বাবা-মায়ের তালাক ও সন্তানের ভবিষ্যৎ

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৩ জুলাই, ২০২১ ৬:২১ অপরাহ্ণ
আইন ও আদালত

মোঃ শহীদুল্লাহ মানসুর:

সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে বিবাহ বিচ্ছেদ। গ্রামের তুলনায় শহরে সংখ্যাটি অনেক বেশি। যখন স্বামী-স্ত্রীরাম্প্রতিক  দাম্পত্য জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠে তখন তারা বিচ্ছেদের মাধ্যমে মুক্তির পথ খুজে। স্বামী-স্ত্রীর এই মুক্তিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদেরসন্তানবা সন্তানেরা।এসময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন, সন্তান কার কাছে থাকবে বা সন্তানের খোরপোষ বা ভরণপোষণ কে দিবে? এ বিষয়টি আইন ও বিভিন্ন মামলার রায়ের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিয়েছে।নিচেআলোচনাকরাযাক;

সন্তান কার কাছে থাকবে-

প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থাৎ তালাকের পর সন্তানের পিতা-মাতাই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তাদের সন্তান কার কাছে থাকবে বা কার কাছে কতোদিন থাকবে, এ সময়ে তাঁরাই আলোচনা সাপেক্ষে সন্তানের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে সন্তানের উপযুক্ত স্থান, পরিবেশ ও ভরনপোষণ নির্ধারন করবেন। তবে উভয়পক্ষ যদি এটি করতে ব্যর্থ হয় তখন আইনের আশ্রয়ে আদালতের মাধ্যমে তা নির্ধারন করা যাবে। বাংলাদেশে পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫-এর ৫(ঙ) ধারা মতে, সন্তানের অভিভাবক্ত্ব ও তত্ত্বাবধান বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার পারিবারিক আদালতকে দেওয়া হয়েছে। গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট, ১৮৯০-এর ১৭ ধারায় তিনটি উপ-ধারায় গার্ডিয়ান হিসাবে কাকে এবং কেন নিয়োগ দেওয়া যাবেতা স্পষ্ট করা হয়েছে অর্থাৎঅপ্রাপ্তবয়স্কসন্তানের সার্বিক কল্যাণ বিবেচনা করে আদালত উপযুক্ত অভিভাবক নিয়োগ করবেন। এক্ষেত্রেঅপ্রাপ্তবয়স্কসন্তানেরবয়স, লিঙ্গ, ধর্ম, প্রস্তাবিত অভিভাবকের চরিত্র, সামর্থ্য এবং সন্তানের সাথে নৈকট্য ও আত্মীয়তার সম্পর্ক, মৃত মা-বাবার যদি কোনো ইচ্ছা থাকে বাইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে উপযুক্ত অভিভাবক নির্ধারন করা হবে। তবে অভিভাবক নির্ধারনের সময়েসন্তান যদি বুদ্ধিদীপ্ত মতামত দেওয়ার ক্ষমতা থাকে তবে আদালতসন্তানেরমতামতকেই প্রাধান্য দিবেন।

মুসলিম আইন অনুযায়ী, সাধারণত পিতা যেকোন অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের আইনগত অভিভাবক আর মা সেখানে সন্তানের তত্ত্বাবধায়ক। এখানে মা যদি কোন কারণে আলাদা থাকেন বা বিচ্ছেদ হয়ে যায়, তাহলেও মা সন্তানের তত্ত্বাবধায়কের ক্ষমতা হারায় না। ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে সাত বছর বয়স পর্যন্ত এবং মেয়েসন্তানের বয়ঃসন্ধি বয়স পর্যন্ত মা সন্তানদের নিজের তত্ত্বাবধানে রাখতে পারবেন। তবে সন্তানের কল্যাণের জন্য মা চাইলে উক্ত বয়সসীমার পরও আদালতের অনুমতিক্রমে সন্তানকে নিজের তত্ত্বাবধানে রাখতে পারবেন। আবু বকর সিদ্দিকী বনাম এস এম এ বকর ৩৮ ডিএলআর মামলা অনুযায়ী, যদি আদালত মনে করে যে, সন্তান মায়ের তত্ত্বাবধানে থাকলে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ স্বাভাবিক হবে, সন্তানের কল্যাণ হবে এবং স্বার্থ রক্ষা পাবে- সেক্ষেত্রে আদালত মাকেউক্ত বয়সের পরেও সন্তানের তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করতে পারেন।

মা কখন সন্তানের অভিভাকত্ব হারাতে পারেন-

  • অনৈতিকভাবে জীবনযাপন করলে,
  • সন্তানের প্রতি অবহেলা করলে
  • দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে,
  • যদি ইসলাম ছেড়ে অন্য ধর্ম গ্রহণ করেন,
  • যদি সন্তানের পিতাকে সন্তানকে দেখতে না দেয়া হয়।
  • বিশ্বস্ততা হারিয়ে ফেলা সহ ইত্যাদি কারণে।

সন্তানদের ভরণপোষণ:

স্ত্রীওসন্তানের ভরণপোষণ দেয়া স্বামীর আইনগত দায়িত্ব। কিন্তু তালাকের পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্বামী স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।সেসময় পার হলে স্ত্রীকে ভরণ পোষণ দেয়া স্বামীর দায়িত্বের মধ্যে পড়েনাকিন্তুস্বামী-স্ত্রীআলাদাথাকবাতালাকহোক, অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের ভরণপোষণ দেওয়ার দ্বায়িত্ব স্বামীর অর্থাৎ ঐসন্তানের পিতার। এক্ষেত্রে অক্ষম সন্তান বা সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরেও যদি নিজের ভরণপোষণ যোগাতে ব্যর্থ হয়তবে ঐ সন্তান তারপিতার কাছে ভরণপোষণ দাবি করতে পারে।

নোটঃ মা যদি সন্তানের তত্ত্বাবধানে থাকে তবুও সন্তানের ভরণপোষণ পিতাকেই দিতে হবে।

পরিমাণ
ভরণপোষণের পরিমাণ পিতা-মাতার সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিকঅবস্থার ওপর নির্ভর করে। সাধারণত পিতা তার নিজের বাসায় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে সন্তানদেরও খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানসহ সকল সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে ভরণপোষণ দিয়ে থাকে। তালাকের পর আইনসংগত কারণেও আদালতের অনুমতিক্রমে সন্তান যদি মায়ের সাথে আলাদা বসবাস করে, তখন নগদ অর্থ দিয়ে সন্তানের ভরণ-পোষণ দিতে হবে। এক্ষেত্রে আদালত নির্ধারন করে দিবেন ভরণপোষণের অর্থের পরিমাণ কতো হবে, কিভাবে দিবে ও কবে দিবে।

বাবা-মায়ের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারঃ

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১এর ধারা ৪ অনুযায়ী, পিতা বা মাতা মৃত্যুরপর তাদের রেখে যাওয়া ওয়ারিশদের মধ্যে সম্পত্তি আনুপাতিকহারে ভাগ হয়। এক্ষেত্রে পিতা-মাতার তালাক হলে পিতা বা মাতার সম্পত্তিতে সন্তানের অধিকার থাকবে সেটি আইনে স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। তবে আইন বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন মামলার রায় থেকে বুঝা যায়, স্বাভাবিক সময়ে যতটুকু সম্পত্তি পেত, তালাক হলেও সেই পরিমাণই পাবে। কেননা সন্তানের সাথে পিতা বা মাতার রক্তের সম্পর্ক যা কোন চুক্তি নয় যে তা বাতিল বা নিষিদ্ধ করা যায় অর্থাৎ পিতা বা মাতার সাথে সন্তানের সম্পর্ক চিরস্থায়ী যা কোনভাবেই শেষ করা সম্ভব হয় না।

লেখক- শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি