অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপ দেওয়ার ধারাবাহিকতায় ১৪টি অধ্যাদেশের বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। একই সঙ্গে আরও দুটি অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরের জন্য বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দশম দিন মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দিনব্যাপী অধিবেশনে মোট ১৬টি বিল উত্থাপন করেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা। এর মধ্যে ১৪টি বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়।
সংসদের বিশেষ কমিটি আগেই সুপারিশ করেছিল, অধ্যাদেশগুলো হুবহু পাস করা হোক। ফলে এসব বিলের ওপর কোনো দফাওয়ারি সংশোধনী প্রস্তাব না থাকায় সংসদে আলোচনা ছাড়াই সরাসরি কণ্ঠভোটে বিলগুলো পাস করা হয়।
সকালে পাস হওয়া বিলসমূহ
সকালের অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ৮টি অধ্যাদেশের বিল পাস করা হয় এবং একটি বিল উত্থাপন করা হয়।
পাস হওয়া বিলগুলো হলো:
- ‘হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ বিল’
- কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (সংশোধন) বিল
- সিভিল কোর্টস (সংশোধন) বিল
- ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল
- রেজিস্ট্রেশন (সংশোধন) বিল
- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল
- শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল
- বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট (সংশোধন) বিল
উল্লেখ্য, ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) বিল’ সংসদে উত্থাপন করা হলেও সেটি তাৎক্ষণিকভাবে পাস না করে পরবর্তী আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার মধ্যে বিতর্ক
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল। বিলটি পাসের প্রস্তাব করতে গিয়ে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, এই আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় ‘গুম’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, যারা মনে করছেন সরকার গুমকে বৈধতা দিতে চায়, তাদের উচিত আইনটি ভালোভাবে পর্যালোচনা করা।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, “বর্তমান সরকার গুমের বিচারে বদ্ধপরিকর, আর এই আইনের মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটেছে।”
বিলটি পাস হওয়ার পর পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেন বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, বিল পাসের সময় আইনমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল এবং নির্দিষ্ট সময়েই এ ধরনের বিষয়ে আলোচনা হওয়া উচিত।
জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, গুমের বিচার নিয়ে সরকারের অবস্থান নিয়ে বাইরে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় বিষয়টি পরিষ্কার করার প্রয়োজন ছিল।
এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সংসদের আলোচনা সংসদ সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। আইনবিধি অনুযায়ী যেটা গৃহীত হবে, সেটার ওপরই কার্যক্রম চলবে।”
এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কয়েকটি সংশোধনী বিলও পাস করা হয়, যেগুলোর বেশিরভাগই নাম পরিবর্তন সংক্রান্ত অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়ার জন্য আনা হয়েছিল।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে তিনটি বিল উত্থাপন করেন। এগুলো হলো:
- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল
- শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল
- বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট (সংশোধন) বিল
দ্বিতীয় বিলটি উত্থাপনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হালকা রসিকতা করে বলেন, “খুব দুঃখের ব্যাপার, এতক্ষণ যা বললাম, এখন আবার শেখ হাসিনা বলতে হচ্ছে!”
পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট (সংশোধন) বিল’ পাসের প্রস্তাব করলে সেটিও কণ্ঠভোটে পাস হয়।
বিকালে ও রাতে পাস হওয়া বিলসমূহ
বিকালের অধিবেশনে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করা হয়। এগুলো হলো:
- ‘নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) আইন, ২০২৬’
- ‘নির্দিষ্টকরণ আইন, ২০২৬’
- ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) (রহিতকরণ) আইন, ২০২৬’
- ‘বঙ্গবন্ধু দারিদ্র্য বিমোচন ও পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (সংশোধন) আইন, ২০২৬’
- ‘শেখ রাসেল পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, রংপুর (সংশোধন) আইন, ২০২৬’
- ‘বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬’
পরে রাতের অধিবেশনেও আরও ৬টি বিল পাস করা হয়, ফলে মোট পাস হওয়া বিলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪টি।
এ ছাড়া ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন)’ সম্পর্কিত একটি বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে দুই দিনের অধিবেশনেও আরও ৯টি বিল পাস করা হয়েছিল।

