দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, গুম, নির্বাসন ও আইনি লড়াইয়ের অধ্যায় পেরিয়ে অবশেষে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা, কক্সবাজার-১ (চকরিয়া–পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন মন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, নতুন সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, মানবাধিকার প্রশ্নে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নিরাপত্তা খাতের কাঠামোগত সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে চায়। সেই বাস্তবতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমদের সামনে দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি চ্যালেঞ্জও গভীর।
সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজার জেলার তৎকালীন বৃহত্তর চকরিয়া উপজেলার পেকুয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সিকদার পাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মৌলভী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৌলভী ছাঈদুল হক ও মাতা বেগম আয়েশা হক। পিতামহ ছিলেন মৌলভী আবদুল আলী এবং মাতামহ হাকিমন।
পেকুয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৭ সালে রেকর্ড নম্বর পেয়ে এসএসসি পাস করেন। পরে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। ১৯৮০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৮৪ সালে এলএলবি (সম্মান) ও ১৯৮৬ সালে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের তালিকাভুক্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি অ্যাডভোকেট হিসেবেও সনদ লাভ করেন।
আরও পড়ুন : আইনজীবী থেকে আইনমন্ত্রী হলেন আসাদুজ্জামান
১৯৮৫ সালে সপ্তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন। ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করেন। বগুড়া জেলা প্রশাসনে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ১৯৯১ সালে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে যোগ দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতি এবং একসময় ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকায় তাঁকে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করতে হয়।
১৯৯৬ সালের জানুয়ারিতে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে তিনি পুরোপুরি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।
ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া–পেকুয়া) আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি এলাকায় রাজনৈতিক রেকর্ড গড়েন। সপ্তম ও অষ্টম সংসদ নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করেন।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর চারদলীয় জোট সরকার গঠিত হলে ১০ অক্টোবর সালাহউদ্দিন আহমদ যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। একই সঙ্গে তিনি কক্সবাজার জেলার ইনচার্জ মন্ত্রী ছিলেন। স্বাধীনতার পর কক্সবাজার জেলা থেকে তিনিই প্রথম মন্ত্রী হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন।
আরও পড়ুন : এজলাস থেকে মন্ত্রিসভা: দীপেন দেওয়ান হলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম পূর্ণ মন্ত্রী
২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর উদ্যোগেই বৃহত্তর চকরিয়া উপজেলা ভেঙে পেকুয়া উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সাড়ে চার বছরে পেকুয়ায় অবকাঠামো, প্রশাসনিক ভবন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটে।
২০০৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ওয়ান–ইলেভেন সরকারের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন এবং প্রায় দুই বছর দুই মাস কারাবন্দী থাকেন। ২০০৯ সালের ২৯ মার্চ তিনি কারামুক্ত হন। এ সময় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর সহধর্মিণী অ্যাডভোকেট হাসিনা আহমদ কক্সবাজার-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০১৫ সালে বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ১০ মার্চ ঢাকার উত্তরার একটি বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে মুখোশধারীরা তাঁকে অপহরণ করে। এরপর দীর্ঘ ৬২ দিন তিনি নিখোঁজ ছিলেন। একই বছরের ১১ মে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরের একটি মাঠে তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন : ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল
ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জেলা ও দায়রা জজ আদালতেও তিনি বেকসুর খালাস পান।
পাসপোর্ট জটিলতা ও কূটনৈতিক অনুমোদনের অভাবে দীর্ঘ সময় দেশে ফিরতে না পারলেও ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
১৯৯৬ সালে তিনি কক্সবাজার জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এবং পরবর্তীতে দু’বার সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১০ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে তিনি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। নির্বাসিত অবস্থায়ও তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন।
দীর্ঘ অনিশ্চয়তা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণকে বিএনপি ও সমর্থকরা রাজনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। আইনশৃঙ্খলা, মানবাধিকার এবং নিরাপত্তা খাতে সংস্কারে তাঁর অভিজ্ঞতা কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

