মো. মাহমুদুল হাসান : আগামীকাল ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, যেখানে দীর্ঘ ৩৬ বছর পর বিরোধী দল প্রার্থী দিতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের (এমপি) ভোট দেওয়ার বিধান রয়েছে। বাইরে থেকে দেখলে এটি একটি সাধারণ নির্বাচন মনে হলেও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো সংসদ সদস্য নিজের দলের রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রপতি প্রার্থীকে ভোট দিলে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হবে কি না, এ প্রশ্ন সরাসরি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা “votes in Parliament against that party” অর্থাৎ সংসদে নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন সামনে আসে, “রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো সংসদ সদস্য দল-সমর্থিত প্রার্থীর পরিবর্তে অন্য প্রার্থীকে ভোট দিলে সেটিকে কি দলের বিরুদ্ধে ভোট হিসেবে গণ্য হবে?”
এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে, সংসদ সদস্যরা সংবিধানের অধীনে সব সময় একই ধরনের কাজ করেন না। সংসদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন। সংবিধানের ৬৫(১) অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। কিন্তু সংবিধান সংসদ সদস্যদের ওপর আইন প্রণয়নের বাইরেও কিছু বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন। তবে এই নির্বাচন সংসদের সাধারণ আইন প্রণয়নমূলক কাজ-এর অংশ নয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ধারা ১০ অনুযায়ী প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি ভোট রয়েছে এবং রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে নির্বাচিত হন।
এখানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ নির্বাচনের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো দলীয় প্রতীক থাকে না এবং কোনো রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে “দলীয় প্রার্থী” হিসেবে কাউকে মনোনয়ন দেয়—এমন ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে নেই। একজন সংসদ সদস্য একজন প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেন এবং আরেকজন সংসদ সদস্য সেই প্রস্তাব সমর্থন করেন। একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হলে তাঁদের নাম ঘোষণা করে ভোট গ্রহণ করা হয়।
ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো সংসদ সদস্য একজন প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে অন্য প্রার্থীকে ভোট দিলে সেটিকে সরাসরি “দলের বিরুদ্ধে ভোট” বলা কতটা যুক্তি সঙ্গত—সেখানেই অনুচ্ছেদ ৭০-এর মূল প্রশ্নটি তৈরি হয়। কোনো রাজনৈতিক দল কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করতে পারে, সংসদ সদস্যদের তাঁর পক্ষে ভোট দেওয়ার রাজনৈতিক নির্দেশও দিতে পারে, কিন্তু সেই রাজনৈতিক সমর্থন নিজে থেকে প্রার্থীকে আইনগত অর্থে “দলীয় মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী” বানায় না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এ একে প্রকাশ্য ভোট বলা হলেও এটি সাধারণ অর্থে সবার সামনে হাত তুলে ভোট দেওয়ার মতো নয়। ব্যালটের সঙ্গে ভোটারের পরিচয় শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু ভোট গণনার উদ্দেশ্য হলো প্রত্যেক প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন তা নির্ধারণ করা; কোন সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন—সেই তালিকা প্রকাশ করা নয়।
আবদুস সামাদ আজাদ মামলায় হাইকোর্টও উল্লেখ করেছে, নির্বাচন কমিশনকে কোনো রাজনৈতিক দল বা দলীয় নেতা বা অন্য সংসদ সদস্যের কাছে নির্দিষ্ট ভোটারের ব্যালট প্রকাশ করতে বাধ্য করার কোনো বিধান নেই। অর্থাৎ কোনো সংসদ সদস্য দল-সমর্থিত প্রার্থীর পরিবর্তে অন্য প্রার্থীকে ভোট দিলেও তিনি নিজে তা প্রকাশ না করলে অন্যরা নিশ্চিতভাবে জানতে পারবেন না তিনি কাকে ভোট দিয়েছেন। এই ব্যবস্থাটিই ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্যদের একাংশের আপত্তির অন্যতম বিষয় ছিল।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর উন্মুক্ত ব্যালট ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে আওয়ামী লীগের আবদুস সামাদ আজাদসহ ছয়জন সংসদ সদস্য হাইকোর্টে রিট করেন। একই বিষয়ে জাতীয় পার্টির মওদুদ আহমদও পৃথক রিট করেছিলেন। রিটকারীদের পক্ষে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম যুক্তি দেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের ওপর দলীয় অবস্থানের বাইরে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে একটি সাংবিধানিক বিধিনিষেধ তৈরি করেছে। তার ওপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রকাশ্য ভোটের ব্যবস্থা করলে সংসদ সদস্যদের ওপর আরও একটি self-restriction তৈরি হবে এবং তা তাঁদের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
হাইকোর্ট ডিভিশন শেষ পর্যন্ত রিটগুলো খারিজ করেন। তবে মামলাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংসদের আইন প্রণয়নমূলক কাজ সম্পর্কে আদালতের পর্যবেক্ষণ। আবদুস সামাদ আজাদ ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ ও অন্যান্য, ৪৪ ডিএলআর (HCD) ৩৫৪ (১৯৯২) মামলায় আদালত বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদের আইন প্রণয়নমূলক কাজ নয়। একইভাবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনও আইন প্রণয়নমূলক কাজ নয়। এগুলো সংসদ সদস্যদের ওপর সংবিধান কর্তৃক অর্পিত নির্দিষ্ট কার্যাবলী এবং দায়িত্ব, যা তাঁদের আইন প্রণয়নমূলক কাজ-এর অতিরিক্ত।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদের কঠোর প্রয়োগের সতর্কবার্তা এটিই স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চায় দলের ভেতরের শৃঙ্খলার নামে সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে খানিকটা দমিয়ে রাখা হয়েছে। নির্বাচন হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে জনপ্রতিনিধিদের নিজস্ব কোনো কণ্ঠস্বর নেই। এই পর্যবেক্ষণ অনুচ্ছেদ ৭০-এর বর্তমান বিতর্কে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট”। আদালতের ভাষায় অনুচ্ছেদ ৭০-এর বিধিনিষেধ মূলত সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে দলীয় ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।
একই রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, ওই মামলায় অনুচ্ছেদ ৭০-এর বিধিনিষেধ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে extend করার প্রশ্নটি আদালতের বিবেচ্য ছিল না, মামলার মূল প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনের উন্মুক্ত ব্যালট ব্যবস্থা সাংবিধানিক কি না। অন্যদিকে জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতিমূলক বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো সংসদ সদস্য ভোট দিতে পারবেন না। দিলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হয়। আবদুস সামাদ আজাদ মামলাটি সরাসরি বলেনি যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অনুচ্ছেদ ৭০ প্রযোজ্য নয়। কিন্তু আদালত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সংসদের আইন প্রণয়নমূলক কাজ-এর বাইরে একটি পৃথক সাংবিধানিক কার্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটকে সাধারণ আইন প্রণয়নমূলক ভোটদান-এর সঙ্গে এক করে অনুচ্ছেদ ৭০ প্রয়োগ করা যাবে কি না—এ নিয়ে একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়।
অবশ্য এর বিপরীত যুক্তিও রয়েছে। যারা মনে করেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অনুচ্ছেদ ৭০ প্রযোজ্য হবে, তাঁদের বক্তব্য হলো—সংসদ সদস্যরা একটি রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন। কোনো দল যদি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নির্দিষ্ট একজন প্রার্থীকে সমর্থন করে এবং সংসদ সদস্যদের সেই প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার নির্দেশ দেয়, তাহলে সেই নির্দেশ অমান্য করে অন্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়া কার্যত দলের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরুদ্ধে যাওয়া। তাঁদের মতে, অনুচ্ছেদ ৭০-এর মূল উদ্দেশ্যই হলো সংসদ সদস্যদের দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে রাখা।
এই যুক্তিকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা যায় না। বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় দলীয় শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজেট, আইন প্রণয়ন, আস্থা-অনাস্থা কিংবা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির ওপর ভোটের ক্ষেত্রে দলীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদীয় সরকারের স্থিতিশীলতা সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে। অনুচ্ছেদ ৭০ সেই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সাংবিধানিক অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে কোনো বিল পাস হচ্ছে না, কোনো বাজেট অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান হচ্ছে না এবং সরকারের আস্থা-অনাস্থার প্রশ্নও নেই। একজন সংসদ সদস্য অন্য প্রার্থীকে ভোট দিলে সংসদের আইন প্রণয়ন বা সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরাসরি পরিবর্তিত হয় না। তিনি মূলত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন।
আরও একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াটি নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সংবিধানের অধীনে নির্বাচন কমিশনের ওপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ সেই প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিধান দিয়েছে। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটাভুটিকে সংসদের কোনো বিল-এর ওপর ভোটাভুটি বা অনাস্থা ভোটের সঙ্গে এক করা কঠিন। এমনকি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনও একই প্রক্রিয়ার নয়। সংবিধান নিজেই সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের সাংবিধানিক function-এর ব্যবস্থা করেছে এবং সেসব function-এর প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য এক নয়।
এখানে “ফ্লোর ক্রসিং” শব্দটিও কিছুটা সমস্যাজনক। সাধারণ অর্থে ফ্লোর ক্রসিং বলতে সংসদে নিজের দলের অবস্থানের বিপরীতে কোনো সংসদীয় বা আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত বিষয়-এ ভোট দেওয়াকে বোঝায়। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কোনো আইন প্রণয়নের প্রস্তাব-এর পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট নয়। এটি একটি পৃথক সাংবিধানিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভিন্ন প্রার্থীকে ভোট দেওয়াকে সরাসরি প্রচলিত অর্থে দলীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে ভোটদান হিসেবে চিহ্নিত করার আগে ৭০ অনুচ্ছেদ-এর সাংবিধানিক পরিধি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—তাহলে কি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্য সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে যেকোনো প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন?
আমার মতে, হ্যাঁ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শুধু দলীয় নির্দেশ অমান্য করে অন্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার কারণে অনুচ্ছেদ ৭০-এর অধীনে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে না।
এর প্রধান কারণ তিনটি। প্রথমত, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদের আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত কার্যাবলি নয়; এটি সংসদ সদস্যদের ওপর সংবিধান অর্পিত একটি পৃথক “সাংবিধানিক কার্যাবলি”। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আইনগত অর্থে কোনো “দলীয় মনোনীত প্রার্থী” নেই—প্রার্থী হন সংসদ সদস্যের প্রস্তাব ও সমর্থনের মাধ্যমে। তৃতীয়ত, অনুচ্ছেদ ৭০-এর ভাষা “সংসদে দলীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে ভোট প্রদান”; রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো পৃথক সাংবিধানিক নির্বাচনী কার্যাবলি-কে এই ভাষার মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করার স্পষ্ট ভিত্তি নেই।
তবে এটিও সত্য যে, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরাসরি “আপিল আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত” নেই। আবদুস সামাদ আজাদ মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি অনুচ্ছেদ ৭০-এর প্রয়োগ সরাসরি নির্ধারণ করেনি। বরং আদালত বিষয়টি ওই মামলার পরিধি-এর বাইরে রেখেছিল। তাই ভবিষ্যতে এই প্রশ্ন সরাসরি আদালতের সামনে এলে চূড়ান্ত সাংবিধানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন মনে করলে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে রাষ্ট্রপতি কোনো গুরুত্বপূর্ণ “আইনগত প্রশ্ন” সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের “আইনগত পরামর্শমূলক মতামত” চাইতে পারেন।
সবশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সাধারণ সংসদীয় ভোটের সঙ্গে এক করে দেখা সাংবিধানিকভাবে সঠিক হবে না। অনুচ্ছেদ ৭০-এর মূল ক্ষেত্র হলো সংসদে দলীয় ভিত্তিতে পরিচালিত সংসদীয় ভোটদান, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন তার থেকে পৃথক একটি “সাংবিধানিক কার্যাবলি”। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্য নিজের বিবেচনায় অন্য কোনো প্রার্থীকে ভোট দিলে শুধু সেই কারণে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হবে না—এটাই বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো, অনুচ্ছেদ ৭০-এর ভাষা এবং “আবদুস সামাদ আজাদ” মামলার পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় অধিক গ্রহণযোগ্য মত। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কোনো দলের প্রার্থীকে জেতানোর সাধারণ সংসদীয় ভোট নয়, এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান নির্বাচন করার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যের ভোটকে কেবল দলীয় আনুগত্যের মাপকাঠিতে বিচার করলে সংবিধান তাঁকে যে পৃথক সাংবিধানিক দায়িত্ব দিয়েছে, তার স্বাতন্ত্র্যই হারিয়ে যায়।
লেখক: মো. মাহমুদুল হাসান, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ফেনী ইউনিভার্সিটি।

