কামাল হোসেন মিয়াজী: ন্যায়বিচার শুধু রায় বা আদেশ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেই রায় বা আদেশ আইনসম্মতভাবে কার্যকর হওয়াও ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আদালতের আদেশ যদি বাস্তবে কার্যকর করা না যায়, তাহলে কাগজে প্রতিকার পাওয়া এবং বাস্তবে অধিকার সুরক্ষিত হওয়ার মধ্যে বড় ব্যবধান থেকে যায়।
আমাদের দেওয়ানি বিচারব্যবস্থায় এই সমস্যা নতুন নয়। বিশেষ করে জমি, বাড়ি, দখল কিংবা সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধে আদালত প্রায়ই অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (injunction) বা স্থিতাবস্থা (status quo) বজায় রাখার আদেশ দেন। এর উদ্দেশ্য হলো, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে কোনো পক্ষ যেন এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারে, যার ফলে বিরোধের বিষয়বস্তু বা বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন হয় এবং পরবর্তী রায়ের কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন হয়।
বাস্তবায়নে এতদিনের জটিলতা
বাস্তবে অবশ্য অনেক সময় ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও জমিতে প্রবেশ, নির্মাণকাজ, দখলের পরিবর্তন কিংবা সম্পত্তির প্রকৃতি বদলে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসনের সহায়তা চান।
সেখানেই প্রশ্ন ওঠে—এটি তো দেওয়ানি বিরোধ; পুলিশ তো মামলার পক্ষ নয়; কিংবা পুলিশের প্রতি আদালতের সরাসরি কোনো নির্দেশও নেই।
আদেশটি যদি সুপ্রিম কোর্টের—হাইকোর্ট বিভাগ বা আপিল বিভাগের—হয়, তাহলে সাংবিধানিক কাঠামো তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১১ সুপ্রিম কোর্টের ঘোষিত আইনের বাধ্যতামূলক চরিত্র নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে, এ প্রসঙ্গে আরও সরাসরি প্রাসঙ্গিক অনুচ্ছেদ ১১২-এ বলা হয়েছে যে, প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ও বিচারবিভাগীয় সকল কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের সহায়তায় কাজ করবে।
ফলে সুপ্রিম কোর্টের কোনো কার্যকর আদেশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জ্ঞাত হওয়ার পর, কেবল ‘আমরা মামলার পক্ষ নই’—এই কারণ দেখিয়ে কোনো নির্বাহী কর্তৃপক্ষ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার পক্ষে আইনসম্মতভাবে সেই আদেশ উপেক্ষা করা সমীচীন নয়। তবে সহায়তার ধরন ও পরিধি অবশ্যই আদেশের ভাষা, প্রযোজ্য আইন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত ক্ষমতার সীমার মধ্যে থাকতে হবে।
Section 94A: একটি স্পষ্ট বিধিবদ্ধ কাঠামো
কিন্তু আদেশটি যখন কোনো অধস্তন দেওয়ানি আদালত থেকে আসে, তখন বিষয়টি সব সময় এতটা সরল ছিল না। বিশেষ করে injunction বা status quo-এর আদেশ বাস্তবায়নে পুলিশ বা প্রশাসনের সহায়তা প্রয়োজন হলে একটি বাস্তব ও আইনি জটিলতা দেখা দিত।
পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ মামলার পক্ষ নয়—এই আপত্তি সামনে আসত। ফলে কোন সুস্পষ্ট আইনিভিত্তিতে তাদের সহযোগিতা করতে নির্দেশ দেওয়া যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতো।
দেওয়ানি কার্যবিধির সাম্প্রতিক সংশোধন, বিশেষ করে নতুন ধারা ৯৪ক (Section 94A), এই ক্ষেত্রে একটি অধিক স্পষ্ট বিধিবদ্ধ কাঠামো প্রদান করেছে।
ধারা ৯৪ক সংযোজনের আগে
ধারা ৯৪ক সংযোজনের আগে এ ধরনের ক্ষেত্রে মূলত CPC-এর ধারা ১৫১-এ সংরক্ষিত আদালতের অন্তর্নিহিত (inherent) ক্ষমতার ওপর নির্ভর করা হতো। বিশেষ করে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে পুলিশ বা অন্য কোনো সরকারি সংস্থার সহায়তা প্রয়োজন হলে, উপযুক্ত ক্ষেত্রে এই inherent jurisdiction-এর আশ্রয় নেওয়া হতো।
এর ভিত্তি ছিল এই নীতি যে, আদালত কোনো আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা রাখলে, সেই আদেশকে নিষ্ফল করে দেওয়ার প্রচেষ্টা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতাও আদালতের থাকতে পারে—যদিও সেই ক্ষমতা আইন দ্বারা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতে পারে না এবং ধারা ১৫১ কোনো স্বতন্ত্র প্রতিকার সৃষ্টির মাধ্যম নয়।
নতুন বিধানে কী পরিবর্তন এসেছে?
নতুন ধারা ৯৪ক এখন সেই ক্ষেত্রের জন্য আরও সরাসরি ও সুস্পষ্ট বিধিবদ্ধ ভিত্তি তৈরি করেছে। কোনো decree বা order বাস্তবায়নের জন্য আদালত নির্বাহী কর্তৃপক্ষ, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সহায়তা চেয়ে বা তাদের সহায়তার নির্দেশ দিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন।
আদালত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই নির্দেশ পালনের প্রতিবেদন বা compliance report দাখিলের নির্দেশও দিতে পারেন।
তবে এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আদেশের প্রকৃতি, বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত ক্ষমতা এবং তৃতীয় পক্ষের অধিকার—সবই বিবেচনায় রাখতে হবে।
পুলিশ কি দেওয়ানি বিরোধের মেরিট নির্ধারণ করতে পারবে?
এই পরিবর্তনের গুরুত্ব এখানেই। পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মূল মামলার পক্ষ কিনা, সেটি একমাত্র নির্ধারক প্রশ্ন নয়। তাদের দায়িত্ব মূল injunction-এর পক্ষ হিসেবে সৃষ্টি হচ্ছে না; বরং আদালতের আইনসম্মত নির্দেশ এবং প্রযোজ্য বিধানের ভিত্তিতে সহযোগিতার দায়িত্ব সৃষ্টি হতে পারে।
একই সঙ্গে, আদালতের নির্দেশ থাকলেই পুলিশ দেওয়ানি বিরোধের মেরিট নির্ধারণ করতে বা কোনো পক্ষকে বেআইনিভাবে দখল বুঝিয়ে দিতে পারে না। তাদের ভূমিকা হবে আদালতের আদেশের সীমার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আদেশ বাস্তবায়নে আইনসম্মত সহায়তা প্রদান করা।
‘Any decree or order’—কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আইনপ্রণেতা শুধু ‘decree’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। বলা হয়েছে ‘any decree or order’।
ফলে বিধানটির পরিধি কেবল চূড়ান্ত ডিক্রি বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উপযুক্ত ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী বা অন্যান্য কার্যকর আদেশ বাস্তবায়নেও এই বিধান প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট আদেশ ধারা ৯৪ক-এর আওতায় বাস্তবায়নযোগ্য কিনা, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট বিধানের সঠিক পাঠ, আদেশের প্রকৃতি এবং মামলার পরিস্থিতির ওপর।
Compliance report-এর গুরুত্ব
একই সঙ্গে compliance report চাওয়ার ক্ষমতাটিও তাৎপর্যপূর্ণ। আদালত শুধু নির্দেশ দিয়েই থেমে থাকবেন না; নির্দেশটি বাস্তবে কতটুকু কার্যকর হয়েছে, সেটিও জানতে চাইতে পারবেন।
ফলে আদেশ প্রদান থেকে তার বাস্তবায়ন পর্যন্ত একটি বিচারিক তদারকি ও জবাবদিহির সুযোগ তৈরি হয়।
Injunction মানেই judgment in rem নয়
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। এই সংশোধনের অর্থ এই নয় যে প্রতিটি injunction বা status quo order স্বয়ংক্রিয়ভাবে judgment in rem হয়ে গেল। কিংবা মামলার বাইরের প্রত্যেক ব্যক্তি সেই injunction-এর সরাসরি পক্ষ হয়ে গেলেন। দুটি বিষয় আইনগতভাবে আলাদা।
বরং নতুন বিধানটির শক্তি অন্য জায়গায়। কোনো অপ্রয়োজনীয় আইনি কল্পনার আশ্রয় না নিয়েই আইন এখন আদালতকে তার নিজের আদেশ কার্যকর করার জন্য রাষ্ট্রের নির্বাহী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যবস্থার সহায়তা নেওয়ার একটি সুস্পষ্ট statutory mechanism দিয়েছে।
তবে এই প্রক্রিয়া আদালতের আদেশের সীমা অতিক্রম করতে পারে না এবং পুলিশ বা প্রশাসনকে দেওয়ানি অধিকারের চূড়ান্ত নির্ধারকের ভূমিকায় পরিণত করে না।
কার্যকর বিচার নিশ্চিত করার পথে নতুন ধারা
আইনের শাসনের একটি মৌলিক শর্ত হলো, আদালতের আদেশ বাস্তবসম্মতভাবে কার্যকর হওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। একজন নাগরিক আদালতে গিয়ে injunction পেলেন, অথচ শক্তিশালী প্রতিপক্ষ সেই আদেশ অমান্য করে বাস্তব পরিস্থিতি বদলে ফেলল—এটি কোনো কার্যকর বিচারব্যবস্থার চিত্র হতে পারে না।
একইভাবে আদালতের আদেশ হাতে নিয়ে একজন নাগরিক যদি এক সরকারি দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে থাকেন, তাহলে বিচার পাওয়ার অর্থই অনেকাংশে হারিয়ে যায়।
যে বিচার কার্যকর করা যায় না, তা পূর্ণাঙ্গ বিচার নয়।
এই বিবেচনায় নতুন ধারা ৯৪ক-কে নিছক একটি procedural amendment হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এতদিন যে ক্ষমতার প্রয়োগ প্রধানত ধারা ১৫১, আদালতের inherent jurisdiction এবং বিচারিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল ছিল, আইন এখন তার জন্য আরও প্রত্যক্ষ ও সুস্পষ্ট বিধিবদ্ধ ভিত্তি তৈরি করেছে।
আদালতের আদেশ শুধু নথিতে সংরক্ষিত কয়েকটি বাক্য নয়। তার পেছনে রাষ্ট্রের কার্যকর কর্তৃত্ব থাকতে হয়। আদালত আদেশ দেবেন, অথচ সেই আদেশ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা থাকবে না—এই ব্যবধান আইনের শাসনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
দেওয়ানি কার্যবিধির সাম্প্রতিক সংশোধন সেই ব্যবধানটি অনেকটা ঘুচিয়ে দিয়েছে। আদালতের আদেশ দেওয়া যেমন বিচারিক কাজ, সেই আদেশ যেন আইনসম্মত সীমার মধ্যে বাস্তবে অর্থবহ ও কার্যকর থাকে—তা নিশ্চিত করাও ন্যায়বিচারেরই অংশ।
লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

