মুসলিম বিবাহের নিকাহনামা বা কাবিননামায় বর ও কনে উভয়েরই পূর্ববর্তী বিয়ে, চলমান বৈবাহিক অবস্থা, বিবাহবিচ্ছেদের তথ্য এবং পূর্বের সংসারের সন্তানসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ বিবরণ অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে সরকারকে আইনি নোটিশ (Legal Notice) পাঠানো হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব এবং নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শককে (আইজিআর) রেজিস্ট্রি ডাকযোগে এই নোটিশ প্রেরণ করেন।
আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে প্রচলিত ‘মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯’-এর অধীনে ব্যবহৃত ফরম নম্বর ১৬০১ বা ‘ঘ’ ফরমের (কাবিননামা) বিদ্যমান তথ্য বিন্যাস অত্যন্ত অসম্পূর্ণ ও অসমতাপূর্ণ। এই ফরমে বর বা কনের পূর্ববর্তী বিয়ে, সাবেক স্বামী বা স্ত্রীর পূর্ণ পরিচয়, পূর্বের বিয়ে ও তালাক নিবন্ধনের রেজিস্ট্রি নম্বর, বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার সঠিক তারিখ, আদালতে চলমান বৈবাহিক মামলা কিংবা বিদ্যমান সন্তানদের বিস্তারিত তথ্য স্পষ্টভাবে যাচাই ও লিপিবদ্ধ করার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই।
এর ফলে অসাধু ব্যক্তিবর্গ সহজেই তাঁদের পূর্বের একাধিক বিয়ে, গোপন বৈবাহিক সম্পর্ক, অনিবন্ধিত তালাক এবং সন্তানদের অভিভাবকত্ব বা ভরণপোষণের আইনি দায় গোপন রেখে নতুন করে বিয়েতে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে অপর পক্ষ মারাত্মক প্রতারণার শিকার হচ্ছেন এবং নতুন জীবনসঙ্গীর সত্য জানার অধিকার ও স্বাধীন সিদ্ধান্তের সুযোগ ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
নোটিশে উল্লিখিত মূল দাবিসমূহ:
-
বিয়ের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস: কাবিননামার নির্দিষ্ট ঘরে বর ও কনে উভয়েরই পূর্ববর্তী এবং বিদ্যমান সকল বিয়ের তারিখ, স্থান, রেজিস্ট্রি নম্বর, সাবেক স্বামী/স্ত্রীর পূর্ণ পরিচয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
-
তালাক ও আইনি নথিপত্র: তালাক কার্যকর হওয়ার মাধ্যম, কার্যকর হওয়ার তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বা আদালতের দলিলের কপি সংযোজন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
-
সন্তান ও ভরণপোষণ: বিদ্যমান সন্তানের সংখ্যা, বয়স এবং তাদের ভরণপোষণ বা অভিভাবকত্বসংক্রান্ত চলমান কোনো আইনগত দায়বদ্ধতা রয়েছে কি না—সে বিষয়ে কাবিননামায় স্পষ্ট ঘোষণার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
-
সালিশ পরিষদের অনুমতি: বিদ্যমান স্ত্রী থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বা পরবর্তী বিয়ের ক্ষেত্রে ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১’-এর ৬ ধারা অনুযায়ী গঠিত সালিশ পরিষদের লিখিত অনুমতির নম্বর ও তারিখ কাবিননামায় উল্লেখ বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়েছে।
-
তথ্য যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা: জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পাসপোর্ট, জন্মসনদ, তালাকনামা কিংবা মৃত্যুসনদ যাচাইয়ের স্পষ্ট দায়িত্ব কাজী বা নিবন্ধকদের ওপর অর্পণ করতে হবে।
নোটিশে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর দেওয়া হাইকোর্টের এক রায়ের কথা উল্লেখ করে আইনজীবী জানান, ওই রায়ে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলকভাবে ডিজিটাল করা এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে মূল কাবিননামার ফরমে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের নির্দিষ্ট ঘর না থাকলে ডিজিটাল সিস্টেমেও কেবল অসম্পূর্ণ তথ্যই থেকে যাবে। তাই ডিজিটালাইজেশন সফল করতে ফরম সংশোধন এবং নিবন্ধকের ওপর তথ্য যাচাইয়ের আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করা অপরিহার্য।
অসম্পূর্ণ কাবিননামার কারণে প্রতিনিয়ত পারিবারিক জীবন ও দাম্পত্য সম্পর্কে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা সংবিধানসম্মত মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পরিপন্থী বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

