আদালতে হাজির হতে সাক্ষী পাবেন ‘কোর্ট এমএমএস’
আদালত (প্রতীকী ছবি)

ফরিদপুরে ‘পর্দা কেলেঙ্কারি’ মামলায় ৬ আসামির অব্যাহতি, বাকিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন

ফরিদপুর-এর বহুল আলোচিত ‘পর্দা কেলেঙ্কারি’ মামলায় ১২ আসামির মধ্যে ৬ জনকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে বাকি আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (৬ এপ্রিল ২০২৬) ফরিদপুরের বিশেষ জজ আদালত-এর বিচারক মো. শরিফউদ্দিন চার্জ গঠনের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি কুব্বাত হোসেন

অব্যাহতি পাওয়া ছয়জন হলেন—

  • ডা. শেখ আব্দুল ফাত্তাহ (সাবেক অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ)
  • ডা. মো. মিজানুর রহমান (সহযোগী অধ্যাপক, সার্জিক্যাল বিভাগ)
  • মো. আলমগীর ফকির (স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিষয়ক কর্মকর্তা, সিভিল সার্জন কার্যালয়)
  • আব্দুস সাত্তার (সাবেক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, গণপূর্ত বিভাগ)
  • মো. ওমর ফারুক (সমাজসেবা কর্মকর্তা)
  • মিয়া মোর্তজা হোসেন (প্রকৌশলী, নিমিউ অ্যান্ড টিসি ঢাকা)

যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে—

  • ঠিকাদার আব্দুল্লাহ আল মামুন
  • মুন্সি ফররুখ হোসেন
  • মুন্সি সাজ্জাদ হোসেন
  • মো. আলমগীর কবির
  • ডা. বরুণ কান্তি বিশ্বাস (পলাতক)
  • ডা. মো. এনামুল হক

মামলার পটভূমি

২০১৪ সালে ফরিদপুর মেডিকেলের জন্য অনিক ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ১০টি পণ্য সরবরাহের জন্য ১০ কোটি টাকার একটি কার্যাদেশ দেওয়া হয়। অপ্রয়োজনীয় ওই সব সরঞ্জাম বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি ধরে ১০ কোটি টাকা বিলও জমা দেওয়া হয়। শেষ মুহূর্তে মন্ত্রণালয় বিল অনুমোদন না করায় তা আটকে যায়।

ওইসব সরঞ্জাম সরবরাহের পর যে বিল জমা দেওয়া হয়, তাতে আইসিইউতে ব্যবহৃত একটি পর্দার দাম (এক সেট) ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধরা হয়। একটি অক্সিজেন জেনারেটিং প্ল্যান্ট কেনার খরচ দেখানো হয়েছে পাঁচ কোটি ২৭ লাখ টাকা। একটি ভ্যাকুয়াম প্ল্যান্ট ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, একটি বিএইইস মনিটরিং প্ল্যান্ট ২৩ লাখ ৭৫ হাজার, তিনটি ডিজিটাল ব্লাড প্রেশার মেশিন ৩০ লাখ ৭৫ হাজার, একটি হেড কার্ডিয়াক স্টেথিসকোপের দাম এক লাখ ১২ হাজার টাকা।

ওই সময়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠান তিনটির মালিক তিন ভাই। তৎকালীন ঢাকা বক্ষব্যাধি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুন্সী সাজ্জাদ হোসাইন মূলত প্রতিষ্ঠান তিনটি চালান। তার দুই ভাই মুন্সী ফররুখ হোসাইন ও আবদুল্লাহ আল মামুনের নামে প্রতিষ্ঠানগুলো চালানো হয়। কাগজকলমে তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিলেও মুন্সী সাজ্জাদই ছিলেন ওই টেন্ডারের মূল নিয়ন্ত্রক। তিনিই সিন্ডিকেট করে সাজানো দরপত্র দাখিল করেন।

ফরিদপুর মেডিকেলের ওই সময়ের তত্বাবধায়ক ওমর ফারুক খান (মৃত) শিডিউলভুক্ত সরঞ্জাম কেনা ও বাজার যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করে দেন।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দন্ত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গণপতি বিশ্বাসকে সভাপতি এবং গাইনি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট মিনাক্ষী চাকমা ও প্যাথলজি বিভাগের এএইচএম নুরুল ইসলামকে সদস্য করে ওই কমিটি গঠন করা হয়। তিনটি দরপত্রের মূল্য যাচাই করে কমিটি প্রতিবেদনও জমা দেয়। তত্ত্বাবধায়কের নেতৃত্বে কারিগরি কমিটি ওই দর গ্রহণ করার জন্য সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়। সর্বনিম্ন দরপত্রদাতা হিসেবে অনিক ট্রেডার্সকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

কার্যাদেশ পাওয়ার পর অনিক ট্রেডার্স ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মালামাল সরবরাহ করে এবং সাত কোটি ৬০ লাখ টাকা ও দুই কোটি ৪০ লাখ টাকার দুটি বিল মিলিয়ে ১০ কোটি টাকার বিল জমা দেয়।

আরও পড়ুন : হামের টিকা বেসরকারিকরণে অভিযোগ: ড. ইউনূসসহ উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চেয়ে আইনি নোটিশ

ওই সময়ের সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ উপায়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য যৌক্তিক কারণ এবং চাহিদা (প্রয়োজন) ছাড়াই সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ নেন। কমিটির সদস্যরা নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করে দর যাচাই ছাড়াই তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্যাডে ভুয়া দর দেখিয়ে ওই সব সরঞ্জামের উচ্চমূল্য দেখিয়ে প্রতিবেদন জমা দেন।

বাজারদর কমিটির মাধ্যমে মেডিকেল যন্ত্রপাতির অতিমূল্যায়ন, সরকারি আর্থিক ক্ষতি করে নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য ঠিকাদার সিন্ডিকেট উচ্চমূল্যে দরপত্র দাখিল ও কার্যাদেশ নেন। হাসপাতালের জন্য অপ্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা ও কেনাকাটার নিয়ম লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ১০টি আইটেম কেনা দেখিয়ে সরকারের ১০ কোটি টাকা ক্ষতির চেষ্টা করে আত্মসাতের চেষ্টা করেন।

পরে টাকা না পাওয়ায় হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় মেসার্স অনিক ট্রেডার্স ও মেসার্স আলী ট্রেডার্স। হাইকোর্ট বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য দুদককে নির্দেশ দেন।

হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্ত করে দুদকের সহকারী পরিচালক (ঢাকা) মো. মামুন উর রশিদ চৌধুরী বাদী হয়ে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ক্রয় কমিটির সঙ্গে যুক্ত তিন চিকিৎসক ও তিন ঠিকাদারকে আসামি করে মামলা করেন।

আদালতে শুনানি শেষে অব্যাহতি পাওয়া আসামিদের পক্ষের আইনজীবীবৃন্দ
আদালতে শুনানি শেষে অব্যাহতি পাওয়া আসামিদের পক্ষের আইনজীবীবৃন্দ

২০২৩ সালের ৯ জুলাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের পরিচালক মো. ফরিদ হোসেন পাটোয়ারি ক্রয় কমিটির সদস্য তিন চিকিৎসককে অব্যাহতি দিয়ে তিন ঠিকাদারের সঙ্গে আরও ১১ নতুন ব্যক্তিকে যুক্ত করে ১৪ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।

পরে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের বিশেষ জজ আকবর আলী শেখ অভিযোগপত্র গ্রহণ না করে মামলাটি নতুন করে আবার তদন্ত করে দুদককে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

পরবর্তীতে দুদকের সহকারী পরিচালক (ঢাকা) মো. বেনজীর আহমেদ ১২ জনকে আসামি করে ২০২৫ সালের ৩১ অগাস্ট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন বলে জানান পিপি কুব্বাত হোসেন।

তিনি বলেন, অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে চার্জ গঠনের শুনানি ছিল সোমবার। শুনানি শেষে বিশেষ জজ শরিফউদ্দিন ছয়জনকে অব্যাহতি দিয়ে বাকিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের নির্দেশ দেন।

আরও পড়ুন : সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী আটক, ডিবি হেফাজতে

অব্যাহতি পাওয়া ছয়জনের পক্ষে আদালতে ছিলেন আইনজীবী এম এ সামাদ। তিনি বলেন, “এটি হয়রানিমূলক মামলা ছিল। ঠিকাদারি দুই প্রতিষ্ঠান আইসিইউ ইউনিটের জন্য ১০ কোটি টাকার মালামাল সরবরাহ করেছিল। কিন্তু সরকার ১০ আনা পয়সাও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেয়নি।

“যেখানে টাকা আত্মসাতের কোনো ঘটনাই ঘটেনি, সেখানে ‘আত্মসাৎ করার চেষ্টার’ অভিযোগ এনে নামিদামি মানুষদের হয়রানি করা হয়েছে। টেন্ডার আহ্বানের রেজুলেশনে তাদের স্বাক্ষরই অপরাধ হয়ে দেখা দিয়েছে।”

পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে টাকা দেওয়া হয়; যার সুফল কোভিডের সময় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের দেখানো হয় বলে জানান আইনজীবী এম এ সামাদ।

চার্জ গঠনের শুনানিতে অব্যাহতি পাওয়া আসামিদের পক্ষে অংশ নেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী টি এম শাকিল হাসান, হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী আরফান সুলতানা ও টি এম আবিদ হাসান এবং ফরিদপুর জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এম এ সামাদ। দুদকের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন বিশেষ পিপি, সিনিয়র অ্যাডভোকেট শেখ কুবাদ হোসেন।

আইনজীবী এম এ সামাদ আদালতে বলেন, “এটি একটি হয়রানিমূলক মামলা। যেখানে প্রকৃত অর্থে কোনো আত্মসাতের ঘটনা ঘটেনি, সেখানে ‘আত্মসাৎ করার চেষ্টা’ অভিযোগ এনে সম্মানিত ব্যক্তিদের হয়রানি করা হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, টেন্ডার প্রক্রিয়ার রেজুলেশনে স্বাক্ষর করাকেই অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পরবর্তীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পরিশোধ করা হয় এবং কোভিড-১৯ সময়ে আইসিইউ ইউনিটে এর সুফল পাওয়া গেছে।

মামলার শুনানি শেষে আইনজীবী টি এম শাকিল হাসান তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, নিজ জেলা ফরিদপুরে এটি ছিল তার প্রথম মামলার শুনানি। প্রায় দুই ঘণ্টার শুনানি শেষে তার ক্লায়েন্টদের অব্যাহতি পাওয়া তার জন্য একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

তিনি বলেন, সহকর্মী অ্যাডভোকেট আরফান সুলতানার ভাষায় এটি ছিল “স্বপ্নেরও অধিক”। মামলার পর বয়োজ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের আবেগঘন প্রতিক্রিয়া—জড়িয়ে ধরে কান্না—তার পেশাগত জীবনের এক অনন্য প্রাপ্তি।

তিনি অসুস্থ শরীরেও ড্রাফটিং ও শুনানিতে সহযোগিতার জন্য অ্যাডভোকেট আরফান সুলতানাসহ সহকর্মী আইনজীবীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। পাশাপাশি অ্যাডভোকেট জাহিদ বেপারী, আব্দুস সামাদ, আবিদ হাসান, গাজী শহিদুজ্জামান, সুজন শেখ, তুহিন শেখ ও সবুজসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান।