মোঃ সাজিদুর রহমান শুভ
মোঃ সাজিদুর রহমান শুভ

দলিল থাকলেই কি সম্পত্তির মালিক হওয়া যায়?

মো. সাজিদুর রহমান শুভ : এই দেশে জমি আছে মানেই ঝামেলা আছে। কেউ বাবার আমলের দলিল বুকে আঁকড়ে ধরে বসে আছেন, কেউ লাখ টাকা দিয়ে জমি কিনেও বছরের পর বছর নিজের নামে রেকর্ড করাতে পারছেন না। আমরা অনেকেই মনে করি—হাতে দলিল আছে, তাহলেই হলো, মালিকানা নিয়ে ভাবনার কিছু নেই। অথচ বাস্তবতা হলো, দলিল থাকলেই জমির সম্পূর্ণ মালিক হওয়া যায় না।

প্রশ্ন তখন একটাই—হাতে রেজিস্টার্ড দলিল থাকা সত্ত্বেও একজন মানুষ কি তাহলে সম্পূর্ণ মালিক নন?

এই প্রশ্নের উত্তর একটিমাত্র বাক্যে দেওয়া যায় না। কারণ আমাদের ভূমি ব্যবস্থাপনা একটিমাত্র আইন দিয়ে চলে না—একসঙ্গে কাজ করে অনেকগুলো আইন, বিধি এবং ম্যানুয়াল। তবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এবং নিবন্ধন আইন, ১৯০৮।

এই তিনটি আইনই আবার বহুবার সংশোধিত হয়েছে, আর প্রতিটি সংশোধনই দলিল আর মালিকানার সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে।

মালিকানার তিনটি স্তম্ভ—দলিল, রেকর্ড ও দখল

মালিকানা টিকে থাকে তিনটি স্তম্ভের ওপর—দলিল, রেকর্ড (খতিয়ান) এবং দখল। এর মধ্যে যেকোনো একটি স্তম্ভ দুর্বল হলে বাকি দুটিও নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট বোঝা দরকার—নামজারিও একটি রেকর্ড। আদালতের একাধিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নামজারি নিজে থেকে মালিকানা সৃষ্টি করে না, কিন্তু দখল ও মালিকানার শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। তাই দলিল থাকার পরও নামজারি না করানো মানে নিজের মালিকানাকে অসম্পূর্ণ রেখে দেওয়া।

২০০৪ সালের সংশোধনী: রেকর্ডের বাইরে হস্তান্তর নয়

২০০৪ সালে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ও নিবন্ধন আইনে বড় পরিবর্তন আসে।

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের নতুন ৫৩গ ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে—রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের অধীনে প্রস্তুতকৃত সর্বশেষ খতিয়ানে দাতার নাম (উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হলে পূর্বপুরুষের নাম) না থাকলে সেই সম্পত্তি বিক্রি করা যাবে না, আর করলেও তা হবে অকার্যকর।

নিবন্ধন আইনের ৫২ক ধারায়ও একই শর্ত যুক্ত হয়েছে—দলিলে সর্বশেষ খতিয়ান, সম্পত্তির প্রকৃতি, মূল্য, গত পঁচিশ বছরের মালিকানার বিবরণ এবং দাতার হলফনামা যুক্ত না থাকলে সাব-রেজিস্ট্রার দলিল রেজিস্ট্রি করতে পারবেন না।

এর সহজ অর্থ—রেকর্ডে যে যতটুকু সম্পত্তির মালিক হিসেবে উঠেছে, সে তার বেশি সম্পত্তি এখন আর হস্তান্তর করতে পারে না। বর্তমান নিয়মে হাল সনের খাজনা পরিশোধের প্রমাণ ছাড়া রেজিস্ট্রেশনও কার্যত সম্ভব হয় না।

এই বিধান জালিয়াতি ঠেকাতে, একই জমি বারবার বিক্রি বন্ধ করতে এবং প্রকৃত মালিককে সুরক্ষা দিতে করা হয়েছে।

২০০৪ সালের আগে কেনা জমির ক্ষেত্রে কী হবে?

এখানেই আসল প্রশ্ন—যারা ২০০৪ সালের সংশোধনীর আগে, সি.এস, এস.এ বা আর.এস রেকর্ড দেখে সরল বিশ্বাসে জমি কিনেছিলেন, টাকা দিয়েছিলেন, দলিল রেজিস্ট্রি করিয়েছিলেন এবং দখলও নিয়েছিলেন—তাদের অবস্থান কী?

আইনের একটি সাধারণ নীতি হলো, কোনো আইন দ্বারা পূর্ববর্তী কোনো কাজকে বাতিল করা না হলে তা সঠিক বলে বিবেচিত হতে থাকবে।

২০০৪ সালের সংশোধনী দিয়ে পূর্বের কাজকে যেহেতু বাতিল করা হয়নি, সেহেতু সি.এস, এস.এ বা আর.এস যা দিয়েই দলিল করা হোক না কেন, তা সঠিক। সেই দলিল সম্পাদনের সময়ে যে শর্তগুলো পূরণ করা প্রয়োজন ছিল, তা পূরণ হয়ে থাকলে হস্তান্তর তখনই সম্পূর্ণ ও বৈধ হয়ে গিয়েছিল।

সমস্যাটা তাই আইনি বৈধতার নয়, প্রশাসনিক সংযোগের। পুরনো রেকর্ড আর হাল রেকর্ডের মধ্যে সেতুবন্ধনের কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে ভূমি অফিস কেবল ততটুকু জমিই খারিজ দিচ্ছে, যতটুকু সর্বশেষ জরিপ বা রেকর্ডের সঙ্গে মিলছে।

অথচ প্রকৃত মালিক দলিল, মূল্য পরিশোধ ও দখল—তিনটি শর্তই পূরণ করেছেন।

দলিল, রেকর্ড ও দখল—একটির পরিপূরক অন্যটি

দলিল, রেকর্ড ও দখল—একটি অপরটির পরিপূরক, বিকল্প নয়।

শুধু দলিল থাকলেই যেমন মালিকানা সম্পূর্ণ হয় না, তেমনি বৈধ দলিল থাকা সত্ত্বেও হাল রেকর্ডে নাম না থাকা মানেই মালিকানা হারিয়ে যাওয়া নয়।

তবে এই অবস্থায় বসে থাকলে চলবে না। বরং নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিয়ে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব।

এখন কী করবেন?

যাদের হাতে পুরনো দলিল আছে অথচ হাল রেকর্ডে নাম ওঠেনি, তাদের প্রথম কাজ হলো মূল দলিল থেকে শুরু করে বায়া দলিলের পুরো ধারাবাহিকতা সংরক্ষণ ও সাজিয়ে রাখা।

এর সঙ্গে হাল সনের খাজনার রশিদ, পূর্ববর্তী মালিকদের নামজারির কাগজপত্র এবং দখলের প্রমাণ জোগাড় করে রাখতে হবে—এগুলোই আদালতে বা ভূমি অফিসে নিজের পক্ষে সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য হিসেবে কাজ করবে।

যারা ওয়ারিশ সূত্রে মালিক কিন্তু দলিল নেই এবং সর্বশেষ রেকর্ডে যার ওয়ারিশ তার নাম নেই, তারা দেরি না করে দেওয়ানি আদালতে যান। নতুন রেকর্ড আসার পূর্বেই সর্বশেষ রেকর্ডকে চ্যালেঞ্জ করুন।

মামলা চলাকালে নতুন জরিপ বা অন্য কেউ নামজারি করে নতুন রেকর্ডে নাম উঠাতে না পারে, সে জন্য আদালত থেকে নির্দেশনা বা নিষেধাজ্ঞা প্রার্থনা করুন।

আবার যাদের দলিল, রেকর্ড ও দখল ঠিক আছে, তবু নতুন জরিপে নাম আসছে না, তারা সেটেলমেন্ট অফিসার বরাবর লিখিত আপত্তি দিন।

তারপরেও যদি জরিপ চূড়ান্ত হয়ে গেজেটে প্রকাশ পায় এবং নাম না আসে, তাহলে দ্রুত স্থানীয় অধিক্ষেত্রের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করুন এবং ভুলভাবে যাদের নাম উঠেছে, তারা যেন দখলে যেতে না পারেন, সে জন্য আদালত থেকে নির্দেশনা নিয়ে নিন।

শেষ কথা

দেওয়ানি আদালতপাড়ায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে একটা কথা বলা যায়—এই দেশে জমির সমস্যার সূচনা মানুষের আইন না জানার কারণে হয় না। হয় ভুল মানুষের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার কারণে।

রেজিস্ট্রেশন অফিস, ভূমি অফিস কিংবা কোর্টপাড়ার দালাল চক্রের মিষ্টি কথায় এই দেশের সহজ-সরল মানুষ যে ভুল সিদ্ধান্ত নেন, তার হিসাব কষা কঠিন। সাময়িকভাবে হয়তো একটা পথ বের হয়ে যায়, একটা স্বস্তি আসে। কিন্তু সেই স্বস্তির আড়ালেই জন্ম নেয় ভবিষ্যতের এক কঠিন সমস্যা—ঠিক যেমন পাড়ার ওষুধের দোকান থেকে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খেলে সাময়িক অসুখ সারে বটে, কিন্তু শরীরের ভেতরে বাসা বাঁধে দুরারোগ্য ব্যাধি।

এই দেশে যার এক খণ্ড জমি বা সামান্য সম্পদও আছে, তার উচিত জমি বা সম্পদ নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তের আগে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সঙ্গে বসা। আইনজীবীর পরামর্শ ফি হয়তো কিছুটা লাগবে—কিন্তু সেই সামান্য ব্যয় আপনাকে বাঁচাবে বছরের পর বছর মামলা, লক্ষ টাকার ক্ষতি আর অহেতুক মানসিক যন্ত্রণা থেকে।

মনে রাখবেন—দেহ, সম্পদ আর সুনাম, এই তিনটিই একই সুতোয় গাঁথা। একটি ছিঁড়লে বাকি দুটিও রক্ষা পায় না।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। ই-মেইল: adv.sajidurrahman90s@gmail.com