পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে গবেষণা সেল গঠনের নির্দেশ হাইকোর্টের

প্রতিবেদক : ল'ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ
প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট, ২০২২ ৫:০৩ অপরাহ্ণ

বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের চিহ্নিত করতে এবং পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান মো. মাসুদ বিশ্বাসকে একটি গবেষণা সেল গঠনের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

আজ বুধবার (৩১ আগস্ট) হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম ও বিচারপতি খিজির হয়াতের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ নির্দেশ দেন।

আদেশে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদেরকে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানি ও আদেশের জন্যে আগামী ২৬ অক্টোবরের দিন ঠিক করেছেন আদালত।

শুনানির এক পর্যায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ বলেন, ‘পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে শুধু চিঠি আদান-প্রদান কার্যকর হবে না। আপনাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আপনাকে বিষয়টি সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এই বিষয়ে আপনার জ্ঞান এবং আন্তরিকতা থাকতে হবে। ভারত যদি করতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারবো না?’

শুনানিতে আদালত বলেন, ‘আমরা চাই, আপনারা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু করেন। যদিও আপনারা দেশের স্বার্থেই কাজ করে চলেছেন। তবে আমরা চাই, দেশটা ভালো থাকুক। দেশ ভালো থাকলে দেশের মানুষও ভালো থাকবে। সবাই ভালো থাকার জন্যই দেশটা স্বাধীন করা হয়েছে।’

এসময় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের প্রধান মাসুদ বিশ্বাস আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

আদালতে এদিন রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আন্না খানম কলি। দুদকের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান।

এর আগে সকালে সুইস ব্যাংকে অর্থ জমাকারীদের বিষয়ে দেওয়া প্রতিবেদন নাম-পদবি ছাড়া জমা দেওয়ায় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের প্রধান মাসুদ বিশ্বাস হাইকোর্টের তলবে হাজির হয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন।

এসময় আদালত তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘একেবারে দায়সারাভাবে প্রতিবেদনটি আদালতে জমা দিয়েছেন। নাম-পদবি ছাড়া একটা প্রতিবেদন উচ্চ আদালতে দিয়ে দিলেন, এটা কি ক্যালাসনেস না? আপনি আজ দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চাইছেন। আমরা এবার ক্ষমা করছি। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য আপনাদের সতর্ক হতে হবে।’

হাইকোর্ট বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা দেশেই ফিরে আসবে। দেশ ভালো থাকলে আমরা সবাই ভালো থাকবো। ভালো থাকার জন্যই দেশটা স্বাধীন হয়েছে।’

এসময় বিচারক বলেন, ‘আমরা সবাই আন্তরিকভাবে কাজ করলে এ দেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হবেই।’

হাইকোর্ট আরও বলেন, ‘মানি লন্ডারিংয়ের মতো অপরাধ এ দেশ থেকে কমাতেই হবে। আমরা সিঙ্গাপুর থেকে ভালো হতে চাই। যদিও এখন আমরা ভালো আছি।’ সিঙ্গাপুর আমাদের কাছাকাছি সময়ে স্বাধীন হয়েছে যোগ করেন বিচারক।

একপর্যায়ে হাইকোর্ট অর্থপাচার প্রতিরোধে সেল গঠন ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে অর্থ জমাকারী বাংলাদেশিদের তথ্য চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন আগামী ২৬ অক্টোবরের মধ্যে জমা দিতে বিএফআইইউ প্রধানের প্রতি নির্দেশ দেন।

হাইকোর্টের আদেশের পরেও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সুইস ব্যাংকে অর্থপাচার সংক্রান্ত বিষয়ে তথ্য দাখিল করায় মঙ্গলবার (৩০ আগস্ট) হাইকোর্টের একই বেঞ্চ মাসুদ বিশ্বাসকে তলব করে। তাকে বুধবার (৩১ আগস্ট) বেলা ১১টায় হাইকোর্টে উপস্থিত হতে আদেশ দেন।

সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে অর্থ জমাকারী বাংলাদেশিদের বিষয়ে সরকার নির্দিষ্টভাবে কোনো তথ্য চায়নি বলে সম্প্রতি দেশটির রাষ্ট্রদূত বক্তব্য দেন। তার এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউর পক্ষ থেকে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ সংক্রান্ত বিষয়ে পাওয়া তথ্য প্রতিবেদন আকারে জমা দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউর তথ্য আদালতে তুলে ধরেন। তবে জমা দেওয়া কাগজপত্রে কারও নাম, সিল ও পদবি উল্লেখ না থাকায় বিএফআইইউ প্রধানকে তলব করেন আদালত।

প্রসঙ্গত, গত ১০ অগাস্ট রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নে সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত নাথালি শুয়া বলেন, সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা করা বাংলাদেশিদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য সরকার তাদের কাছে চায়নি।

তিনি বলেন, “এসব বিষয়ে (তথ্য পাওয়ার বিষয়ে) কীভাবে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো যায়, সে বিষয়ে সরকারকে সব ধরনের তথ্য আমরা দিয়েছি। কিন্তু আলাদাভাবে অর্থ জমা করার বিষয়ে কোনো অনুরোধ আসেনি।”

ওই খবর নজরে এলে ১১ অগাস্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সরকার ও দুদকের ব্যাখ্যা চেয়েছিল আদালত।

সে ব্যাখ্যায় গত ১৪ অগাস্ট রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বিএফআইইউ’র একটি প্রতিবেদন আদালতে তুলে ধরেন। একই সাথে দুদকের আইনজীবীও আরেকটি প্রতিবেদন দাখিল করেন।

রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদকের বক্তব্য শুনে ওই দিন আদালত বলে, রাষ্ট্রদূত যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বক্তব্যের সাথে ‘সাংঘর্ষিক’।

এরপর আদালত ওই প্রতিবেদন এবং বক্তব্য ‘হলফনামা’ আকারে দাখিলের নির্দেশ দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ওই প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে ‘যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায়’ মঙ্গলবার শুনানির সময় বিএফআইউউ প্রধানকে তলব করা হয়।