সিরাজ প্রামাণিক : সাধারণত ফৌজদারি মামলায় নালিশী দরখাস্ত সংশোধনের সরাসরি কোনো বিধান নেই। কিন্তু চেকের মামলাগুলো অনেকটা দেওয়ানি প্রকৃতির হওয়ায় বিচারিক প্রয়োজনে মামলার যেকোনো পর্যায়ে আরজি সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। যেমন—লিগ্যাল নোটিশ বা আরজিতে অনেক সময় চেকে উল্লেখিত টাকার পরিমাণ, তারিখ, চেকের নম্বর কিংবা ব্যাংকের নাম লিখতে গিয়ে করণিক ভুল হতে পারে।
যেহেতু এই মামলাগুলো সুনির্দিষ্ট টেকনিক্যাল বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাই ছোটখাটো ভুলের কারণে অনেক সময় ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ অবস্থায় মামলার বিচার চলাকালে যেকোনো পর্যায়ে সংশোধনের আবেদন করা যেতে পারে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০২৫ সালে ‘বনসাল মিল্ক সিলিং সেন্টার বনাম রানা মিল্ক ফুড প্রাইভেট’ মামলায় স্পষ্ট রায় দিয়েছেন যে, ধারা ১৩৮-এর অভিযোগপত্র কগনিজেন্স হওয়ার পরও সংশোধন করা যাবে, যদি তাতে আসামির কোনো ক্ষতি না হয় এবং মামলার মূল চরিত্র পরিবর্তন না হয়। এই রায়টি বাংলাদেশের আদালতেও গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত জানিয়েছেন, বিচারক যদি মনে করেন ন্যায়বিচারের স্বার্থে নালিশী দরখাস্তের কোনো করণিক ভুল সংশোধন করা প্রয়োজন, তবে তিনি তা মঞ্জুর করতে পারেন। এখানে আদালতের সহজাত ক্ষমতা প্রয়োগ করে আরজি সংশোধনের বিষয়টি বলা হয়েছে। আরজি সংশোধন করা হলে তা আসামিপক্ষকে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না বা বিচারে বিঘ্ন সৃষ্টি করবে না—রায়ে সে বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন : পাহাড়ে নারী নেতৃত্বের বাস্তবতা: জাতিসত্তা, রাজনীতি ও অন্তর্দ্বন্দ্ব
মোঃ শফিক বনাম মেজর একেএম আকতারুজ্জামান (অবসরপ্রাপ্ত), ক্রিমিনাল মিস কেস নং ১১৭৬৯/২০০৯ (আনরিপোর্টেড) মামলায় হাইকোর্ট বিভাগের একটি ডিভিশন বেঞ্চ ০৮-০৭-২০০৯ তারিখে মন্তব্য করেন, ১৩৮ ধারার নালিশী দরখাস্ত সংশোধন করা যায়।
অন্যদিকে, এন.আই. অ্যাক্টের ১৪০(১) ধারার বিধান অনুসরণ করে যখন কোনো কোম্পানিকে ১৩৮ ধারার মামলায় পক্ষ করা হয় না, সে ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগ নালিশী দরখাস্ত সংশোধন করে কোম্পানিকে পক্ষভুক্ত করার নির্দেশ দেন। আনরিপোর্টেড ফৌজদারি বিবিধ মামলা নং ৭৫১৭/২০০৩-এ হাইকোর্ট বিভাগের একটি ডিভিশন বেঞ্চ কোয়াশমেন্ট প্রসিডিং নিষ্পত্তি করতে গিয়ে উপরোক্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করেন।
সংশোধনী দরখাস্তের একটি নমুনা হতে পারে এভাবে—
বর্তমান মামলাটি মাননীয় আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সম্প্রতি বাদীপক্ষে নিয়োজিত বিজ্ঞ আইনজীবীর গোচরীভূত হয়েছে যে, এই মামলায় ভুলক্রমে ‘আনোয়ার এন্টারপ্রাইজ’-এর নাম আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বর্ণিত আনোয়ার এন্টারপ্রাইজের পক্ষে তার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে রাব্বি নালিশী চেকটি বাদীর অনুকূলে ইস্যু করেছেন। অতএব, অত্র মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের স্বার্থে উক্ত আনোয়ার এন্টারপ্রাইজকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সে কারণে সূত্রে বর্ণিত নালিশী মামলার দরখাস্ত সংশোধন করা একান্ত আবশ্যক।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, এন.আই. অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলার নালিশী আরজি সংশোধন কোনোভাবেই নিষিদ্ধ নয়। ভারত ও বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের নজিরে প্রতীয়মান হয় যে, করণিক ভুল বা টাইপিং মিসটেক সংশোধনের আবেদন মঞ্জুর করা আদালতের বিবেচনামূলক ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। তাই মামলার বাদী যদি আরজিতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংযোজন বা সংশোধন করতে চান, তবে তিনি আইনগতভাবেই সেই সুযোগ পেতে পারেন।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক, ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’। ই-মেইল: seraj.pramanik@gmail.com

