারী বা হত্যাকারীও জানেন যে, তার হামলার কারণে যে কেউ মৃত্যুবরণ করতে পারতেন।বর্তমান মামলায় ভিকটিম ছিলেন এই ঘটনার নিরীহ একজন শিকার মাত্র যিনি না জেনে তার হত্যাকারীদের গাড়িতে তুলেছিলেন। অপরাধীরা নৃশংস পন্থায় অপরাধ সংঘটন করেছেন। তারা তাদের অপরাধকে গোপন করার জন্য ঘটনার সাথে সাথে ভিকটিমকে হত্যা করে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছেন। তাদের দেখানো মতেই ভিকটিমের লাশ উদ্ধার হয়েছিলো। ভিকটিমের সিএনজিসহ অন্যান্য আলামত জব্দ করা হয়েছিলো। এই মামলার ভিকটিম ছিলেন সম্পূর্ণ একা এবং অসহায়।অন্যদিকে,অপরাধীরা ছিলেন ৩জন। ফলে,ভিকটিম অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নূন্যতম প্রতিরোধও করতে পারেননি। সুতরাং,এই মামলায় সংঘটিত অপরাধের নৃশংসতা,পারিপার্শ্বিকতা, পূর্বপরিকল্পনা, উন্মত্ততা এবং অপরাধের ধরন অনুযায়ী Crime Test ১০০%।

আমরা এই মামলার Criminal Test (Mitigating Circumstance) দেখতে পারি। এই মামলায় বিজ্ঞ আইনজীবী অভিযুক্তদের বয়স বা তাদের পারিবারিক অবস্থা আদালতে উপস্থাপন করেননি। শুধুমাত্র জেল আপীলে উল্লেখিত বিষয় আদালত কর্তৃক বিবেচনার জন্য যথেষ্ট ছিলো না।অভিযুক্ত শহীদুল্লাহ@ শহীদ নিজেকে পঙ্গু এবং তার শারীরিক অবস্থার কারনে তিনি অপরাধটি করতে অক্ষম ছিলেন মর্মে দাবী করেছিলেন।অভিযুক্তের এই ডিফেন্স সম্পূর্ণ বিচারিক আদালত বা হাইকোর্টেও দাবী করা হয়নি। প্রথম বারের মতো শুধুমাত্র আপীল বিভাগে এই দাবী করা হয়েছিলো। স্পষ্টতঃ হাইকোর্টেও শাস্তি বহাল থাকায় অভিযুক্তরা কম শাস্তি প্রাপ্তির জন্য আপীল বিভাগে সম্পূর্ণ নতুন দাবী উত্থাপন করেছেন। স্বাভাবিক ভাবেই আদালত এই দাবী গ্রহন করেননি। কারণ, আদালতে যথাযথভাবে উপস্থাপন ব্যতীত এই ধরনের অমূলক, অবান্তর দাবী মামলার এই পর্যায়ে বিবেচনা করার কোন সুযোগ ছিলো না।তথাপি, অভিযুক্তের শারীরিক অবস্থা শাস্তি প্রদানকালে অবশ্যই বিবেচ্য এবং মামলার পরিস্থিতি অনুযায়ী এটি অভিযুক্তের পক্ষে Mitigating Circumstance হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু, শারীরিক কারণে অভিযুক্ত এই অপরাধ করতে অক্ষম ছিলেন তা আদালতের নিকট প্রতীয়মান হয়নি।উভয় অভিযুক্ত আদালতে ১৬৪ ধারায় অপরাধ স্বীকার করেছিলেন। ১৬৪ ধারায় অপরাধ স্বীকার করা অবশ্যই একটি Mitigating Circumstance এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী অভিযুক্ত অনুতপ্ত হলে বা অন্য কোন পরিস্থিতির সাথে যোগ হয়ে এটি শাস্তির সময় অপরাধীর পক্ষে ব্যবহৃত হতে পারে। এই মামলায় ভিকটিম অভিযুক্তদের নিকট সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিলেন। প্রকৃত পক্ষে, ঐ সময়ে ঐ এলাকার যে কেউ এই অপরাধীদের শিকার হতে পারতেন। মামলায় অপরাধ সংঘটনের স্বপক্ষে অপরাধীদের কোন ব্যাখ্যা ছিলো না। তারা যে অপরাধ করেছিলেন তাতে শুধুমাত্র তাদের অপরাধ প্রবৃত্তি বা পশু প্রবৃত্তি প্রতিফলিত হয়। তারা আদালতের নিকট অনুকম্পা প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু, অনুকম্পা বা দয়া প্রদর্শনের জন্য কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ আদালতের নিকট উপস্থাপন করতে পারেননি। তারা অপরাধ স্বীকার করলেও ঘটনা অনুযায়ী তা বিবেচনার অযোগ্য ছিলো। বরং, তাদের দোষ স্বীকারোক্তি এবং উপস্থাপিত সাক্ষ্য, প্রমাণ একে অপরের পরিপূরক হওয়ায় তা তাদের বিরুদ্ধে Aggravating Circumstance হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। এই মামলায় সরাসরি বা পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য অকাট্য ছিলো যা কোনভাবেই অভিযুক্তরা খণ্ডন বা প্রশ্নবিদ্ধ করতে সক্ষম হননি।সাক্ষ্যের ক্রম কোনভাবেই নষ্ট হয়নি। ফলে, গ্রহণযোগ্য কোন পরিস্থিতি ব্যতীত শুধুমাত্র দোষ স্বীকার করা Mitigating Circumstance হিসেবে বিবেচিত হয়নি। অভিযুক্তদের পক্ষে কোন Mitigating Circumstance ছিলো না।সুতরাং, এই মামলার Criminal Test হলো ০%।

আমরা মামলাটির Rarest of the Rare Test (R-R Test) দেখতে পারি।

আমাদের দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ৩০২ ধারায় হত্যার স্বাভাবিক শাস্তি হলো মৃত্যুদন্ড। মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করলে সেজন্য সুনির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতি উপস্থিত থাকতে হয়।এই মামলায় অভিযুক্তরা কম শাস্তি প্রদানের জন্য কোন কারণ প্রদর্শন করতে পারেননি।একই ভাবে,উপস্থাপিত না হওয়ায় আদালতও কোন পরিস্থিতি বিবেচনা করেননি। এই মামলায় R-R Test এর ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় হলো সমাজের উপরে এর প্রভাব এবং সমাজ কি চায়? অপরাধীরা গাড়ি ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে ভিকটিমকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছেন। এই ঘটনার শিকার যে কেউ হতে পারতেন। অর্থাৎ, ঘটনার সময়ে ভিকটিমসহ সিএনজি গাড়ি চালনা করছিলেন এমন যে কেউ অপরাধের শিকার হতে পারতেন। সুতরাং, অপরাধীদের দ্বারা সমাজের যে কেউ আক্রান্ত হতে পারতেন। সমাজের যে কোন ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় অভিযুক্তদের নিকট কেউই নিরাপদ নন। অভিযুক্তরা তাদের চাহিদা পূরণের জন্য যে কাউকে হত্যা করতে পারেন।

আদালত লক্ষ্য করেছেন এই ধরনের অপরাধ সমাজে ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ, এই মামলার ঘটনায় যে উপায়ে বা প্রক্রিয়ায় অপরাধ হয়েছে তা আদালতকে চিন্তিত, উদ্বিগ্ন করেছে। আদালত সমাজের নিষ্কলুষতা এবং সাধারণ জনগণের নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করেছেন। একই ভাবে, এই ধরনের অপরাধের কারণে সমাজের একটি শ্রেণি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আতংকিত হয়েছেন। এই মামলায় ভিকটিম শুধুমাত্র নিজের জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করেছিলেন এবং জীবন হারিয়েছিলেন। অভিযুক্তরা তাদের অপরাধের মাধ্যমে মূলতঃ নিজেদের সমাজের কলঙ্ক (Menace to the society) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সুতরাং, কম শাস্তি দিলে সমাজ তাদেরকে গ্রহণ করবে কিনা? এর উত্তর হলো অভিযুক্তদের অপরাধ অনুযায়ী সমাজ চাইবে অভিযুক্তদের স্থায়ী অপসারণ। তাদেরকে কম শাস্তি দেওয়া হলে ভবিষ্যতে সমাজের যে কেউ তাদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। অর্থাৎ, অভিযুক্তদের ভবিষ্যতেও অপরাধ করার এবং কোন ভিকটিমের জীবন হারানোর আশংকা থাকবে।কারণ,এই মামলার অভিযুক্তরা তাদের অপরাধের নৃশংসতা, বিভৎসতা ,নির্মমতা অনুযায়ী সংশোধনের অযোগ্য ছিলেন। তাদেরকে কম শাস্তি দিলে বরং তাদের দ্বারা অপরাধের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা থাকবে। সমাজ এই ধরণের অপরাধীদের নিশ্চিতভাবেই গ্রহণ করবেনা।বরং,সমাজ এই অপরাধীদের অপরাধকে তীব্রভাবে ঘৃণা করবে।ফলে, আদালত যুক্তিযুক্ত ভাবেই তাদেরকে সমাজের শত্রু (Enemy of the Society) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং, এই মামলার Rarest of the Rare Test (R-R Test) ১০০%।

আমরা দেখতে পাচ্ছি উপরোক্ত তিনটি টেস্ট অনুযায়ী অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তি যুক্তিযুক্ত ছিলো এবং আদালত সেটিই প্রদান করেছেন।মামলায় বর্ণিত অপরাধের ধরণ নিয়ে আদালত উদ্বিগ্ন হওয়ায় আদালত তাই অভিযুক্তদের ফাঁসির শাস্তি ঘোষণার মাধ্যমে সম্ভাব্য অপরাধীদের সতর্ক করার এবং এই ধরণের অপরাধ করলে তার পরিণাম কি হতে পারে-সে সম্পর্কে উদাহরণ তৈরির চেষ্টা করেছেন।

লেখক- অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, কক্সবাজার।