সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়

শিশুর হেফাজত নিয়ে পারিবারিক আদালতের ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকলে হেবিয়াস করপাস রিট নয়

শিশুর হেফাজত বা জিম্মা নিয়ে পারিবারিক আদালতের ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকলে হেবিয়াস করপাস রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

শিশুর হেফাজত নিয়ে গর্ভধারিণী মায়ের করা হেবিয়াস করপাস রিটে জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই এ রায় দেন।

‘রোজিনা আক্তার বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় হাইকোর্ট এ রায় দিয়েছেন।

আদালতে রিটের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন ও আইনজীবী প্রিন্স আল মাসুদ। বিবাদীদের (মামলা চলাকালীন শিশুটি যাদের হেফাজতে ছিলেন বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক সেই স্বামী ও স্ত্রী) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ফৌজিয়া করিম ফিরোজ ও আইনজীবী কাজী মারুফুল আলম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. গোলাম রহমান ও নূর মোহাম্মদ আজমী। ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. লুৎফর রহমান।

আদালতের ২১ পৃষ্ঠার ওই রায়ের মূল অনুলিপি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এ মামলার মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি কাজী জিনাত হক।

মামলার পটভূমি

প্রকাশিত রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, সাভারের হেমায়েতপুরের একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন ভোলার বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন ও রোজিনা আক্তার দম্পতি। তাদের প্রথম সন্তান জন্মের পরপরই মারা যায়। এরপর ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সাভারের নারী-শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিজারিয়ানের মাধ্যমে আরেকটি ছেলেসন্তানের (বাসমিন আবরাব) জন্ম হয়।

এর দুদিন পর মা ও শিশুকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। বাড়ি ফেরার পর অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে ১৭ জুলাই সাভারের সুপার মেডিকেল হাসপাতাল (প্রা.) লিমিটেডের এনআইসিইউতে শিশুটিকে ভর্তি করা হয়। একই দিনে শিশুটির উন্নত চিকিৎসার জন্য মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রেফার করা হয়।

কিন্তু আর্থিক অনটন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও লকডাউন পরিস্থিতির কারণে জসিম উদ্দিন সঙ্গে সঙ্গে শিশুটিকে ওই হাসপাতালে নিতে পারেননি। পরে ১৯ জুলাই তিনি শিশুটিকে ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করান।

সেই হাসপাতালে শিশুটিকে আইসিইউ (এনআইসিইউ) ও লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন রাখা হয়। ঠিক সেই সময়ে দেশজুড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, সহিংসতা ও কারফিউ-লকডাউন পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।

এরপর জসিম উদ্দিন ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি ফি বাবদ ৩ হাজার টাকা, অগ্রিম ১০ হাজার টাকা এবং বকেয়া বিল বাবদ ২৩ হাজার ১৩৮ টাকাসহ মোট ৩৬ হাজার ১৩৮ টাকা জমা দেন।

রিটকারীর দাবি

রিটকারীর দাবি, অভাব-অনটনের মধ্যে হাসপাতাল ফি বাবদ ৩৬ হাজার ১৩৮ টাকা জমা দেওয়ার পর চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভয়াবহ সংঘাতময় পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার তাগিদে এবং অর্থের সংস্থান করতে পিতা-মাতা সাময়িকভাবে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট শিশুটির পিতা-মাতা হাসপাতালে গেলে কর্তৃপক্ষ আনুমানিক ৮ থেকে ৯ লাখ টাকার মোটা অঙ্কের বিল দাবি করে। এ কথা জানতে পেরে এই দম্পতি গ্রামে, অর্থাৎ ভোলা জেলায় ফিরে গিয়ে পিতা-মাতার পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থের সংস্থান করার চেষ্টা চালান।

এভাবে কয়েক মাস চলে যায়। এরপর ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল ভোলা থানা থেকে ফোন করা হলে ১৬ এপ্রিল তারা ভোলা থানায় গিয়ে জানতে পারেন, তাদের শিশু সম্পর্কে ২০২৪ সালের ২২ জুলাই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। তাদের একটি জিডির কপিও সরবরাহ করা হয়।

পরবর্তীতে তারা জানতে পারেন, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শিশুটিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন আজিমপুর ‘ছোটমণি নিবাসে’ হস্তান্তর করা হয়েছে।

পরে ছোটমণি নিবাস থেকে শিশুটিকে পেতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক এক দম্পতি ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ওই দম্পতি একতরফাভাবে শিশুটির অভিভাবকত্ব, জিম্মা এবং পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য ডিক্রি পান।

ওই সময়ে চেষ্টা করেও জসিম-রোজিনা দম্পতি শিশুটির সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাননি। এরপর শিশুটিকে দেশের বাইরে, অর্থাৎ বাংলাদেশের আদালতের এখতিয়ারের বাইরে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে শিশুটির গর্ভধারিণী মা রোজিনা আক্তার হেবিয়াস করপাস আইনে হাইকোর্টে রিট করেন।

ওই রিটের শুনানি নিয়ে আদালত শিশুটিকে গর্ভধারিণী মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হোক, এই মর্মে রুল জারি করেন।

বিবাদীদের বক্তব্য

এ মামলার বিবাদীরা সবাই ওই রুলের বিরোধিতা করেন। তাদের দাবি, শিশুটিকে প্রায় দুই মাস ধরে ঢাকার মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি রাখা হয়েছিল। প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতার অবস্থান নির্ণয় করতে ব্যর্থ হয়ে শিশুটিকে পরিত্যক্ত ও দুস্থ শিশুদের পরিচর্যা ও সুরক্ষার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসে হস্তান্তর করে।

যারা শিশুটিকে জিম্মায় নিতে চেয়েছেন তারা নিঃসন্তান দম্পতি। তারা বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য উভয় দেশেরই দ্বৈত নাগরিক। তারা পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, অর্থাৎ একটি উপযুক্ত পারিবারিক আদালত কর্তৃক ডিক্রির মাধ্যমে শিশুটির অভিভাবকত্ব ও শিশুটিকে জিম্মায় রাখার অধিকার অর্জন করেন।

রিটের বিবাদীরা আরও দাবি করেন, বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতা শিশুটিকে পরিত্যাগ করেছিলেন, যা তাদের আচরণ থেকেই স্পষ্ট। শিশুটি কয়েক দিন হাতিরঝিল থানায় ছিল, তা জানা সত্ত্বেও রিটকারী তাকে দেখার কোনো চেষ্টা করেননি। বিশেষ করে, তারা শিশুর অবস্থান সম্পর্কে কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) পর্যন্ত করেননি।

বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতা হওয়া সত্ত্বেও তারা ২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের পর থেকে শিশুটির সঙ্গে দেখা করেননি বা কোনো জিডিও করেননি, যা পরিত্যাগ করার শামিল। যা ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী জিম্মা পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্যতা হিসেবে গণ্য হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আইনজীবী যুক্তি দেন, শিশুটিকে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রিটকারীর স্বামী সংকটজনক অবস্থায় ভর্তি করেছিলেন এবং হাসপাতাল প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর অবিলম্বে শিশুটিকে লাইফ সাপোর্টে রাখে।

তিনি নিবেদন করেন, ভর্তির তারিখে রাত আনুমানিক ৮টা ৩০ মিনিটে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরামর্শের জন্য পিতাকে খোঁজ করে। কিন্তু তিনি উপস্থিত ছিলেন না। হাসপাতাল তখন ভর্তি ফর্মে দেওয়া যোগাযোগ নম্বরে ফোন করে। পিতা জানান, তার স্ত্রীও অসুস্থ থাকায় তিনি বাইরে আছেন এবং শিগগিরই ফিরে আসবেন বলে আশ্বাস দেন।

তবে বারবার ফোন করা সত্ত্বেও তিনি আর হাসপাতালে ফিরে আসেননি। বায়োলজিক্যাল মা-বাবার সন্ধান পেতে ব্যর্থ হয়ে এবং অন্য কোনো বিকল্প না পেয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাজধানীর তেজগাঁও থানায় ২০২৪ সালের ২২ জুলাই জিডি করে।

হাসপাতালের বিল বকেয়া থাকা সত্ত্বেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা চালিয়ে যায়। শিশুটি সুস্থ হয়ে উঠলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ১৮ সেপ্টেম্বর তারিখে আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসের ডেপুটি কেয়ারটেকারের উদ্দেশে লিখিত চিঠির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শিশুটিকে হস্তান্তর করে।

তিনি আরও দাবি করেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বকেয়া পরিশোধে চাপ না দিয়ে শিশুটিকে বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তারা শিশুটিকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান, যা ১৮ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

এসব কারণে রুলটি খারিজযোগ্য বলে আদালতে প্রার্থনা করেন হাসপাতালের আইনজীবী।

মামলার সব বিবাদী তাদের নিজ নিজ বক্তব্য ও হলফনামায় জোর দিয়ে বলেছেন এবং যুক্তি দিয়েছেন যে, শিশুটিকে তার বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতা পরিত্যাগ করেছেন।

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত ও পর্যবেক্ষণ

রিটকারী ও বিবাদীদের বক্তব্য এবং নথিপত্র পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট বলেন, পিতা-মাতা সন্তানকে স্বেচ্ছায় ‘পরিত্যাগ’ করেছিলেন নাকি রাজনৈতিক সংঘাত ও আর্থিক অনটনের কারণে বাধ্য হয়ে সাময়িকভাবে স্থান ত্যাগ করেছিলেন, এটি একটি জটিল প্রশ্ন।

দেওয়ানি ও সাংবিধানিক আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, রিট এখতিয়ারের সংক্ষিপ্ত শুনানির ভিত্তিতে এমন বিতর্কিত তথ্যের সত্যাসত্য নিরূপণ করা সম্ভব নয় বলে পর্যবেক্ষণ করেন আদালত।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট আরও বলেন, পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ২৩ ধারা অনুযায়ী পারিবারিক আদালতের নির্দেশ বা ডিক্রির বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে স্পষ্ট আপিলের বিধান রয়েছে।

যেখানে বিশেষায়িত আইন ও আপিল ফোরাম বিদ্যমান, সেখানে সরাসরি হাইকোর্টের রিট এখতিয়ার প্রয়োগ করা অনুচিত বলেও উল্লেখ করেন আদালত।

তাই হাইকোর্ট বিভাগ সার্বিক আইনি পর্যালোচনা শেষে রিট আবেদনটির রুল খারিজ করে চূড়ান্ত রায় দেন। একই সঙ্গে আগে দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বাতিল করেন।

তবে গর্ভধারিণী মায়ের আইনি অধিকার সুরক্ষায় আদালত স্পষ্ট করে দেন যে, রিটকারী গর্ভধারিণী মা তার সন্তানের জিম্মা ও অভিভাবকত্ব পাওয়ার জন্য উপযুক্ত বিচারিক ফোরামে, অর্থাৎ আইনসম্মত এখতিয়ারসম্পন্ন দেওয়ানি বা পারিবারিক আদালতে আইনি প্রতিকার চাইতে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও মুক্ত থাকবেন।

একই সঙ্গে এ রায়ের অনুলিপি অবিলম্বে সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।