রাজীব কুমার দেব
প্রতীকী ছবি

দেওয়ানি মোকদ্দমায় জেরার পরিধি ও প্রাসঙ্গিকতার কয়েকটি নীতি

রাজীব কুমার দেব : দেওয়ানি মোকদ্দমায় সাক্ষীকে জেরা করা বিচারিক কার্যক্রমের একটি অপরিহার্য অংশ। একজন আইনজীবীর প্রকৃত আইনি দক্ষতা, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার অন্যতম বাস্তব প্রকাশ ঘটে তাঁর জেরার কৌশল ও প্রশ্নের বিন্যাসে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাস্তব চর্চায় অনেক সময় জেরার পরিধি ও প্রাসঙ্গিকতার সীমা অতিক্রম করে এমন সব প্রশ্ন করা হয়, যেগুলোর সঙ্গে পক্ষদ্বয়ের প্রকৃত বিরোধ নিষ্পত্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সম্পর্কই থাকে না। অথচ দিনের পর দিন, বছরের পর বছর আইনি সমাজকে এমন অপ্রাসঙ্গিক জেরায় মূল্যবান সময় ব্যয় করতে দেখা যায়।

জেরার পরিধি কতটা অপ্রাসঙ্গিক ও বেপরোয়া পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, তা একটি মামলার রায় প্রস্তুতের সময় বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়। কারণ তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষীকে করা অসংখ্য প্রশ্নের কতগুলো আসলে মামলার প্রকৃত ইস্যু নির্ধারণ বা বিরোধ নিষ্পত্তিতে কোনো ভূমিকা রাখেনি।

সুন্দর জেরা মানে অধিক প্রশ্ন করা নয়; বরং প্রয়োজনীয়, প্রাসঙ্গিক ও উদ্দেশ্যপূর্ণ প্রশ্নের মাধ্যমে সাক্ষ্যের সত্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং মামলার প্রকৃত ইস্যু উদ্ঘাটন করা। তাই জেরার সার্থকতা তার দৈর্ঘ্যে নয়, বরং তার প্রাসঙ্গিকতা, নির্ভুলতা ও আইনি উদ্দেশ্য সাধনের সক্ষমতায়।

দেওয়ানি মোকদ্দমায় জেরার পরিধি ও প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক নীতি বিশেষভাবে বিবেচনাযোগ্য। জেরার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মামলার প্রকৃত ইস্যু, সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং পক্ষদ্বয়ের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় উদ্ঘাটন করা; নিছক সময়ক্ষেপণ বা ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত বিষয় পুনরাবৃত্তি করা নয়।

প্রথমত: Admitted Fact-এর ওপর জেরা যে বিষয় কোনো পক্ষ কর্তৃক স্পষ্টভাবে admitted হয়েছে, সাধারণত সেই admitted fact নিয়ে জেরা করার প্রয়োজন নেই। কারণ admission-এর ফলে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি যখন আর প্রকৃত বিরোধের অংশ থাকে না, তখন সেটিকে পুনরায় সাক্ষীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা জেরার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

দ্বিতীয়ত: Pleading ও Examination-in-Chief-এ স্পষ্ট বিষয় পুনরায় জেরা কোনো বিষয়ের উত্তর যদি ইতোমধ্যে pleadings এবং সাক্ষীর examination-in-chief-এ সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান থাকে, তাহলে একই বিষয় নিয়ে দীর্ঘ, পুনরাবৃত্তিমূলক বা অপ্রাসঙ্গিক জেরা করার যৌক্তিকতা সীমিত। জেরার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ওই বক্তব্যের কোনো অসঙ্গতি, দুর্বলতা, অবিশ্বাসযোগ্যতা বা মামলার ইস্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো গুরুত্বপূর্ণ দিক পরীক্ষা করা।

তৃতীয়ত: Admitted document নিয়ে অপ্রয়োজনীয় জেরা কোনো দলিল কোনো পক্ষ কর্তৃক admitted হলে, সেই দলিলের অস্তিত্ব বা ইতোমধ্যে স্বীকৃত বিষয় নিয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সাক্ষীকে জেরা করা উচিত নয়। বিশেষত যখন দলিলটির কোনো নির্দিষ্ট দিক নিয়ে আর বিরোধ নেই, তখন সাক্ষীর মাধ্যমে একই বিষয় পুনরায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বিচারিক সময়ের অপচয় ঘটাতে পারে।

চতুর্থত: দলিলের বিষয়বস্তু সাক্ষীর মুখ দিয়ে পুনরাবৃত্তি করানো দলিলটি admitted হোক বা disputed—শুধুমাত্র সাক্ষীকে দিয়ে দলিলের লিখিত বিষয়বস্তু মুখস্থের মতো পুনরায় বলিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে জেরা করা সাধারণত অর্থবহ নয়। যেমন—“দলিলের নম্বর কত?”, “দলিলের তফসিল কী?”, “চৌহদ্দি কী?”, “দাতা ও গ্রহীতার নাম কী?”—ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর যদি সরাসরি দলিল থেকেই নির্ধারণ করা যায়, তাহলে কেবল সাক্ষীর স্মৃতি যাচাইয়ের অজুহাতে এসব বিষয়ে দীর্ঘ জেরা করার প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। Evidence Act-এর Sections 91 ও 92-এর নীতিকে Sections 83 বা 5-এর সঙ্গে সরলভাবে এক করে দেখা সমীচীন নয়। কোনো দলিলের বিষয়বস্তু সম্পর্কে মৌখিক সাক্ষ্য কখন, কতটুকু এবং কোন পরিস্থিতিতে exclusionary rule-এর আওতায় পড়বে, তা নির্ধারণ করতে হবে সংশ্লিষ্ট pleadings, admitted facts, documentary evidence এবং আইনে স্বীকৃত প্রযোজ্য ব্যতিক্রমসমূহ বিবেচনা করে।

পঞ্চমত: সম্পর্কহীন বিষয়ে জেরা পরিহার বিরোধীয় বিষয় (fact in issue) অথবা প্রাসঙ্গিক ঘটনা (relevant fact)-এর সঙ্গে সম্পর্কহীন বিষয়ে জেরা করা উচিত নয়। জেরার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সাক্ষীর বক্তব্যের সত্যতা, নির্ভরযোগ্যতা, পক্ষপাত, পূর্ববর্তী অসঙ্গতি এবং মামলার প্রাসঙ্গিক বিষয় পরীক্ষা করা—অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে সাক্ষীকে দীর্ঘ সময় ব্যস্ত রাখা নয়।

বিজ্ঞ বিচারিক আদালত যদি relevancy, materiality এবং admissibility-এর সীমারেখা কঠোরভাবে অনুসরণ করে জেরা গ্রহণ করেন, তাহলে জেরার সময় স্বাভাবিকভাবেই অনেক কমে আসবে। তখন অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নের দীর্ঘ সিরিজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। কারণ জেরার শক্তি প্রশ্নের সংখ্যায় নয়, প্রশ্নের প্রাসঙ্গিকতা ও আইনগত উদ্দেশ্যপূর্ণতায়।

অতএব, জেরার সার্থকতা তার দৈর্ঘ্যে নয়, তার প্রাসঙ্গিকতায়। একটি প্রশ্ন তখনই মূল্যবান, যখন তার উত্তরের মাধ্যমে মামলার কোনো material issue, সাক্ষ্যের credibility, contradiction, inconsistency অথবা পক্ষের দাবির সত্যতা নির্ণয়ে বাস্তবিক কোনো সহায়তা পাওয়া যায়। অন্যথায় দীর্ঘ জেরা বিচারিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে কেবল মামলার নিষ্পত্তি বিলম্বিত করে।

লেখক: রাজীব কুমার দেব, বিচারক (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ), ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।