ডেভলপারের নিকট হতে ফ্ল্যাট ক্রয়ের পূর্বে দরকার যেসব সতর্কতা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৩ জুলাই, ২০২১ ৬:০৪ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ সেলিম মিয়া:

আপনি যদি ডেভলপারের নিকট হতে ফ্ল্যাট ক্রয় করতে চান সেক্ষেত্রে কিছু বিষয় নিয়ে আপনাকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে অন্যথায় আপনার সারা জীবনের কষ্টে অর্জিত বা তিল তিল করে জমানো টাকায় স্বপ্নের নিবাস অধরায় রয়ে যাবে।

এ কারনে ফ্ল্যাট ক্রয়ের পুর্বে আপনার উচিৎ হবে সম্পত্তির মালিকানা যাচাই এর জন্য এ বিষয়ে দক্ষ একজন আইনজীবীর মাধ্যমে প্রপার্টি ভেটিং করিয়ে নেওয়া তথাপিও আপনাকে ক্রেতা হিসাবে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর নজর রাখতে হবেঃ

(i) জমির মালিকানা সি.এস/এস.এ থেকে বর্তমান সিটি জরিপ পর্যন্ত নিষ্কন্টক আছে কি না আইনজীবীর মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করবেন। কাগজপ্ত্রে অথবা বাস্তব দখলে মালিকানায় কোন বিরোধ থাকলে না কেনায় শ্রেয় কারন অনেক সময় আপতত কোন সমস্যা না হলেও দেখবেন ভবন নির্মাণের পরে কোন এক সময় কোন পক্ষ এসে জমির মালিকানা দাবি করলে আপনার ফ্ল্যাটটিও ঝুকির মধ্যে পড়ে যাবে অথবা সমস্যা সমাধানে বাড়তি টাকা গুনতে হবে।

(ii) ভুমি মালিকের সাথে ডেভলপারের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিপত্র এবং পাওয়ার অফ এটর্নি দলিলে ক্রয়ের জন্য প্রস্তাবিত ফ্ল্যাট টি ডেভলপার প্রাপ্য অংশ কি না ভালো করে দেখে নিতে হবে,

(iii) ভুমি মালিকের সাথে ডেভলপারের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিপত্র এবং পাওয়ার অফ এটর্নি দলিলে প্রস্তাবিত ভবনটি ভুমি মালিক কয়তলা পর্যন্ত করার ক্ষমতা ডেভলপারকে দিয়েছে তা ভালো করে দেখে নিতে হবে কারন ধরুন আপনি ৭ম তলার একটি ফ্ল্যাট কিনবেন কিন্তু ভুমি মালিক ডেভলপার কে ৬ তলা পর্যন্ত করার ক্ষমতা দিয়েছে তাহলে আপনার ফ্ল্যাট কেনা বৈধ হবে না।

(iv) ভুমি মালিকের পক্ষে ডেভলপার রাজউকের নিকট হতে কয়তলা পর্যন্ত করার ক্ষমতা পেয়েছে তা ভালো করে দেখে নিতে হবে কারন ধরুন আপনি ৭ম তলার একটি ফ্ল্যাট কিনবেন কিন্তু ভুমি মালিকের পক্ষে ডেভলপার রাজউকের নিকট হতে ৬ তলা পর্যন্ত করার ক্ষমতা পেয়েছে তাহলে আপনার ৭ম তলার ফ্ল্যাট কেনা অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ  হবে কারন রাজউক যে কোন সময় অনুমোদনের বাইরের অংশ ভেঙ্গে ফেলার অধিকার রাখে ।

ধরে রাখেন, ফ্ল্যাট ক্ররের পুর্বে ডেভেলপার কোম্পানি আপনার সাথে একটি বায়না চুক্তি করিয়ে নিবে উক্ত চুক্তির খসড়ার প্রতিটি শর্ত ভালভাবে পড়ে বুঝে তার পরে সই করবেন এবং প্রয়োজনে চুক্তিপত্রটিও একজন আইনজীবীর মাধ্যমে ভেটিং করিয়ে নিবেন।

একটি বিষয় মাথায় রাখবেন, আপনি একবার চুক্তিতে স্বাক্ষর করে ফেললে পরবর্তীতে বলতে পারবেন না যে, আপনি বোঝেননি বা আপনাকে পড়তে দেয়া হয়নি। চুক্তিতে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেনঃ

১। চুক্তিতে এ্যাপার্টমেন্ট কত দিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে তা দেখে নিন।

২।  নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ্যাপার্টমেন্ট সম্পন্ন না করতে পারলে আপনাকে মাসিক হারে কি পরিমাণ ক্ষতিপূরণ বা ফ্ল্যাট ভাড়ার টাকা দিবে তা দেখে নিন।

৩। কিস্তির টাকা বাদ পড়লে বা দেরী হলে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে- এমন শর্ত থাকলে চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন না; কিস্তির টাকা বাদ পড়লে বা দিতে দেরী হলে দন্ড সুদ আরোপিত হতে পারে কিন্তু চুক্তি বাতিল তথা ফ্ল্যাট পাবেন না- এমন শর্ত মেনে নিবেন না কারন আপনার ধরেই নেওয়া উচিৎ যে, কোন একটা কিস্তি বাদ পড়তেই পারে, টাকা সবসময় সবার হাতে থাকে না, এ ক্ষেত্রে ডেভ্লপারের পক্ষে চুক্তি বাতিল করা এটা মোক্ষম অস্ত্র হয়ে যাবে সে সুযোগ আপনি জেনে শুনে কেন দেবেন;

৪। প্রথম কিস্তি অথবা বুকিং মানি দেয়ার সময় এলটমেন্ট লেটার বুঝে নিবেন এবং এলটমেন্ট লেটার-এ অবশ্যই আপনার নামে বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটের নাম এবং কার পার্কিং (যদি থাকে) সুনির্দিষ্টভাবে লিখা আছে কি না দেখে নিবেন;

৫। ফ্ল্যাটের সাথে কার পার্কিংয়ের বিধান থাকলে চুক্তির তফসিলে অবশ্যই কার পার্কিংয়ের কথা যেন উল্লেখ থাকে তা দেখে নিবেন; না হলে আপনি প্রতারণার স্বীকার হতে পারেন। ক্রেতারা ভালভাবে না পড়ে চুক্তি দস্তখত করেন; কারপার্কিংয়ের জন্য টাকা দিলেন কিন্তু তফসিলে বা চুক্তিতে উল্লেখ না থাকলে আপনি দখল নেয়ার সময় ফ্লাটের সাথে পার্কিং পাবেন না; এছাড়া কারপার্কিং কোন পাশে দিবে পারলে লিখে নেবেন কারন পরবর্তীতে এটা নিয়েও গন্ডগল লেগে যায় ।

৬। বুকিং মানি দেয়ার সময় এবং কিস্তির টাকা দেয়ার সময় ডেভেলপার কর্তৃক প্রদত্ত প্রতিটি টাকার রশিদ সংগ্রহ করুন এবং ফটোকপি করে এক সেট অন্যত্র রাখুন। কারণ পরবর্তীতে ডেভেলপার দখল, রেজিস্ট্রেশন ইত্যাদি নিয়ে তালবাহানা করলে এই কাগজগুলোই আপনার স্বপক্ষে সাক্ষ্য হিসেবে কাজ করবে;

৭। চুক্তিপত্রের প্রতিটি ক্লজ ভালভাবে পড়ুন। মনে রাখবেন, ফ্ল্যাটটি নিয়ে আপনার সাথে চুক্তি করার সময় ব্যাংকে বা কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে উক্ত ফ্ল্যাট বা এ্যাপার্টমেন্ট বন্ধক রাখা থাকলে উক্ত চুক্তি সম্পাদন করবেন না;

৮। ডেভেলপারের কাছ থেকে অঙ্গীকারপত্র নিয়ে নিন যে, সংশ্লিষ্ট পুরো এ্যাপার্টমেন্ট বা সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাটটি কোন ব্যাংক অথবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বন্ধক রাখা হয়নি অথবা চুক্তিতে একটি ক্লজ এ বিষয়ে সংযুক্ত করুন;

৯। চুক্তিতে একটি ক্লজ সংযুক্ত করাবেন এই মর্মে যে, দখল হস্তান্তর বা এ্যাপার্টমেন্ট নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করতে দেরী হলে কিংবা অন্য যে কোন অযুহাতেই ডেভেলপার বরাদ্বপত্রে উল্লিখিত মূল্যের চেয়ে বেশী মূল্য দাবী করতে পারবে না;

১০।  চুক্তির তফসিল ভাল করে দেখে নিবেন। তফসিলে জমির পরিমাণ লেখা থাকবে।মোট জমির মধ্যে আপনি হারাহারিভাবে কত অযুতাংশের মালিক হচ্ছেন তা সঠিক ভাবে লেখা আছে কি না যাচাই করে নিন। ২য় তফসিলে ফ্ল্যাটের নাম ও বর্ণনা বরাদপত্র অনুযায়ী ঠিক আছে কি না; কার পার্কিং এর উল্লেখ আছে কি না দেখে নিন;

১১।  প্রায় প্রতিটি চুক্তিতেই দেখা যায় ডেভেলপার ও ক্রেতা পক্ষদ্বয়ের মাঝে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি আরবিট্রেশনের মাধ্যমে মীমাংসা করবে। এ ধরনের ক্লজকে আইনের ভাষায় আমরা বলি আরবিট্রেশন ক্লজ। ডেভেলপারের সাথে আপনার সম্পাদিত চুক্তি একটি ভুক্তা চুক্তি; বাণিজ্যিক চুক্তি নয়। সুতরাং আপনি পারতপক্ষে আরবিট্রেশন ক্লজ থাকলে চুক্তিতে দস্তখত করবেন না। আপনি বুকিং মানি দেয়ার পূর্বেই অঙ্গীকার নিয়ে নিবেন যে, চুক্তিতে কোনভাবেই আরবিট্রেশন ক্লজ থাকতে পারবে না।চুক্তিতে শালিসের ক্লজ থাকলে পরবর্তীতে যখন ডেভেলপার আপনাকে দখল দিতে অস্বীকার করবে কিংবা রেজিস্ট্রেশন দিতে অস্বীকার করবে তখন আপনি বিপদে পড়ে যাবেন।  কারণ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আরবিট্রেশন সম্পূর্ণ না করে আপনি কোন আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবেন না। বাংলাদেশে আরবিট্রেশন ক্লজ তথা সালিশের বিধান ফ্ল্যাট ক্রেতার জন্য মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিবে। সালিশ কার্যক্রম সম্পন্ন না করে নতুন চুক্তির অধীনেও কোন মামলা দায়ের করা যাবে না। তাছাড়া আরবিট্রেশনের খরচ আদালতের খরচের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশী । পুরো আরবিট্রেশন প্রক্রিয়ায় ২-৩ লক্ষ টাকা খরচ হতে পারে যার অর্ধেক আপনাকে এবং অর্ধেক ডেভেলপারকে বহন করতে হবে। আরবিট্রেশন কার্যাবলী বলতে গেলে পুরোপুরি আদালতের মত এবং এখানে এ্যাডভোকেট নিয়োগ ছাড়া রোয়েদাদ পাওয়া অসম্ভব। আরবিট্রেশনের রায় তথা রোয়েদাদ ২৫,০০০ টাকার স্ট্যাম্পে প্রিন্ট করতে হবে এবং এছাড়াও আরবিট্রেটরের সাচিবিক খরচও বিরোধের উভয় পক্ষকে বহন করতে হবে যা প্রতিটি শুনানী অনুযায়ী নির্ধারিত হয়ে থাকে। এর পর আরবিট্রেশনের রোয়েদাদ চ্যালেঞ্জ করে এক পক্ষ জেলা জজের নিকট আপীল করতে পারবে এবং উক্ত আপিল কয়েক বছর ধরে চলমান থাকতে পারে। জেলা জজের রায়ের বিরুদ্ধেও  সংক্ষুব্ধ পক্ষ হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন মামলা দায়ের করতে পারবে এবং সাধারণত বড় অংকের টাকা খরচ করে সিনিয়র এবং নামকরা এ্যাডভাোকেট নিয়োগ করতে না পারলে দশ বছরেও রিভিশন মামলার শুনানী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এখানেই শেষ নয়, হাইকোর্ট রিভিশন  মামলায় রায় দিলে সংক্ষুব্ধ পক্ষ উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে আপীল দায়ের করতে পারবে এবং আপীল বিভাগে আপীল দায়েরের ক্ষেত্রে নানাভাবে বড় অংকের টাকা ব্যয় করতে হয়। আপীল গৃহীত হলেও শুনানী ও রায় পেতে আরও দশ বছর লেগে যেতে পারে। পেপার বুক তৈরি, লিভ পিটিশন গ্রহণ করানো; অতঃপর আপীল শুনানীর জন্য প্রস্তুত করা এবং অতঃপর শুনানী সম্পন্ন করা ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় কয়েক লক্ষ টাকা খরচ হয়ে যাবে।

সুতরাং ভেবে দেখুন আরবিট্রেশন ক্লজ যদি চুক্তিতে রাখা হয়, তাহলে এই সালিশপ্রক্রিয়া শেষ হতেই লেগে যাবে প্রায় ২০/৩০ বছর। চুক্তিতে সালিশ ক্লজ থাকলে আপনি হাইকোর্ট বিভাগেও কোন রীট মামলা দায়ের করতে পারবেন না। প্রাথমিকভাবে রীট গৃহীত হলেও মূল শুনানীতে রীট খারিজ হয়ে যায় এবং আপনাকে আবার আরবিট্রেশন প্রক্রিয়ায় ফিরে আসতে হবে।

লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে ক্লায়েন্ট কে আরবিট্রেশন খরচের কথা খুলে বলায় অনেকে মামলা না করিয়ে চলে যায় অনেকের আবার খরচের অক্ষমতা শেয়ার করে এবং বলে এমনিতে নিঃশ্ব হয়ে গেছি আর মামলা করতে পারব না ফলে ডেভেলপার অবমুক্তি পেয়ে যায় তাই ফ্ল্যাট ক্রয়ের আগে ভেবে চিনতে চুক্তি করবেন।

লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।