ঢাকা, মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল): বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-এর জন্য স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান আবারও সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী-এর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার ১৮৫ পৃষ্ঠার এ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন।
রায়ে সরকারকে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব অনুযায়ী একটি স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় আদেশের তারিখ থেকে তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
রায়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধন, যা ২০১১ সালের সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধনী) আইন (আইন নং XIV, ২০১১)-এর ৩৯ ধারার মাধ্যমে করা হয়েছিল, তা সংবিধান পরিপন্থী (ultra vires) এবং বাতিল (void) ঘোষণা করা হলো।
সেই অনুযায়ী, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধন, যা ১৯৭৫ সালের সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইন (আইন নং II, ১৯৭৫)-এর ১৯ ধারার (ইংরেজি সংস্করণে ২০ ধারা) মাধ্যমে করা হয়েছিল, তাও সংবিধান পরিপন্থী এবং বাতিল ঘোষণা করা হলো।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী এসব ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত ছিল, যা সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে প্রয়োগ করা হতো। তবে হাইকোর্ট রায়ে এই বিধানকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে ঘোষণা করেছেন।
রায়ে বলা হয়, উপরোক্তভাবে ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনসমূহ সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হওয়ায় এবং ৮ম ও ১৬তম সংশোধনী মামলার সিদ্ধান্ত অনুসারে, বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে যে ১১৬ অনুচ্ছেদ ছিল, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত ও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত (revived and restored) হলো।
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ নিম্নরূপে পুনঃস্থাপন করা হলো—
১১৬। বিচার বিভাগীয় সার্ভিসে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং বিচারিক কার্য সম্পাদনকারী ম্যাজিস্ট্রেটদের উপর নিয়ন্ত্রণ (পদায়ন, পদোন্নতি ও ছুটি মঞ্জুর করার ক্ষমতাসহ) ও শৃঙ্খলা সুপ্রিম কোর্টের নিকট ন্যস্ত থাকবে।
একইসঙ্গে রায়ে বলা হয়, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা, ২০১৭ সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হলো, কারণ এটি পুনঃস্থাপিত ১১৬ অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং Masdar Hossain মামলার (৫২ DLR (AD) ৮২) মাধ্যমে নির্ধারিত বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নির্দেশনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
আরও পড়ুন : অধস্তন আদালতে পোশাকবিধি শিথিল, গাউন পরা বাধ্যতামূলক নয়
রিটের পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, এই রায়ের ফলে নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের উপর ন্যস্ত থাকবে; রাষ্ট্রপতির উপর নয়। আদালত পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন পূর্ণাঙ্গ রায়ে।
রায়ে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করেছেন হাইকোর্ট। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুসার, বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগে দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান, ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃংঙ্খলাবিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে।
এর আগে বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাদ্দাম হোসেনসহ সাত আইনজীবী রিট করেন।
প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট ওই বছরের ২৭ অক্টোবর রুল দেন। রুলে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং এ-সংক্রান্ত ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।
একই সঙ্গে বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় কেন প্রতিষ্ঠা করা হবে না, তা–ও জানতে চাওয়া হয় রুলে। আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।
রুলের শুনানি শেষে আদালত রায় ঘোষণা করেন।

